না। জাহাজ ঘাটের চেয়ে একটু দূরেই থাকুক। সন্ধ্যে হতে বেশি দেরি নেই। আমরা তৈরি হয়ে নামতে নামতে সন্ধ্যা হয়ে যাব। অন্ধকার নেমে আসবে। অজানা অচেনা জায়গা। কোন দ্বীপনা দেশের অংশ তাও জানি না। কী ধরনের লোক এরা জানি না। সকালে নেমে গিয়ে কথা বলা যাবে। তখন জানা যাবে এটা কোন দ্বীপ বা কোন দেশের অংশ কিনা। কোন যোদ্ধাটোদ্ধা তো দেখা গেল না। তবু সাবধান থাকা ভালো। একটা জায়গা যখন তখন নিশ্চয়ই রাজাটাজা নয় তো কোন উপজাতির সর্দার গোছের কেউ আছে।
–তাহলে কাল সকালে নামবে। হ্যারি জিজ্ঞাসা করল।
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস মাথা ওঠানামা করল।
–কিন্তু ফ্রান্সিস–বলছিলাম–ক্ষুধা তৃষ্ণা নিয়ে কত দিন কাটছে আমাদের তার তো হিসেব নেই। আমাদের কথা ছেড়ে দাও। রাজকুমারীও যে কতদিন না খেয়ে আছেন তুমি তা জানো না। হ্যারির কথা শেষ হতেই মারিয়া চমকে উঠে বলল–হ্যারি।
একবার ভালো করে রাজকুমারীর শুকনো রোগাৰ্ত মুখের দিকে চেয়ে দেখ। হ্যারি মৃদুস্বরে বলল।
–হ্যারি কী বলছো সব? ফ্রান্সিস অবাক হয়ে গেল।
ফ্রান্সিস এবার মারিয়ার মুখের দিকে তাকাল। সত্যিই রাজকুমারীর মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে বেশ কালচে ভাব। ফ্রান্সিস একটু ক্ষুব্ধস্বরে বলল–তাহলে তুমি আমাকে মিথ্যে কথা বলেছো। হ্যারি বিব্রত হল। বলে উঠল–
–ফ্রান্সিস মাননীয়া রাজকুমারী কক্ষণো মিথ্যে কথা বলেন না। কিন্তু তুমি যাতে উদ্বিগ্ন না হও তুমি যাতে তাঁর স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকো তাই তিনি তোমাকে মিথ্যে বলতে বাধ্য হয়েছেন। রাজকুমারীর কোন দোষ নেই।
ফ্রান্সিস আর কোন কথা বলল না। হ্যারি বলল–তাই বলছিলাম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের অন্তত কয়েকদিনের মত খাদ্য জল সংগ্রহ করতে হবে। বলা যায় না এখন আমরা যদিহঠাৎ আক্রান্ত হই এত দুর্বল শরীর নিয়ে আমার সর্বশক্তি দিয়ে তরোয়াল চালাতে পারবো না।
–ঠিক আছে। বলো কী করতে চাও। ফ্রান্সিস শান্তভাবে বলল। যতখানি খাদ্য জল সংগ্রহ করা সম্ভব আজকে সন্ধ্যের মধ্যেই তা এখান থেকে জোগাড় করতে হবে। হরি বলল।
–হ্যাঁ। তবে দু’তিনজন নয়। শাঙ্কো একা যাবে। আমাদের নৌকায় চড়ে। যতটা পারে খাদ্য নিয়ে আসবে। জল যা আছে আরো কয়েকদিন চলে যাবে। হ্যারি বলল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকাল।
আমি একাই যাবো। কাজ সেরে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালিয়ে আসবো। শাঙ্কো বলল।
-তোমার উপর সেই বিশ্বাস আছে আমার শাঙ্কোর। ফ্রান্সিস বলল।
ভিড় ভেঙে গেল সবাই চলে এল। দু’একজনের সঙ্গে শাঙ্কো রেলিং ধরে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে দূরের লোকজন দেখতে লাগল। দেখল ঐ লোকজনদের মাথার চুল লম্বা। উঁচু করে চুড়ো বাঁধা। কয়েকজনকে দেখল খালি গা। গলায় ঝুলছে লাল সূতোর মোটা মালা মত। পরনে মোটা কাপড়ে নানারঙের সূতো দিয়ে ফুল পাতা ভোলা। প্রায় ঐ রকম লম্বা চুল উঁচু করে চুডোর মত বাঁধা। শাঙ্কো মাথা নিচু করে ছক ভেবে নিল। তারপর দ্রুতপায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ফ্রান্সিসের কেবিন ঘরে নেমে এল। ফ্রান্সিস বিছানায় বসে ছিল। মারিয়া মাথার চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ফ্রান্সিসের সঙ্গে কথা বলছিল। দুজনেই শাঙ্কোর দিকে তাকাল।
শাঙ্কো বলল রাজকুমারী আপনার ফুলপাতা আঁকা একটা গাউন আছে না? মারিয়া অবাক। বলল- তো। ওটা কোমরের কাছেকাটুন আর নিচেরনীল কাপড়ের ঝালরটা কেটে ফেলুন। মারিয়ার বিস্ময় আরো বাড়ল। কিন্তু মারিয়া কিছু বলার আগেই শাঙ্কো বলল পরে সব বলবো। আমি আসছি।
-কিন্তু আমি তো এখন সূর্যাস্ত দেখতে যাবো। মারিয়া বলল।
–আজকে না হয় নাই গেলেন। কাজটা সেরে রাখুন। তাড়াতাড়ি সারতে হবে সব। শাঙ্কো দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেল।
কিছু পরে শাঙ্কো দু’টো বস্তা নিয়ে ফিরে এল।
দেখল রাজকুমারী সেই গাউনটা বের করে কাঁচি দিয়ে কাটছে। ফ্রান্সিস বলল– উঁহু। শাঙ্কো একটা বস্তা নিয়ে যাও। দুটো বস্তা কাঁধে নিয়ে দ্রুত ছুটতে পারবে না। আর বিপদ আঁচ করলেই সব ফেলে পালিয়ে আসবে।
–কিন্তু আটা চিনি তো আনতে হবে। শাঙ্কো বলল।
না আনতে পারলেও আর কয়েক দিন না খেলে মরে যাবো না। কিন্তু তোমার জীবনের মূল্য আমার কাছে অনেক। একটা বস্তাই নিয়ে যাও। চিনি পেলে যতটা পারো আটার সঙ্গেই মিশিয়ে নিয়ে আসবে।
-বেশ। তোমার কথার অবাধ্য হবো কী করে। ততক্ষণে মারিয়ার পোশাক কাটা হয়ে গেছে। টানা কাটায় মারিয়ার অভিজ্ঞ হাত। সেই বিচিত্র পোশাকটা নিয়ে শাঙ্কো চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে খালি পায়ে ঐবিচিত্র পোশাকটা পরেশাঙ্কো এল। মারিয়া তাই দেখে না হেসে পারলে না। এবার শাঙ্কো বলল রাজকুমারী–এবার আমার মাথার চুল। চুড়ো করে বেঁধে দিন। শাঙ্কোর চুল বেশ বড় বড়। জাহাজের জীবন। নিয়মিত তো চুল দাড়ি কাটা হয় না। মারিয়া আজও কিছু বুঝে উঠতে পারল না। হাসি মুখে শাঙ্কোকে বসিয়ে মাথার চুল আঁচড়ে চুড়ো করে বেঁধে দিল। শাঙ্কো উঠে দাঁড়াতে ঐ চুড়ো করে : বাঁধা চুল আর ঐ বিচিত্র পোশাক খালি গা দেখে মারিয়া মুখে হাত চাপা দিয়ে খিলখিল শ করে হেসে উঠল। ফ্রান্সিসও হাসি না চাপতে পেরে হেসে উঠল।
এবার আপনার মাথার চুল বাধার মোটা লাল ফিতে থাকলে দিন। মারিয়া হাসতে হাসতে ওর চামড়ার ঝোলা থেকে একটা লাল রঙের ফিতে বের করে দিল। শাঙ্কো গিট দিয়ে ওটা গলায় ঝোলালো। মারিয়া আবার হেসে উঠল। মারিয়াকে হাসতে দেখে ফ্রান্সিসের খুব ভালো লাগল। মারিয়া খুব খুশি হলে ঐ রকম খিখি করে হেসে ওঠে। ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া শাঙ্কোর এরকম অদ্ভুত সাজে সাজার কারণ আছে। শাঙ্কো খুব বুদ্ধিমান। শাঙ্কো হেসে বলল-রাজকুমারী তীরে কয়েকজন মানুষকে এরকম পোশাক পরে চলাফেরা করতে দেখেছি। এই পোশাকে তাদের সঙ্গে মিশে গেলে অনেক সহজে কার্যোদ্ধার করতে পারবো চলি।
