ঢং ঢং– রাতের খাবার দিতে এল প্রহরীরা। সেই দানাসেদ্ধ তাল্লি মাছ। বোঝাই যাচ্ছে তাল্লি মাছ অজস্র পাওয়া যায়। খাওয়া শেষ। প্রহরীরা চলে গেল।
রাত বাড়তে লাগল। ফ্রান্সিস চোখ বুজেই মৃদুস্বরে বলতে লাগল। শাঙ্কো তোমার ছোরা–দড়ি কাটা–বড় মোটা দড়িটা খুলে কোমরে জড়াবে আমি বসবো কাঁধে উঠবে বিনোলা তার কাঁধে তুমি– খোদল ধরবে–শরীর যতটা পারো গুটিয়ে বাইরে বেরোবে– যে ভাবেই পারো মোটা ডালটা ধরবে। দড়ির মাথাটা শক্ত করে ডালে বাঁধবে–শাঙ্কো চাপা স্বরে বলে উঠল–
সাবাস ফ্রান্সিস।
–আস্তে। এখন একটু ঘুমিয়ে নাও। গায়ে জোর পাবে। ভালো দড়ি বেঁধে সংকেত দেবে। ফ্রান্সিস চোখ বুজে থেকেই বলল।
–মোরগের ডাক? শাঙ্কো বলল।
–পাগল। মোরগরা রাতে ডাকে না। ভোর হলে ডাকে। অন্য যে কোন পাখির : ডাক। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। শাঙ্কো বলল।
–ঘুমোও। ফ্রান্সিস বলল।
রাত গভীর হল। তন্দ্রা ভেঙে ফ্রান্সিস উঠে বসল। ফিস্ ফিস্ করে ডাকল শাঙ্কো বিনোলা। দু’জনেরই ঘুম ভেঙে গেল। দুজনেই তাড়াতাড়ি উঠে বসল। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের খুব কাছে এসে নিচু হল। ফ্রান্সিস দড়ি বাঁধা হাতদুটো শাঙ্কো বুকের কাছ দিয়ে জামার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে শাঙ্কোর ছোরাটা বের করে আনল। তারপর ছোরাটা ধরে শাঙ্কোর হাত বাঁধা দড়ির মাঝখানে ঘষতে লাগলো। অনেকটা কেটে গেল। শাঙ্কো এক হ্যাঁচকা টানে দড়িটা ছিঁড়ে ফেলল। তারপর একইভাবে ফ্রান্সিস ও বিনোলার হাতে বাঁধা দড়ি কেটে ফেলল। ফ্রান্সিস–মোটা লম্বা দড়িটা খুলে পাথুরে দেয়ালে গাঁথা কড়ার কাছে গেল। কড়ায় বাঁধা দড়ির দুটো মাথাই কাটল। দড়ির একটা মাথা শাঙ্কো কোমরে বেঁধে নিল। এবার ফ্রান্সিস ঐ খোদলটার দিকে নিচে মেঝেয় উঁচু হয়ে বসল। বিনোলে কাঁধের দু’পাশে পা ঝুলিয়ে বসল। শাঙ্কো এবার দেয়ালে দু হাতে ভর দিয়ে বিনোলার কাঁধের ওপর আস্তে আস্তে উঠেদাঁড়াল। কিন্তু খোঁদলটা তখনও হাতখানেক দূরে। এবার ফ্রান্সিস দেয়ালে দু’হাতে ভর রেখে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। এবার শাঙ্কো খোদলটা দু’হাতে ধরে ফেলল। তারপর শরীরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে খোদলটায় বুক চেপে ঝুলে পড়ল। এই ঝাঁকুনিতে ফ্রান্সিস একটু টাল খেয়েও সামলে নিল। বাঁ পাটা টন টন করছে। কিন্তু ফ্রান্সিস মুখ থেকে কোন কাতর শব্দ করল ন। দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল। শাঙ্কোর শরীরের ভার কমে যেতে ফ্রান্সিসের একটু স্বস্তি হল। শাঙ্কো বাইরে মুখ বাড়িয়ে অনুজ্জ্বল জ্যোৎস্নায় মোটা ডালটা অনেকটা স্পষ্ট দেখতে পেল। প্রায় চৌকোনো খোদলটায় ভর দিয়ে ও আস্তে আস্তে শরীরটা ঘোরাল। তারপর হাত বাড়িয়ে মোটা ডালের গায়ের একটা ছোট ডাল ধরে ভর নিল। তারপর খোঁদলের মধ্যে দিয়ে জোরে শরীরটা টেনে নিয়ে মোটা ডালটা প্রথমে একহাত পরে দুহাতে ধরে ফেলল। তখনও একটু হাঁপাচ্ছে। একটু দম নিয়ে খোদল থেকে দু পা সরিয়ে নিয়ে ডালটায় ঝুলে পড়ল। পরক্ষণেই পাক খেয়ে ডালটার ওপর বসে পড়ল। দেরি করা চলবে না। তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে। কোমর থেকে দড়ির মাথাটা খুলে খুব কষে ডালটায় বেঁধে ফেলল। শাঙ্কো মৃদু হাসল। ফ্রান্সিসের নিখুঁত ছক। ও এবার দুহাতের তালু মুখে চেপেকুউ কু ঔ পাখির ডাক ডাকল। ঘরে নিশ্চিন্ত ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–বিনোলা দড়ি ধরে ওঠো। বিনোলা দড়ি টেনে ধরে আস্তে আস্তে খোদলটায় বুক দিয়ে ঝুলে পড়ল। শাঙ্কোর মতই শরীর ঘুরিয়ে দড়ি টেনে ধরে ডালটায় উঠে এল। ফ্রান্সিস দেয়ালে হাত চেপে হাঁপাতে লাগল। একটু দম নিল। তারপর দড়ি ধরে উঠতে লাগল। জাহাজের দড়ি ধরে নামা ওঠা ওদের কাছে জল ভাত। একটু উঠে বাঁ হাত দিয়ে জ্বলন্ত মশালটা তুলে নিল। তারপর ডান হাত দিয়ে উরু দিয়ে দড়ি জড়িয়ে খোঁদলের গায়ে ঝুলে পড়ল। ডান হাতে টেনে দড়ির ঝোলানো মাথাটা শুনে তুলে নিল। জ্বলন্ত মশালটা মেঝেয় ছুঁড়ে ফেলেই শরীরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে দড়ির সাহায্যে ডালটা ধরে ফেলল। বিনোলা একটু সরে বসল। ফ্রান্সিস ডালের ওপর বসে, পড়ল। ওদিকে ঘরের মেঝের খড়ঘাসপাতায় আগুন জ্বলে উঠেছে। খোদল দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে।
জলদি–নেমে পড়। দড়ি ধরে ঝুলে পড়াশাঙ্কো চাপা স্বরে বলল–ঘরের পেছনে কোন প্রহরী নেই। শাঙ্কোর দড়ির শেষে নেমে এসে নিচে তাকিয়ে দেখল তখনও দুহাত নিচে শুকনো পাতার স্তূপ। আর ফ্রান্সিসকে একই ভাবে নামতে হল। শুকনো পাতার স্তূপে শব্দ হল। খসস ওদিকে আগুন সারা কয়েদ ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। দরজার কাছে। প্রহরীরা হৈ হৈ ডাকাডাকি শুরু করেছে। চাপাস্বরে ছোটে জাহাজ ঘাটের দিকে। বলেই ফ্রান্সিস এক ছুটে শুকনো ঝরাপাতা ঘাস মাড়িয়ে সামনের ঝোঁপ জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল। তিনজনেই ঝোঁপঝাড় ঠেলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছুটে চলল।
ওদিকে আরো যোদ্ধা এসে জড়ো হয়েছে সেই জ্বলন্ত কয়েদঘরের কাছে। একটু কাছে জলা থেকে পীপে জলে ভর্তি করে আগুন নেভাতে লাগল।
সৈন্যাবস থেকে আরো সৈন্য ছুটে এল। ততক্ষণে আগুন লেগে গেছে কয়েদঘরের ছাউনিতে।
দুজন প্রহরী ছুটল সেনাপতিকে খবর দিতে। শয়নকক্ষে তখন সেনাপতির ঘুম ভেঙে গেছে। বুঝে উঠতে পারল না। বাইরে এত চাচামেচি কীসের জন্যে। আগুন আগুন’ চিৎকারটা শুনছিল। সেনাপতি সবে বিছানা থেকে নেমেছে তার বাড়ির প্রহরী ছুটে এল।
