–আদর্শবাদী আঁ? আবার রাজা খুক খুক করে হেসে উঠল।
-হ্যাঁ। খুব কম রাজা বা দলপতি আমাদের বিশ্বাস করেছেন। বাকিরা অবিশ্বাস করেছে। আপনিও অবিশ্বাস করছেন। অনুরোধ–আমাদের অবিশ্বাস করবেন না। ফ্রান্সিস বলল।
উঁহু কয়েদঘরই তোমাদের আসল জায়গা। আগেও একটা বিদেশী স্পেন থেকে এসেছিল। আমরা স্পেন ভাষা শিখেছিলাম। প্রজাদের বলে বেড়াত যীশু না কে–শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ। ব্বাঃ আমি রাজা জোস্তাক– কেউ না? ফুটো নৌকোয় চড়িয়ে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম। তোমরা ভাগ্যবান–বেঁচে তো থাকবে। ফ্রান্সিস এবার রাজা জোস্তাকের মুখের দিকে তাকাল। পাতলা দাড়ি গোঁফের ফাঁকে ক্রুর হাসি। কুড়কুড়ে চোখে বদ মতলব এর কাছে সুবিচার পাওয়া অসম্ভব।
-ঠিক আছে। আমাদের কতদিন কয়েদ হবে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
—যতদিন না স্বীকার করছে তোমরা ঠগ–প্রবঞ্চক লুঠেরা। রাজা বলল। ফ্রান্সিস ভালো করেই বুঝল এই রাজার হাত থেকে নিস্তার নেই। পালাবার ছক কষতে হবে। তারপর দ্রুত ভাবতে লাগল। –পালাতে কদিন লাগবে কে জানে। সেটা কয়েদঘরে না ঢুকলে পাহারার ব্যবস্থা না দেখলে ঠিক বোঝা যাবে না। জাহাজে যা খাদ্য জল আছে কদিন আর যাবে তাতে? তারপর তো মারিয়া হ্যারিদের উপোশ করে থাকতে হবে। এ বিস্কো নেই। ভেন বয়স্ক। অন্য বন্ধুরা সাহসী ঠিকই কিন্তু তাদের চালনা করবে কে? সিনাত্রা গান গায় ভালো। কিন্তু ভীতু। হ্যারিশরীরের দিক থেকে দুর্বল। কিন্তু খুব বুদ্ধিমান সন্দেহ নেই। তবে আমি কাছে না থাকলে ও মনের দিক থেকেও দুর্বল হয়ে পড়ে। কাজেই চটানো চলবে না। ফ্রান্সিস খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল মহামান্য রাজা আপনার দেওয়া শাস্তি আমরা মাথা পেতে নিলাম। যত দোষ আমাদের এই তিনজনের। আপনার দলপতির হাত কামড়ে দিয়েছি। শাস্তি আমাদের অবশ্যই প্রাপ্য। কিন্তু মহামান্য রাজা আমাদের বেশ কিছু বন্ধু আমাদের জাহাজে রয়েছে। তাদের খাদ্য জল ফুরিয়ে গেছে। কাউকে পাঠিয়ে যদি তাদের খাদ্য জল সংগ্রহ করতে সাহায্য করেন। তাহলে আপনি যে যীশুর চেয়েও মহানুভব সেটা ভালোভাবে প্রমাণিত হবে। ফ্রান্সিস দেখলকাজ হয়েছে। রাজা জোস্তাক খুশিতে মিটিমিটি হাসছে। মাথা দুলিয়ে রাজা বলল–এ আর বেশি কথা কি। আমার লোক গিয়ে খাদ্য জল দিয়ে আসবে।
সত্যিই আপনি মহারাজা। ফ্রান্সিস সজোরে বলে উঠল। কিন্তু ভবি ভোলবার না। কয়েদ ঘরে বন্দী থাকার আদেশের নড়চড় হল না। সেনাপতি আসন থেকে নেমে এল। ফ্রান্সিসদের কছে এসে বলল চলো। ফ্রান্সিস মাথা অনেকনুইয়ে রাজাকে সম্মান জানাল। আগে সেনাপতি। পেছনে ফ্রান্সিসরা চলল। রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে সেনাপতি উত্তরমুখো চলল। রাজবাড়ি এলাকা শেষ হল। তারপর বাদিকে একটা পাথরের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসরাও দাঁড়িয়ে পড়ল। পাথর আর কাঠ দিয়ে বেশ শক্ত গাঁথুনির ঘরটা বোঝা গেল এটা কয়েদঘর। সেনাপতিকে দেখে কোথা থেকে দুজন প্রহরী খোলা তরোয়াল হাতে ছুটে এল। ঘরটার দরজার সামনে এস দাঁড়িয়ে পড়ল। বোঝা গেল এই দুজনই কয়েদঘর পাহারা দেবে। সেনাপতিকে একটু মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল দু’জনে। একজন কোমরের ফেট্টিতে ঝোলানো একটা বড় লোহার রিংমত খুলে নিয়ে বন্ধ দরজার সামনে গেল। দরজার বড় কড়ায় ঝুলছিল একটা বেশ বড় গোল তালা। প্রহরীটি রিং থেকে লম্বা একটা চাবি বের করে দরজাটা খুললে। লোহার দরজাটা বেশ জোরে ঠেলে খুলল। ঢ্যাং ধাতব শব্দ হল। অন্য প্রহরীটি ফ্রান্সিসদের একে একে এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করল। ওরা যখন এক এক করে ঢুকছে তখন প্রহরীটি প্রত্যেককে জোরে ঠেলা দিয়ে ঢুকিয়ে দিল। ফ্রান্সিসের আবার মেজাজ চড়ে গেল। কিন্তু ও চোখ কুঁচকে নিজেকে সহমত করল। এই অপমানজনক ব্যবহার মুখ বুজে সহ্য করল। নিরুপায় এখন।
এই ভর দুপুরেও ঘরটা কেমন অন্ধকার অন্ধকার। চারপাশে নিরেট পাথুরে দেয়াল। দুজন প্রহরীই ঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিসদের দুহাত দড়ি দিয়ে বেঁধে দিল। কিন্তু পা বাঁধলো না। ফ্রান্সিস স্বস্তির হাঁপ ছাড়ল। দেখা গেল দু’পাশের দেয়ালে দুটো লোহার কড়া গাঁথা। একটা কড়ায় লম্বা একটা মোটা দড়ি ঝুলছিল। একজন প্রহরী সেই দড়ির একটা মাথা এনে ফ্রান্সিসদের দড়ি বাঁধা হাতের মধ্যে দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে টেনে ওপাশের কড়ায় শক্ত, করে বেঁধে দিল দ’হাত তো বাঁধাই। তার মধ্যে দিয়ে লম্বা দড়ি ঢুকিয়ে ফ্রান্সিসদের নড়াচড়াই শুনে প্রায় বন্ধ করে দিল। ঘরে ঘুরে বেড়ানো যাবে না। ফ্রান্সিস একটু হেসে এক প্রহরীকে বলল–সত্যিই ভাই তোমাদের রাজা শুধু মহানই নন-বুদ্ধিমান ধুরন্ধর। প্রহরীরা ফ্রান্সিসের কথা কিছুই বুঝল না। বেরিয়ে গেল। ঢঢং। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ঘরের মেঝেয় শুকনো খড় ঘাসপাতা ছড়ানো। হাত বাঁধা অবস্থায় ফ্রান্সিস ঐ মেঝের মধ্যেই শুয়ে পড়ল। বাঁধা হাত বুকের ওপর রেখে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরটা দেখতে লাগল। শাঙ্কো আর বিনোলা বসে পড়ল। ফ্রান্সিস দেখল ঘরটার উত্তর দিকে বেশ কিছু ওপরে একটা জানালা মত। জানালা না বলে ওটাকে খোদলই বলা যায়। এবড়ো-খেবড়ো করে ভাঙা। ওটাই একমাত্র আলো আর হাওয়া চলাচলের পথ। আর কোন ফোকর নেই। হঠাৎ হাওয়ার ধাক্কায় একটা ডাল এসে ফোকরটায় ঝাপটা মারল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াও। বলল শাঙ্কো তোমরা উঠে দাঁড়াও। আমি দড়িটা টেনে নিয়ে ঐ দেয়ালের কাছে যাবো। শাঙ্কো বিনোলা উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস ফোকরের দেয়ালের দিকে ঠিক পায়ে পায়ে এগোল। হাতে টানা দড়ি বাঁধা। কাজেই শাঙ্কোদের সেই সঙ্গে এগোতে হল। ফ্রান্সিস মাথা তুলে ফোকরের মধ্যে দিয়ে তাকাল। ফোকরের হাত কয়েক দূরেই একটা মোটামুটি মোটা ডাল বাইরের আলোয় দেখল। আস্তে আস্তে ফিরে এল। শাঙ্কোরাও ফিরে এসে বসে পড়ল। ফ্রান্সিস আবার শুয়ে পড়ল।
