ওদিকে দলপতি তখন এগিয়ে এল। ফ্রানিসের ফেলে দেওয়া তরোয়ালটা তুলে নিয়ে খাপে ভরতে ভরতে দাঁত চেপে বলল–তোকে কয়েদখানায় ঢোকাবার ব্যবস্থা করছি। চ। ফ্রান্সিসরা কেউ কোন কথা বলল না। দলপতি যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে বলল, নিয়ে চল সব কটাকে। ফ্রান্সিসের তরোয়ালের ঘা খাওয়া ঘোড়াটার লাগাম ধরে নিয়ে এল। কেউ ঘোড়ায় উঠল না। দলপতি ধমকের সুরে বলল–চ বিদেশি ভূতের দল। মজা দেখাচ্ছি।
সামনে ফ্রান্সিসরা পেছনে ঘোড়ার লাগাম ধরে সবাই পশ্চিমমুখো চলল। হাঁটতে হাঁটতে শাঙ্কো মৃদুস্বরে বল ফ্রান্সিস-বড্ড রেগে গিয়েছিলে।
তুই তুই করছিল। মেজাজ ঠিক থাকে? ফ্রান্সিসও মৃদু স্বরে বলল দুধারে ছাড়া ছাড়া বাড়ি ঘর। পাথর কাঠের। ঘাসপাতার ছাউনি। এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে মেয়ে পুরুষ বাচ্চা-কাচ্চা অনেকেই অপরিচিত পোশাকপরা ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল। এটা বুঝল যে এই বিদেশিরা নিশ্চয়ই কোন অপরাধ করেছে। দলপতি এদের তাই রাজা জোস্তাকের রাজদরবারে বিচারের জন্য নিয়ে যাচ্ছে। সবাই যেন কিছুটা ভীত। রাজা জোস্তাকের পাল্লায় যখন পড়েছে তখন এদের কপালে দুঃখ আছে। ওদের মুখের ভাব লক্ষ্য করে ফ্রান্সিসও বুঝল বেশ বিপদেই পড়তে হল।
রাস্তায় বালিভরা রাস্তা শেষ হয়ে মাটির রাস্তা শুরু হল। রোদের তেজ বাড়ল। গা শর ঘেমে উঠছে। তবে দূরের সমুদ্র থেকে হাওয়া আসছিল অবাধেই। তাই হাঁটতে হাঁটতে বিনোলা ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–তাহলে আমরা বিপদে পড়লাম।
–বিপদ তো যে কোন সময় আসতে পারে। দেখা যাক এরা আমাদের কোথায় নিয়ে যায়। তবে আমাদের আদর করে অতিথি আবাসে রাখবে না এটা ঠিক। ফ্রান্সিস মৃদু স্বরে বলল। ওরা হেঁটে চলল। ঘোড়ার লাগাম ধরে ধরে দলপতি আর যোদ্ধা দুজনও চলেছে। ওরা কোন কথাই বলছে না।
কিছু দূরে দেখা গেল বেশ কিছু বাড়িঘর তারপরেই একটা লম্বাটে বড় বাড়ি। পাথরের চাঙড় গেঁথে তৈরি। বাড়িটার মূল ফটকের সামনে এল ওরা। দু’জন প্রহরী। বেশ জমকালো পোশাক গায়ে। মূলপ্রবেশ পথের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে খোলা তরোয়াল হাত পাহারা দিচ্ছে। ফ্রান্সিসরা বুঝল এটাই রাজবাড়ি। প্রহরীদের সামনে ওরা আসতেই প্রহরীরা দলপতির দিকে তাকিয়ে একটু মাথা নুইয়ে সদর দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াল। শুধু দলপতির পেছনে পেছনে ওরা রাজবাড়ির মধ্যে ঢুকল। একটু চাতাল পার হয়েই রাজসভাকক্ষ। পাথর গেঁথে তৈরি লম্বাটে ঘর। দুটো মাত্র পাথরের জানালা। সভাকক্ষ একটুঅন্ধকার অন্ধকার। প্রজাদের বেশ ভিড়! রাজা জোস্তাক কাঠ আর পাথরের তৈরি সিংহাসনে বসে আছে। সিংহাসন ফুল লতা তোলা মোটা কাপড় ঢাকা। দু’দিকের পাথরের দেয়ালের খাঁজেদু’টো বড়মশাল জ্বলছে। সেই আলোয় ফ্রান্সিস দেখল রাজা জোস্তাক বয়স্ক মানুষ। মুখে অল্প পাকা দাড়ি গোঁফ। গায়ে পাতলা হলুদ রঙের পোশাক। আলখালা মত। পাশের আসনে বৃদ্ধ মন্ত্রীও বলশালী চেহারার সেনাপতি বসে আছে। রাজসভায় তখন বিচার টিচার চলছিল বোধহয়। সে সব নিয়ে ব্যস্ত রাজা। এক নজর ফ্রান্সিসদের দেখে নিল। বিদেশি। দলপতি ফ্রান্সিসদের নিয়ে সামনে এগিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে রইল। এখানে দেখার মত কিছু নেই। তাইফ্রান্সিস এদিক ওদিক তাকিয়ে তাকিয়ে সময় কাটাতে লাগল। রাজা বেশ কয়েকবার ভারি গলায় বিচারের রায় শোনাল। তারপর ডান হাত তুলল। আজকের মত বিচার শেষ। সবাই নিম্নস্বরে কথা বলতে বলতে চলে গেল।
এবার রাজা আঙ্গুল নেড়ে ইঙ্গিতে দলপতিকে কাছে আসতে বলল। দলপতি রাজার কাছে গিয়ে মাথা একটু নামিয়ে সম্মান জানিয়ে দেশীয় ভাষায় বলে গেল। বোধহয় কোথায় ফ্রান্সিসদের দেখা পেয়েছে সেসব। ফ্রান্সিস শুধু ভাইকিং কথাটা বুঝতে পারল। দলপতি রাজাকে হাতের তোড়ে বাঁধা কামড়ের ক্ষত দেখাল। মুখ দিয়ে কামড়াবার ভঙ্গীও করল। রাজা এবার ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে কী বলল ফ্রান্সিস স্পেনীয় ভাষায় বলল আপনি কী বলছেন বুঝতে পারছি না। রাজা থেমে থেমে স্পনীয় ভাষায় বলল–নেতা কে?
–আমি? ফ্রান্সিস কথাটা বলে এগিয়ে গেল।
–বিদেশী ভাইকিং –সাহস দলপতি কামড়েছো। রাজা ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বলল।
–আমাকে তুই তুই বলে ডেকে কথা বলছিল। অপমান সহ্য হয় নি। ফ্রান্সিস বেশ . দৃঢ়স্বরে বলল।
–শাস্তি পাবে। আমার রাজত্বে এসেছো কেনো? রাজা বলল।
–কোন উদ্দেশ্যে নিয়ে আসিনি। ফ্রান্সিস বলল।
–আশ্চর্য! বিনা কারণে? রাজা বলল।
–আমরা দ্বীপ দেশ ঘুরে বেড়াই। নতুন নতুন দেশ কত বিচিত্র মানুষ তাদের ভাষা জীবনযাত্রা ভালো লাগে এসব। সকলের মঙ্গল করার চেষ্টা করি। ফ্রান্সিস বলল।
–শুধু এই? রাজা বেশ অবাক হয়ে বলল।
–এইটুকুকি কম হল? তবে আর একটা কাজও আমরা করি। ফ্রান্সিস বলল।
কী? রাজা জানতে চাইল।
–কোন গুপ্ত ধনভাণ্ডারের খোঁজ পেলে সে সব বুদ্ধি খাটিয়ে কোন না কোন সূত্র ধরে উদ্ধার করি। কখনও জীবনের ঝুঁকিও নিয়ে থাকি। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা খুকখুক করে হেসে উঠল। বলল এইবার আসল কথা –গুপ্তধন নিয়ে পলায়ন–পেশা তোমাদের।
–আমাদের ভুল বুঝবেন না। অনেক গুপ্তধন ভাণ্ডার আমরা উদ্ধার করেছি। সাংকেতিক চিহ্ন নকশা মানচিত্র দেখে। কিন্তু একটি স্বর্ণমুদ্রাও আমরা নিইনি। আসল মালিককে দিয়ে দিয়েছি।
