এদিকে ভাইকিংদের প্রায় না খেয়ে দিন কাটছে। খিদে অসহ্য হয়ে উঠলে ওরা পেট ভরে জল খাচ্ছে। এতে খিদেটা কমছে। ফ্রান্সিস থেকে শুরু করে সবারই এই অবস্থা। কিন্তু ফ্রান্সিস মারিয়াকেসতর্ককরে দিয়েছেএই বলে তোমাকে পেটপুরে খেতেইহবে। উপোষকরে থাকা তোমার চলবে না। উপোস করে থাকার অভ্যেস তোমার নেই। তাহলে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে। আমাদের বিপদ সমস্যা আরো বেড়ে যাবে। মারিয়া অবশ্য হেসে বলেছেনা না। আমি দুবেলাই পেট পুরে খাচ্ছি। তুমি আমার জন্য ভেবো না। কিন্তু মারিয়া আধ পেটা তো খাচ্ছেই না। মাঝে মাঝে না খেয়েও দু’তিন দিন কাটিয়ে দিচ্ছে। দুপুরে রাতে খাওয়ার সময় কেবিন ঘর থেকে বেরিয়ে ডেক-এ উঠে আসে। সময় কাটায়। তারপর কেবিন ঘরে এসে ঢোকে। ফ্রান্সিস একই দুর্বলস্বরে জিজ্ঞেস করে খেয়ে এসেছো তো?
হ্যাঁ হ্যাঁ। এই তো খেয়ে এলাম। হ্যারি কিন্তু মারিয়ার এই ফাঁকি একদিন ধরে ফেলল। যেটুকু খাবার জুটেছে তা খাবার সময় খাবার ঘরে ও মারিয়াকে দেখতে পাচ্ছিল না। দুদিন আগে হ্যারি তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে নিঃশব্দে ডেক-এ উঠে এসেছিল। দেখল মারিয়া রেলিং ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। হ্যারি কোন কথা না বলে নিঃশব্দে নেমে এল। পরিষ্কার বুঝতে পারল রাজকুমারী মাঝে মাঝে উপোষ করে থাকছে। এটা ফ্রান্সিসকে বুঝতেও দিচ্ছে না। কারণ তাহলে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ফ্রান্সিসের উদ্বেগ বাড়বে। ফ্রান্সিসের। ক্ষতি হবে।
সেদিন দুপুরে মারিয়া কেবিন ঘরে ঢুকতে ফ্রান্সিস যে সামান্য খাবার খাচ্ছিল তাই খেতে খেতে বলল–
-কী খেয়ে এলে?
–হ্যাঁ। মারিয়া মাথা কাত করে বলল।
–ভালো করে খেয়েছে তো? ফ্রান্সিস তবু বলল।
–হ্যাঁ হ্যাঁ। মারিয়া মৃদু হেসে বলল।
এবার শুয়ে পড়ো। বিশ্রাম করো। ঘুমোও। মারিয়া শুয়ে পড়ল। না খেয়ে থাকতে থাকতে খিদের বোধটাই যেন নেই আর। কোনদিন তো খিদে কাকে বলে ও জানতো না। ক্ষুধার্ত মানুষের ঘুম আসতে চায় না। এই সত্যটা মারিয়া এবার জানতে পারল। সত্যি। ক্ষুধার্ত মানুষেরা ঘুমিয়ে একটুশান্তি পাবে তারও উপায় নেই। ফ্রান্সিস চোখ বুজে চুপ করে শুয়েছিল। একই কারণে ওরও ঘুম আসছিল না। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে মারিয়া উঠে পড়ল। বলল–বড্ড গরম লাগছে। একটু ডেক-এ হাওয়া খেয়ে আসি। মারিয়া ডেক-এ উঠে এল। ফ্রান্সিস অবশ্য সিঁড়ি দিয়ে বেশি ওঠানাম করে না। শুয়ে থাকে।
ডেক-এ উঠে এসে মারিয়া দেখল আকাশ মেঘ শূন্য। শেষ বিকেলে সূর্য পশ্চিম দিগন্তে অনেকটা নেমে এসেছে। অস্ত যেতে খুব বেশি দেরি নেই। আকাশে রোদ উজ্জ্বল। চারপাশে সমুদ্রের জলের মাথায় রোদের ঝিকিমিকি। তখনই কানে এল মাস্তুলের ওপর থেকে নজরদার পেড্রোর চিৎকার ভাই সব ডাঙা ডাঙা দেখা যাচ্ছে। বাঁদিকে। ক্ষুধার্ত ভাইকিংদের কারো চোখে ঘুম নেই। কেবিনঘরে ডেক-এর ওপরে শুয়ে ছিল সবাই। ফ্লেজার নিঃশব্দে জাহাজের হুইল ধরে ছিল। পেড্রোর চিৎকার করে বলা কথা অনেকের কানেই গেল। ডেক-এ শুয়ে থাকা মাস্তুলের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে থাকা শাঙ্কোরা কেবিন ঘর থেকে অন্য বন্ধুরা ছুটে এসে ডেক-এ জড়ো হল। রেলিং ধরে দাঁড়াল। বিকেলের আলোয় মারিয়া আর অন্য বন্ধুরা দেখল ডানদিকে–তীর ভূমি। একটা কালো রঙের টিলা মাথা উঁচিয়ে আছে। তার নিচে বিস্তৃত সবুজ বনভূমি। উঁচু উঁচু গাছ ঝোঁপ ঝাড়। ফ্লেজার জাহাজের তীরভূমির দিকে চালাতে লাগল। হ্যারি শাঙ্কোকে ডেকে বলল–যাও ফ্রান্সিসকে খবর দাও। উপবাস ক্লিষ্ট মানুষগুলোর মধ্যে যেন নবজীবনের সঞ্চার হল। যাক খাদ্য জল তো পাওয়া যাবে।
জঙ্গলা জায়গাটার পরেই দেখা গেল বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি ঢালু হয়ে সমুদ্রের তীরে নেমে এসেছে। একটা ছোট বন্দর মত। একটা ছোট জাহাজ নোঙর করা আছে। বালিয়াড়ির পরেই দুধারে পাথরের কাঠের শুকনো ঘাসপাতার ছাউনি নিয়ে সারি দিয়ে কিছু বাড়ি ঘর। ফেরি জাহাজ চালাতে চালাতে ফ্লেজার সমুদ্রের জলের গভীরতা আন্দাজ করে বুঝল এখানে তীর ভূমিতে জাহাজ ভেড়ানো যাবে। কিন্তু ফ্রান্সিস আজও ডেক-এ উঠে আসে নি। ফ্রান্সিস আসুক। ফ্লেজার আস্তে আস্তে জাহাজ থামাল।
তখন ফ্রান্সিস সাবধানে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এসেছে। রেলিং ধরে দাঁড়ানো মারিয়া হ্যারিদের ভিড়ের কাছে এল ও। ফ্রান্সিসকে দেখে হ্যারি তাড়াতাড়ি ওর কাছে ছুটে এল। বলল কী করবে?
দাঁড়াও। আগে সব দেখি টেখি। ফ্লেজারের কাছে চলো। দুজনে ফ্লেজারের কাছে এল।
–ফ্লেজার কী মনে হয়? এখানে জাহাজ ভেড়ানো যাবে? ফ্রান্সিস বলল।
মনে হয় যাবে। একটা জাহাজও নোঙর বাঁধা দেখছি। তার মানে এখানে জাহাজ ভেড়ানো হয়। একটা ছোট খাটো বন্দরই বলা যায়। ফ্লেজার বলল।
–ঠিক আছে। এখনই ভিড়িও না। ভালো করে আগে সব দেখি। দুজনে রেলিং এর কাছে এল। রেলিং ধরে দাঁড়াল। শেষ বিকেলের আলোয় দেখা গেল বেশ কয়েকটা দেশীয় নৌকাও বাঁধা আছে ঘাটে। তীরে ওখান থেকেই বালি ভরা পথ মত চলে গেছে বাড়ি ঘরগুলোর মাঝখান দিয়ে পশ্চিম মুখো। কিছু লোকজন দেখা গেল–কিছু দূরে বালি ভরা রাস্তায় তাদের হাতে কোন অস্ত্রশস্ত্র নেই। বোঝা গেল সাধারণ মানুষ যোদ্ধা নয়।
–এখন নামবে? হ্যারি ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল।
