চারজন নৌকো করে চলল ডাইনীর দ্বীপের দিকে। ওরা যখন দ্বীপে গিয়ে নামল, বিস্কো ছুটে এসে ওদের জড়িয়ে ধরল। বিস্কোর শরীর খুব খারাপ হয়ে গেছে! জামা কাপড় শতছিন্ন। তবুও বেঁচে আছে, তাতেই সকলে খুশি হল। ওরা বলল–ফ্রান্সিস–বলেছে লা ব্রুশের সব গুপ্তধন নিয়ে যেতে। আমাদের ওখানে নিয়ে চলো।
বিস্কো বলল–তার আগে আমার আস্তানায় চলো। গায়ে নুন মেখে নিতে হবে।
সমুদ্রতীরের কাছেই যেখানে থেকে পাহাড়-জঙ্গল শুরু হয়েছে সেখানে রেন ট্রি গাছের পাতা, বাকল, এসব দিয়ে একটা ঘরমত তৈরি করা হয়েছে। বিস্কো বলল এই আমার আস্তানা। ও গাছের পাতার একটা বড় ঠোঙায় করে তেল মেশানো নুন নিয়ে এল।
–তুমি এসব পেলে কোথায়?
–সমুদ্রের জল থেকে নুন তৈরী করেছি–বিস্কো বলল–আর ঐ পূর্ব কোণায় একটা ঝর্ণার জলের সঙ্গে মেশানো এই তেল পেয়েছি। এই দুটো মিশিয়ে গায়ে মাখলে, জোঁক কামড়ে ধরলে সঙ্গে সঙ্গে মরে যায়। এই জিনিসটা ব্যবহার করতাম বলেই আমি এখনো বেঁচে আছি।
সকলেই সেই তেল-নুন গায়ে মেখে নিল। তারপর বিস্কো ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো। গাছগাছালি ঘেরা হাজার-হাজার জোঁকের জায়গাটা ওরা পেরোলো। ওদের জোঁকে কামড়ে ধরলো বটে, কিন্তু মুহূর্তেই মরে খসে পড়লো।
ওরা লা ব্রুশের গুপ্তধন রাখার গুহাটার কাছে এল। বিস্কো বলে দিলো কিভাবে পাথরের মুখটা সরাতে হবে। সবাই ধাক্কাধাক্কি করে নিরেট পাথারটা কিছুটা সরাল। তারপর সবাই ভেতরে ঢুকল। অন্ধকার গুহা। প্রথমে কিছুই দেখতে পেল না। অন্ধকারটা সরে আসতে ওরা দেখলো বেশ কয়েকটা নরকঙ্কাল পড়ে আছে। তার মধ্যে ওদেরদু’জন বন্ধুর কঙ্কালও রয়েছে। বিস্কো আসবার সময় পথে সব ঘটনা ওদের বলেছে। গুহাটার শেষের দিকে বেশ কয়েকটা বাক্স রয়েছে। ওপরে পেতলের কাজ করা। ওরা ঐ দুটো বাক্স নিয়ে জোঁকের জায়গাটা পেরিয়ে সমুদ্রের ধারে চলে এল। বাক্স দুটো নৌকায় তোলা হ’ল। বিস্কো আর একজন ভাইকিং নৌকায় চড়ে বাক্স দু’টো জাহাজে নিয়ে এলো। সবাই ছুটে এসে বিস্কোকে জড়িয়ে ধরলো। বিস্কোকে নতুন কাপড়-জামা দেওয়া হল। তারপর খাবার ঘরে নিয়ে যাওয়া হ’ল ওকে। এতদিন পরে বন্ধুদের দেখে ওর যেন কথা আর ফুরোতে চায় না। ফ্রান্সিস বলল–বিস্কো পরে সব শুনবো, এখন পেট পুরে খেয়ে নাও।
নৌকোটা একজন ভাইকিং চালিয়ে নিয়ে গেল ডাইনীর দ্বীপে, আবার গুপ্তধনের কাছে। গুহা থেকে দুটো ভারি বাক্স জাহাজে নিয়ে আসা হ’ল। সন্ধ্যের আগেই লা ব্রুশের অত সাধের গুপ্ত ধনভান্ডার শূন্য হয়ে গেল। সব জাহাজে তুলে নিয়ে আসা হলো।
বাক্সের তালাগুলো ভাঙা হলো। ফ্রান্সিস আর হ্যারি বাক্সগুলো খুলে-খুলে দেখলো। কত মোহর, কত জড়োয়ার গয়না। হীরে-মুক্তো বসানো ছোরা, ছোট আকারের তরবারি। কত বিচিত্র আকারের গয়নাগাঁটি। সকলেই এসে জড়ো হ’ল সেখানে। সকলের চোখেই বিস্ময়। এসব জিনিসের গল্পই শুনেছে ওরা। জীবনে কোনদিন দেখেনি।
সন্ধ্যের পরেই জাহাজ ছেড়ে দেওয়া হ’ল। শান্ত সমুদ্রের ওপর দিয়ে জাহাজ উত্তরমুখে যাত্রা শুরু করলো। ভাইকিংদের আজ খুব আনন্দের দিন। অত বড় দু’টো হীরে, মোহর, মণিমাণিক্য ভরা লা ব্রুশের লুটের সম্পদ সব আজ ওদের হাতে।
রাত্রিবেলা জাহাজের ডেক-এর ওপর নাচগানের আসর বসলো। সবাই নাচ-গানের তালে-তালে হাততালি দিতে লাগলো। জমে উঠলো আসর।
ফ্রান্সিসও ঐ আসরে কিছুক্ষণ বসেছিল। তারপর একটু রাত হতেই নিজের কেবিনে ফিরে এল। রাত্রে জাহাজ পাহারা দেবার জন্যে পাহরাদারের সংখ্যা বাড়াল ফ্রান্সিস। লা ব্রুশের মতো আবার কোন জলদস্যু যাতে অনায়াসে রাত্রির অন্ধকারে এসে জাহাজ খালি না করতে পারে। সকলেই ফ্রান্সিসের কথা মেনে নিল। দিনরাত সমানে জাহাজ পাহারা দিতে লাগল ওরা।
জাহাজ চললো। ফ্রান্সিসের ইচ্ছে মরিটাস দ্বীপের খোঁজটা নিয়ে যাওয়া। কথাটা ও হ্যারি আর অন্যান্য ভাইকিংদের বলল। অনেকেই জানতে চাইল, দ্বীপটা কোথায়? ফ্রান্সিস বলল–আমি সঠিক জানি না। তবে পশ্চিম আফ্রিকার কাছাকাছি কোথাও হবে। চাঁদের দ্বীপ থেকে খুব বেশি দূরে নয়। রাজপুরোহিত মরিটাস দ্বীপে এসে বসির আয়নাওয়ালার কাছ থেকে আয়না তৈরী করিয়ে নিয়ে যেতো। কাজেই মরিটাস বেশি দূরে হবে বলে মনে হয় না। আমাদের পূর্বদিকে যেতে হবে।
বেশির ভাগ ভাইকিং বন্ধুরা কিন্তু আপত্তি করল। বললো–আমরা অনেকদিন দেশ ছেড়ে এসেছি। সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত মূল্যবান হীরে আর লা ব্রুশের গুপ্তধন রয়েছে। আমাদের তাড়াতাড়ি দেশে ফিরতে হবে। পথে দেরি করলে কে জানে আবার কোনো বিপদে পড়বে কিনা। ফ্রান্সিস একটু ভাবল। তারপর ওদের কথাতেই রাজি হল! হ্যারিও
ওকে তাই বোঝাল। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিরাপদে দেশে ফিরতে হবে।
জাহাজ আর পূর্বদিকে ফেরানো হ’ল না। সবাই প্রচন্ড উৎসাহ নিয়ে জাহাজের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ল। গতি আরো দ্রুত হলো। দাঁড়িরা দাঁড় বইতে লাগল, আরো দুটো বাড়তি পাল লাগানো হলো। জাহাজ চলল পূর্ণ বেগে।
সমুদ্রপথে বার দুই-তিনেক ঝড়ের কবলে পড়তে হলো। তবে ঝড় খুব সাংঘাতিক কোন ক্ষতি করতে পারলো না। ভাইকিংরা প্রাণপণে ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করলো। যে করেই কে জাহাজটাকে অক্ষত রাখতে হবে। দু’একটা পাল ফেঁসেও গেল। এর চেয়ে বেশি কোন ক্ষতিল না।
