শাঙ্কো ডেক-এর উঠে এল। ওর বন্ধুরা ওকে এই পোশাকে মাথায় চুড়ো করে বাঁধা চুল দেখে হেসে গড়াগড়ি। শাঙ্কো গম্ভীর মুখে দড়ির মই বেয়ে ওদের বাঁধা নৌকোটায় নেমে এল। দড়ির বাঁধন খুলে দাঁড় তুলে নিল। নৌকো চালাল তীর-ভূমির দিকে তখন সূর্য অস্ত গেছে। তবে অন্ধকার খুব গাঢ় হয়নি। নৌকো তীরে ভিড়ল। শাঙ্কো নৌকোটা টেনে তীরের বালির ওপর তুলে রাখল জোয়ার এলেও ভেসে যাবার আশঙ্কা রইল না।
তারপর আবছা অন্ধকারে বালির ওপর দিয়ে আস্তে হেঁটে চলল ঘরবাড়িগুলোর দিকে। কাঁধে নিল বস্তাটা। বস্তা মত কিছুকয়েকজনের কাঁধে দেখেছিল। কয়েকটা দোকান মত পেল। মোটা সূতোয় বোনা কাপড়-টাপড়ের দোকান। মাটির দুচার রকম পাত্রের দোকান। এ সব পার হয়ে দেখল একটা বড় মোটা হলুদ সূতোয় তৈরি বস্তা রাখা একটা দোকান। সব দোকানের সামনেই ততক্ষণে ছোট মশাল মত জ্বালা হয়েছে। কিছু দোকান। বন্ধও দেখল। সেই বস্তা রাখা দোকানে গিয়েশাঙ্কো দেখল বস্তায় আটা ময়দা আর ছোট ছোট দানামত কিছু রাখা। ওসব সেদ্ধ করে খাওয়া হয়। শাঙ্কোকে কারো বিদেশী বলে মনেই হল না। ওর মুখ আবছা অন্ধকারে ভালো দেখা যাচ্ছে না। শাঙ্কো গাঁট থেকে দুটো সোনার চাকতি চুল চুড়ো করে বাঁধা দোকানিকে দেখাল। তারপর সোনার চাকতি দেখে দোকানি খুব খুশী। হাত বাড়িয়ে সোনার চাকতিটা নিল। তারপর একটা কাঠের পাত্র দিয়ে মেপেমেপে শাঙ্কো মেলে ধরা বস্তায় আটা চিনি ঢেলে নিল। এবার শাঙ্কো আঙ্গুল দিয়ে দানা মত জিনিসটার বস্তা দেখাল। দোকানি হেসে সে সব এক পাত্র দিল। শাঙ্কো সব নিয়ে বস্তাটা কাঁধে তুলতেই একজন ওদেশীয় লোক অদ্ভুত ভাষায় শাঙ্কোকে কিছু জিজ্ঞেস করল। শাঙ্কো হেসে মুখের সামনে আঙুল ছোঁয়ালো। অর্থাৎ ও বোবা। শাঙ্কো আর দাঁড়ালে না। বালি ভরা রাস্তায় নেমে এল। ওপাশে তাকাতেই দেখল একটা বুড়ো পাঁচ ছটা বড় বড় বুনো মুরগী নিয়ে বসে আছে। কতদিন পেট পুরে মাংস খাওয়া হয় না। শাঙ্কো বুড়োটার কাছে গেল। মুরগী গুলোর পায়ে দঁড়ি বাঁধা। শাঙ্কো বুঝল। সব কটা মুরগী নেওয়া যাবে না। ও আবার গাঁট থেকে একটা ছোট সোনার চাকতি বের করে বুড়োকে দিল। বুড়োঝুঁকে পড়ে ঐ চাকতি সোনার বুঝতে পেরে মুখ তুলে ফোকলা মুখে হাসল। শাঙ্কো বস্তা নামিয়ে চারটে মুরগীর পাগুলো দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধল। তারপর বস্তা কাঁধে তুলে নিয়ে দড়ি বাধা মুরগীগুলো ঝুলিয়ে সমুদ্রের দিকে চলল। শুরু হল মুরগীগুলোর কোকরকে ডাক। শাঙ্কো নির্বিঘ্নেতে সমুদ্র তীরে পৌঁছল। আবছা অন্ধকারে দেখল নোঙর করা জাহাজটা জনশূন্য। ঢেউয়ের ধাক্কায় দুলছে। নৌকো টেনে জলে নামিয়ে বস্তা মুরগীগুলো রাখল। তারপরদাঁড় তুলে নিয়ে নৌকো চালাল। কয়েকজন ডেক-এ ছিল তারা মুরগীর ডাক শুনল। তাড়াতাড়ি সেই কজন ছুটে এল। নৌকো বেঁধে শাঙ্কো দড়ির সিঁড়ি বেয়ে ডেক-এর কাছে উঠে এল। বন্ধুরা ধরাধরি করে বস্তাটা নামল। মুরগীগুলো নিয়ে ছুটল সিঁড়ির দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাইকিংদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। শাঙ্কো খাবার দাবার তো এনেছেই সঙ্গে বড় বড় চারটে বুনো মুরগীও এনেছে।
রাতে পেট ভরে খেল সবাই। আটা চিনি আর ঐ দানাগুলো মিশিয়ে যে খাবার রাঁধুনি বন্ধু তৈরি করল তার স্বাদই হল আলাদা। রাঁধুনি বন্ধুটির খুব প্রশংসা করল সবাই। কতদিন পরে পেট ভরে খেল সবাই।
রাতে রান্না করা খাবার কাঠের থালায় করে রাধুনি ফ্রান্সিসের কেবিন ঘরে এল। ফ্রান্সিস বলল-রাজকুমারীর খাবারও এখানে দিয়ে যাও। ওকে আমার সামনে খেতে হবে। রাঁধুনি মারিয়ার খাবারও দিয়ে গেল। মাংস অবশ্য দুটুকরোর বেশি কেউ পেল না। তবু সুস্বাদু রান্না। খাওয়া শেষ করে মারিয়া বলল–যাই আরো দুটো মোটা রুটি নিয়ে আসি।
যদি বাড়তি থাকে তবেই এনো। ফ্রান্সিস বলল।
রুটি দুটো খাওয়া হলে মারিয়া বলল-রাঁধুনি বন্ধুর রান্নার হাত এত ভালো যে এই অদ্ভুত রান্নাও কী সুস্বাদু হয়েছে।
–তা ঠিক। তবে খিদের মুখে রান্না করা সব কিছুরই স্বাদ বেড়ে যায়। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে বলল। তখনই হ্যারি এল। ফ্রান্সিস বলল হ্যারি পেট ভরে খেয়েছো তো?
–হ্যাঁ হ্যাঁ। শাঙ্কো সত্যিই বুদ্ধিমান। হ্যারি হেসে বলল।
–আমি সেটা ভালো করে জানি। ফ্রান্সিস বলল।
–এই পাঁচ মিশেলি রান্না আমার তো কেকেএর মত খেতে লাগল। মারিয়া বলল। ফ্রান্সিসআর হ্যারি দুজনেই হেসে উঠল। মারিয়া একটু মনক্ষুণ্ণ হয়ে বলল–যা প্রশংসার আমি নির্দ্বিধায় তার প্রশংসা করে থাকি।
মাননীয় রাজকুমারী আমাদের মাপ করবেন। হ্যারি বলল।
যাক গে– ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি এই সম্বন্ধে আমাদের কোন ধারণাই নেই। এখানকার অধিবাসী কারো সঙ্গে আমাদের একটা কথাও হয়নি কাজেই রাতের অন্ধকারে ওরা যদি দল বেঁধে আমাদের জাহাজে আক্রমণ করে আমরা বিপদে পড়বো। কাজে নজরদার পেড্রোকে বলো গে–ও যেন সজাগ থাকে।
পেড্রোর ওপর ভরসা রাখো। হ্যারি হেসে বলল।
-ভরসা তো রাখতেই চাই। কিন্তু আগে দু-তিনবার ও আমাদের সাংঘাতিকবিপদে ফেলেছিল।
–তা ঠিক। যা হোক অনেকদিন পরে পেট ভরে খেয়ে সত্যিই আজ শরীরটা অনেক স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। ফ্রান্সিস বলল হ্যারি–দেখবে আজ রাতে ঘুমও ভালো হবে। ক্ষুধার্ত মানুষের ঘুম আসতে চায় না। তন্দ্রামত আসে। ক্ষুধা মানুষকে কী অস্থির করে তোলে কী দুর্বল করে শরীরে যেন সাড় থাকেনা, –এটা যার অভিজ্ঞতা নেই সে কিছুবুঝবেনা। আমার তো মনে হয়–মানুষের ক্ষুধার অভিজ্ঞতা থাকা উচিত। কয়েকদিন হলেও। তাহলেই সে ক্ষুধার্ত মানুষকে ঠিক বুঝতে পারবে। তখন আমরা সবাই কাছাকাছি আসতে পারবো। পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হবো। সব মানুষকে ভালোবাসতে পারবো। উপলব্ধি করতে পারবো সবার দুঃখ বেদনা। ফ্রান্সিস তুমি এসব ভাবো? একটু অবাক হয়ে হ্যারি বলল।
