–ফ্রান্সিস–কী দেখছিলে? শাঙ্কো জানতে চাইল।
মুক্তির পথের ইঙ্গিত। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।
–অসম্ভব। যা শক্ত দেয়াল। ছাউনিও উঁচুতে। কী করে মুক্তির কথা ভাবছো? বিনোলা একটু অসহায় ভঙ্গীতে বলল।
ছক কষছি বিনোলা। শাঙ্কো কিছু বলল না। ও ফ্রান্সিসকে ভালো করেই চেনে। ফ্রান্সিস নিশ্চয়ই কিছু গভীরভাবে ভাবছে। ঠিক একটা উপায় বের করবেই।
এবার শাঙ্কোও বুকে দুহাত রেখে শুয়ে পড়ল। দেখাদেখি বিনোলাও কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস চোখ বুজে চুপ করে শুয়ে রইল। ভাবছিল রাজা কথা দিয়েছে। নিশ্চয়ই ওদের জাহাজে খাদ্য ও জল পাঠিয়েছে। মারিয়া আর বন্ধুরা আজ থেকেই পেট ভরে খেতে পাবে। পর্যাপ্ত পানীয় জলও পাবে। একটু তন্দ্রা এল ফ্রান্সিসদের। হঠাৎ ঢং শব্দে ফ্রান্সিসের তন্দ্রা ভেঙে গেল। দরজা খুলে গেল। বগলে লম্বাটে শুকনো বড় পাতা আর হাতে একটা মাটির হাঁড়ি নিয়ে একজন প্রহরী ঢুকল। অন্যজনের হাতে আর একটা মাটির হাঁড়ি। সে সব মেঝেয় রেখে একজন এসে ফ্রান্সিসদের হাত বাঁধা দড়ি খুলে দিল। ওদের সামনে পাতা পেতে দেওয়া হল। পাতে দেওয়া হল সেদ্ধ দানার খাবার। কিছুটা খেয়ে শাঙ্কো বলল–এই দানা গুলো আমি এনেছিলাম। কালকের সেই বিচিত্র রান্নার রুটিতে দেওয়া হয়েছিল। খেয়ে দেখো ভাল লাগবে। এবার একটা বড় টুকরোর মাছ আর ঝোলমত দেওয়া হল। মাছটা এক কামড় খেয়ে ফ্রান্সিস বলে উঠলকী সুন্দর স্বাদ। , সামুদ্রিক মাছ খেয়ে খেয়ে পেটে চড়া পড়ে গেছে। ফ্রান্সিস এক প্রহরীকে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে চুপ করে গেল। ও কিছুই বুঝবে না। সেনাপতি এলে জানতে হবে। খেতে খেতে ফ্রান্সিস বরাবরের মতই বলল–আজ খুব সুস্বাদু খাবার। বেশি করে খাও। শরীর তৈরী রাখো।
খাওয়া শেষ। একজন প্রহরী বড় মাটির হাঁড়ি ভর্তি জল নিয়ে ঢুকল। কাঠের গ্লাসও দিল। ওরা হাতমুখ ধুয়ে জল খেয়ে নিল। ওদের হাত বেঁধে প্রহরীরা চলে গেল। আরো খেতে চাইলে মাথা এপাশ ওপাশ করেছিল। আর নেই। তবু খাওয়া ভালোই হল। কারণ তিনজনই ছিল ক্ষুধার্ত। দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে ওরা চলে গেল। ঘটাং –দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ওরা শুয়ে পড়ল।
বিকেলে সেনাপতি এল। ঘরে ঢুকে একটু হেসে বলল–ভাল?
–ভালো আছি। দুপুরে পেট পুরে খেয়েছি। আচ্ছা মাছটা খুব সুস্বাদু লাগল। সমুদ্রের মাছ, ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–তাল্লি মাছ। খাড়িতে আসে। ডিম পাড়ে অসংখ্য–বড় জলায় একটু দূরে।
–ও। যাক গে–রাজা কাউকে খাদ্য জল নিয়ে আমাদের জাহাজে পাঠিয়েছিলেন? ফ্রান্সিস বলল।
–ন্নাঃ। কেউ — ন্না। সেনাপতি মাথা এপাশ-ওপাশ করল। ফ্রান্সিস সবিস্ময়ে বলে উঠল–রাজা যে বললেন। কথা দিলেন। ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে বসল।
–রাজা–কত কাজ–মনে নেই- বড় চিন্তা– রাজা মিরান্দার লুকোনো রাজৈশ্বর্য–রাজা পাগল– খুঁজছে। সেনাপতি বলল।
ফ্রান্সিস বেশ আগ্রহ বোধ করল। বলল ব্যাপারটা বলুন তো?
–অনেক কথা ইতিহাস সময় নেই চলি। ফ্রান্সিস তাকে থামাবার সময়ও পেল না। তার আগেই সেনাপতি চলে গেল।
–ফ্রান্সিস–গুপ্তধনের ব্যাপার। শাঙ্কো বলল।
-হ্যাঁ। কিন্তু আমার চিন্তা বন্ধুদের জন্য। আর কিছু ভাবতে পারছি না। লোকটা এত নীচ এত হীনমনা।
–কী আর করবে? ফ্রান্সিস চিন্তিত স্বরে বলল।
–শাঙ্কো–ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল- দ্রুত ছক কষতে হবে। আজ রাতেই পালাতে হবে। রাজা সেনাপতি বা প্রহরীরা জানে না আমার নাম ফ্রান্সিস কোন বাধাই আমার কাছে বাধা নয়। আজ রাতে পালাতে হবে।
–এই ঘর থেকে প্রহরীদের ধোঁকা দিয়ে?
ফ্রান্সিস কোন কথা না বলে চোখ বুজে শুয়ে পড়ল।
সন্ধ্যে হল। একজন প্রহরী জ্বলন্ত মশাল নিয়ে ঢুকল। ফোকরের দিককার পাথুরে দেয়ালের খাঁজে বসিয়ে দিয়ে চলে গেল।
রাত হল। চোখ বুজেই ফ্রান্সিস ডাকল–শাঙ্কো? শাঙ্কো মুখে শব্দ করল।
-যদি আমরা পরস্পরের কাঁধে উঠি –ঐ খোদলটার কাছে তুমি পৌঁছতে পারবে না? শাঙ্কো খোদলটার উচ্চতা মনে মনে মেপে নিয়ে বলল
–মনে হয়– পৌঁছোনো যাবে।
–অন্তত তুমি হাতের নাগালে পাবে। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। তবে ঐ হাত চারেক খোদল। পার হবো কী করে? শাঙ্কো একটু অসহায় ভঙ্গীতে বলল।
–তাহলে তুমি আর নিজেকে দুঃসাহসী ভাইকিং বলে পরিচয় দিও না। ফ্রান্সিস বলল।
-না মানে–শাঙ্কো কথাটা শেষ করতে পারল না। ফ্রান্সিস বলে উঠল আমরা ভাইকিং সব কষ্ট যন্ত্রণা সহ্য করতে পারি। এমন কি কষ্টদায়ক মৃত্যু পর্যন্ত। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল।
বলল–পারবো। কিন্তু সবার নিচে কে থাকবে?
–আমি। ফ্রান্সিস বেশ দৃঢ় স্বরে বলল। –তুমি? বাঁ পা–এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ নও তুমি। শাঙ্কো বলল।
–পারবো–পারতেই হবে। ফ্রান্সিসের কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তা।
–তবে আমিও পারবো। কিন্তু তারপর? শাঙ্কো জিজ্ঞেস করল।
–বাইরে ঐ বুনো গাছটার একটা মোটা ডাল আছে। হাত বাড়িয়ে না পেলেও ঝাঁপিয়ে পড়ে ধরা যাবে। চোখ বুজেই ফ্রান্সিস কথাগুলো বলে গেল। শাঙ্কো কিছুটা উঠে ভালো করে খোদলটা দিয়ে চেয়ে রইল। ম্লান জ্যোৎস্নায় দেখল সত্যি একটা ডালের আভাস। মশালের অস্পষ্ট আলোতে আরো স্পিষ্ট দেখল।
রাতে খাওয়া শেষে সব বলবো। এখন হাত পা ছেড়ে স্রেফ বিশ্রাম। কী ভাবে কী করবে ভারো। অন্য কোন চিন্তা নয়। শাঙ্কো শুয়ে পড়ল। কী ভাবে খোঁদলে উঠবে কী ভাবে বাইরে বেরোবে ডাল ধরবে এ সব ভাবতে লাগল।
