ভাবি বৈ কি। কত দেশ দ্বীপ তো ঘুরলাম, কত রাজা সুলতানকে তো দেখলাম। আবার দুঃখী অজ্ঞানী মানুষও দেখেছি। ক্ষুধার্ত মানুষও দেখেছি। মনের মধ্যে কোথাও তাদের কথা ঠাই নিয়েছিল। তাই মানুষের ক্ষুধার কথা উঠতেই সেই সব অভিজ্ঞতা ভিড় করে এল। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে বলল।
–কিন্তু সত্যিই তোক্ষুধার্তমানুষের ক্ষুধা দূরকরার সাধ্য আমাদেরকতটুকু? হ্যারিবলল।
–যতটা পারি। নইলে আমরা আর মানুষ কীসে। ফ্রান্সিস বলল। একটু চুপ করে থেকে বলল–ফ্রান্সিস তুমি শুধু দুঃসাহসী অভিযাত্রীই নও অনেক কিছু ভাবো তুমি। যাকগে রাত বাড়ছে। চলি। হ্যারি চলে গেল। মারিয়া এতক্ষণ ফ্রান্সিসের কথাগুলো খুব। মন দিয়ে শুনছিল। হ্যারি চলে গেলে বলল–ফ্রান্সিস তুমি অনেককিছু ভাবো। ফ্রান্সিস হেসে বলল-ঘুমিয়ে পড়ো। দেখবে আজ রাতে কী নিটোল ঘুম হয়। সকালে নিজেকে মনে হবে যেন অন্য মানুষ। পরিতৃপ্ত সুখী–কোন ক্লান্তি নেই শরীরে।
কতদিন পরে ভাইকিংরা পেট ভরে খেতে পেল। সারারাত গভীর ঘুমে কাটল। শুধু নজরদার পেড্রোর চোখে ঘুম নেই। তীরভূমির দিকে তো বটেই সমুদ্রের দিকেও আধভাঙা চাঁদের ম্লান আলোর মধ্যে দিয়ে তাকিয়ে থেকে রাত কাটল পেড্রোর। নির্বিঘ্নেই কাটল রাতটা। এখানকার অধিবাসীরাও জাহাজে আক্রমণ চালাল না। ওদিকে সমুদ্রের দিক থেকেও কোন আক্রমণ হল না।
ভোর হল। ঘুম ভেঙে ফ্রান্সিসের প্রথম চিন্তাই হল তীরে নামতে হবে। জানতে হবে কোথায় এলাম। এখানকার লোকেরাই বা কেমন। সবচেয়ে বড় কাজ যথেষ্ট খাদ্য ও পানীয় জল সংগ্রহ করা। সকালের জলখাবার খেয়েই ও শাঙ্কো আর বিনেলোকে ডেকে পাঠাল মারিয়াকে দিয়ে। শাঙ্কো আর বিনেলো এল। ফ্রান্সিস বলল–তোমরা তৈরী হয়ে এসো। তীরে নামবো। সব খোঁজ খবর নিতে হবে।
–তরোয়াল নিয়ে যাবো? শাঙ্কো বলল।
না। আমরা তো লড়াই করতে যাচ্ছি না। খোঁজ খবর করতে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু আমি তো বেশি খাদ্য আনতে পারিনি। জল তো ফুরিয়ে এসেছে। শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ জানি। কিন্তু এখনই আমরা বস্তা পীপে নিয়ে যাবো না। এখনও তো জানি না কাদের মধ্যে কী অবস্থায় গিয়ে আমরা পড়বো। বিপদের আশঙ্কা নেই বুঝলে তখন খাদ্য জলের জন্যে যাবো। যাও। ফ্রান্সিস বলল। শাঙ্কোরা চলে গেল।
অল্পক্ষণের মধ্যে তৈরি হয়ে ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে এল। দেখল আকাশ পরিষ্কার। চারদিক উজ্জ্বল রোদে ভেসে যাচ্ছে। শাঙ্কো আর বিনেলো তৈরী হয়ে ওর জন্যে অপেক্ষা করছে। হ্যারি এগিয়ে এল। বলল। আমি যাবো?
–না হ্যারি। তিনজনই ভালো। বিপদে পড়লে সুযোগ বুঝে পালাতে সুবিধে হবে। তরোয়াল তো নিয়ে যাচ্ছিনা। লড়াই-টড়াইয়ে কোন ভাবে জড়াবো না। ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু ফ্রান্সিস –জীবন বিপন্ন হলে? হ্যারি আশঙ্কা প্রকাশ করল।
–তখন আত্মরক্ষার জন্যে লড়াই করতে হবে। কিন্তু এখন অস্ত্রশস্ত্র না নিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস জাহাজ চালক ফ্লেজারের কাছে এল।
ফ্লেজার হুইলের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
– ফ্লেজার জাহাজ তীরে ভেড়াও। আমরা নামবো। ফ্লেজার গিয়ে হুইল ধরল। আস্তে আস্তে জাহাজটা চালিয়ে তীরে ভেড়াল। শাঙ্কো আর বিনেলো ধরে ধরে কাঠের লম্বা পাটাতনটা তীরের বালিভরা মাটিতে নামাল। পাটাতন দিয়ে তিনজনে তীরে নামল।
সামনেই বালিয়াড়ি এলাকা। তিনজনে বালির ওপর দিয়ে হেঁটে চলল। বালিতে পা বসে যায়। আস্তে আস্তে হাঁটতে হচ্ছিল। রোদের তাপ তখনও বাড়েনি। হাওয়ার তোড়ে কিছু ধুলো বালি উড়ছিল। কিছুদূর যেতে দেখল বাড়ি ঘরদোর শুরু হয়েছে। দু পাশে মাঝখান দিয়ে বালি ভর্তি বাস্তু মৃত চলে গেছে পশ্চিমমুখো। এখানে স্থানীয় লোকজনের ভিড়। দোকানে দোকানে কেনাকাটা চলছে। বোঝা গেল এইটা বাজার এলাকা। স্থানীয় লোকজনের মাথায় লম্বা লম্বা চুল। চুড়ো করে বাঁধা। ঢোলা হাতা নানা রঙের সূতো দিয়ে ফুলপাতা তোলা ঢোলা হাতা পোশাক। কিছু লোকের গায়ে কিছু নেই। গলায় মোটা সূতোর মালার মত। এখন শাঙ্কোর গায়ে জাহাজী পোশাক বাজারের লোকজন অনেকেই বেশ অবাক চোখে বিদেশি পোশাক পরা ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল। বুঝল না এরা কোথা থেকে এসেছে। কেনই বা এসেছে।
-শাঙ্কো– আটা চিনির দোকান কোথায়? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–চলো দেখাচ্ছি। আটা চিনির দোকানের সামনে এল ওরা।
–ঠিক আছে। এবার জল কোথায় পাওয়া যায় দেখি চলো। বিছুটা এগোতে দেখল, একটা লোক দুটো ভেড়া খুঁটিতে বেঁধে রাস্তার পাশে বসে আছে। ফ্রান্সিস এগিয়ে লোকটার কাছে গেল। কিনতে হবে ভেড়া দুটো। শাঙ্কোকে বলল–ছোট্ট চাকতি আছে তো?
হ্যাঁ হ্যাঁ। শাঙ্কো কোমরের গাঁট থেকে দেখে দেখে একটা ছোট সোনার চাকতি বের করল। লোকটা সোনার চাকতি দেখে খুব খুশি। বিদেশি লোকগুলো ভাল দাম দেবে। তখনই শাঙ্কো চাপাস্বরে বলে উঠল ফ্রান্সিস ডানদিকে দেখ। ফ্রান্সিস আড়চোখে তাকিয়ে দেখল তিনজন যোদ্ধা ঘোড়ায় চেপে এদিকেই আসছে। বোধ হয় টহল দিতে বেরিয়েছে। যোদ্ধাদের গায়ে আটোসাঁটো সবুজ রঙের মোটা কাপড়ের পোশাক। বেশ ভারিকির ভঙ্গি। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বল–ওদের দিকে তাকিও না। ফ্রান্সিস ভেড়াওয়ালার সঙ্গে সোনার চাকতি দেখিয়ে ইঙ্গিত করতে লাগল। ফ্রান্সিস ঝুঁকে পড়ে দামের ইঙ্গিত করছিল। কিন্তু ওদের গয়ে বিদেশি পোশাক। যোদ্ধাদের সজাগ দৃষ্টি ওরা এড়াতে পারল না। এগিয়ে এসে ওদের দলপতি গোছের দাঁড়িগোঁফওয়ালা যোদ্ধাটি ঘোড়ায় বসেই ঐ দেশী ভাষায় কিজিজ্ঞেস করল ফ্রান্সিসরা কথাটা কানেই তুলল না। শাঙ্কো কথাটা আন্দাজে বুঝে নিয়ে বলল–আমরা ভাইকিংদের দেশ থেকে এসেছি। শাঙ্কো স্থানিয় ভাষায় কথাটা বলল। দলনেতা এবার ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বলল তোরা কেন এসেছিস? ফ্রান্সিস মুখ ঘুরিয়ে বলল–বেড়াতে। তারপর বেশ তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে একটা ভেড়ার গলায় বাধা দড়ি খুলতে লাগল। এই উপেক্ষাটা দলপতির সহ্য হল না। ওকে সকলে সমীহ করে ভয় করে আর এই বিদেশি ভূতটা ওর দিকে তাকাচ্ছেইনা? হেঁকে বলল–অ্যাই আমার দিকে তাকিয়ে বল। ফ্রান্সিস তাকাল না। ক্ষেপে গিয়ে যোদ্ধাটা কোমরের খাপ থেকে দ্রুত তরোয়ালটা খুলল। তরোয়ালের ডগাটা ফ্রান্সিসের কাঁধের কাছে চেপে এক টান। দিল। পোশাক কেটে গেল। একটু কেটে রক্ত বেরিয়ে এল। রক্ত দেখে ফ্রান্সিসের মাথায় রাগ চড়ে গেল। শাঙ্কো ফ্রান্সিস বুঝল সেটা। বাধা দেবার আগেই লাফিয়ে ফ্রান্সিস উঠে, দলপতির তরোয়াল ধরা হাতে জোর করে কামড়ে ধরল। এরকম হতে পারে দলপতি বোধ হয় স্বপ্নেও ভাবে নি। সঙ্গের যোদ্ধা দুজনও অবাক। ওরা এই কাণ্ড দেখে কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। শাঙ্কো চাপাস্বরে ডাকল –ফ্রান্সিস। ফান্সিস কামড় ছেড়ে দিল। কামড়ে দলপতির হাত থেকে রক্ত বেরিয়ে এল। হাত থেকে তরোয়াল খসে নিচের বালিতে পড়ল। দলপতি ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে ক্ষতস্থান চেপে ধরল। ফ্রান্সিস দ্রুত হাতে নিচু হয়ে তরোয়ালটা তুলে নিল। তারপর মাথা নিচু করে ঘোড়াটার পেটে জড়িয়ে বাধা আসনের মোটা দড়িটায় তরোয়াল চালাল। দড়িটা কেটে গেল। ঘোড়াটার পেটটাও বেশ কিছুটা কেটে গেল। রক্ত পড়তে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে চিহি চিহি ডেকে উঠে ঘোড়াটা লাফিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে আসনসুদ্ধদলপতি নিচে বালির ওপর গড়িয়ে পড়ল। চোখের নিমেষে এত ঘটনা ঘটে গেল। আহত ঘোড়া ছুট লাগাল। সঙ্গী যোদ্ধা দুজন হতবাক হয়ে দেখছিল এসব। ওরা এবার তৎপর হল। ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে নেমে এসেই খাপ থেকে তরোয়াল খুলল। ফ্রান্সিসের দিকে ছুটে গেল। ওদের আক্রমণ করার আগেই ফ্রান্সিস তরোয়াল উঁচিয়ে ওদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হল দুজনের সঙ্গে একজনের লড়াই। ফ্রান্সিস এগিয়ে পিছিয়ে নিপুণ হাতে তরোয়াল চালাতে লাগল। দুই যোদ্ধাই ফ্রান্সিসের তরোয়ালের আচমকা মার ঠেকাতে ঠেকাতে বুঝল এ বড় কঠিন ঠাই। ফ্রান্সিসের সঙ্গে তরোয়ালের লড়াই করা দুঃসাধ্য। ওদিকে দলপতি আহত হাত কোমরের কাপড়ের ফেট্টি খুলে বাঁধতে বাঁধতে এই লড়াই দেখতে লাগল। এবার শাঙ্কো লক্ষ্য করল ফ্রান্সিস সেই আগের মত বিদ্যুৎগতিতে এদিক ওদিক সরে গিয়ে লড়াই চালাতে পারছে না। কারণটা বোঝাই যাচ্ছে। ফ্রান্সিসের বাঁ পায়ের দুর্বলতা, শাঙ্কো বিনোলার দিকে তাকিয়ে সখেদে বলল ঈস্ত বোয়ালটা আনতে হত। ও উদ্বিগ্ন স্বরে গলা চড়িয়ে বলল– ফ্রান্সিস আমাকে তরোয়ালটা দাও। দুটোকেই নিকেশ করবো। না তাহলে আরো বিপদে পড়বো। ফ্রান্সিস হাত থেকে তরোয়াল ফেলে দিয়ে দুহাত তুলে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল–লড়াই নয়। শাঙ্কো অবাক হয়ে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস–যে কোনদিন তরোয়ালের লড়াইয়ে কারো কাছে হার স্বীকার করেনি যার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে কত ধুরন্দর লড়াইয়ে হয় মারা গেছে নয় তো মাথা নিচু করে হার স্বীকার করেছে। সেই আশ্চর্য ক্ষমতার অধিকারী। ফ্রান্সিস আজ হার স্বীকার করল। দঃখে বেদনায় শাঙ্কোর দু’চোখ জল ভিজে গেল। যোদ্ধা দুজন তরোয়াল নামিয়ে তখন হাঁপাচ্ছিল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে শাঙ্কোর মনের অবস্থা বুঝতে পারল। অল্প হাঁপাতে হাঁপাতে মৃদুস্বরে ফ্রান্সিস বলল শাঙ্কো আমি এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ নই। অনর্থক ঝুঁকি নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
