ফ্রান্সিস হ্যারিক সঙ্গে নিয়ে জাহাজ চালক ফ্লেজারের কাছে এল। বলল–ফ্লেজার। দিকঠিক রেখেই চালাচ্ছে তো!
-হ্যাঁ হ্যাঁ। ফ্লেজার মাথা কাত করে বলল।
জাহাজের গতি কেমন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
দিনের বেলা বাতাস পড়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যের পরই বাতাসের জোর বেড়েছে। এখন গতিবেগ ভালোই।
জাহাজ উত্তর পশ্চিম দিকে চালাচ্ছো তো? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। আমাদের দেশ তো ঐদিকেই। ফ্লেজার বলল।
–কিন্তু ফ্লেজার আমরা পথ হারাই নি তো?
—খুব জোর দিয়ে বলতে পারছি না। কারণ কোন দ্বীপে বা দেশের অংশেনা পৌঁছাতে পারলে কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু দ্বিধার সঙ্গে ফ্লেজার বলল?
-কিন্তু আমি বন্ধুদের কী বললাম শুনেছো তো?
–হ্যাঁ। শুনেছি। ফ্লেজার বলল।
জাহাজে খাদ্য ও জলের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। কাজেই যে করে তোক ডাঙায় আমাদের পৌঁছাতে হবে। সে কোন জঙ্গলেই তোক বা পাহাড়ি এলাকায়ই হোক। জঙ্গলে পৌঁছলে খাবার মত ফলটল পাবো। পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছলে ঝর্ণার জল পাবো। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল–উত্তর পূর্ব নয়–সোজা পূর্ব দিকে জাহাজ চালাও। দেশের দিকে নয়। জাহাজের মুখ ঘোরাও। আগে তো প্রাণে বাঁচি দেশে পৌঁছতে না হয় কিছুদিন দেরিই হোক।
–বেশ। জাহাজের মুখ ঘোরাচ্ছি। ফ্লেজার বলল।
জাহাজ চলল। সব ভাইকিং বন্ধুরা, ফ্রান্সিস মারিয়াও কম খাবার কম জল খেতে লাগল।
দিন যায়। রাত যায়। নজরদার পেড্রোর চোখে ঘুম নেই। বিশ্রাম নেই ওর। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি খুঁজছে গাছপালার আভাস। মাটি পাহাড়। কিন্তু সে সবের দেখা নেই। এক বেলা খাওয়া আর সামান্য জল খাওয়া চলল। সবাই বেশ দুর্বল হয়ে পড়ল। মারিয়া তো খাওয়া প্রায় ছেড়েই দিল।
–হ্যাঁ হ্যাঁ। এইমাত্র খিয়ে এলাম। ফ্রান্সিস আর কিছু বলে না।
সেদিন সূর্যাস্ত দেখবে বলে মারিয়া জাহাজের ডেক-এ উঠে এল। সূর্য পশ্চিম দিগন্তে অনেকটা নেমে এসেছে। দক্ষিণ দিকে তাকাতেই মারিয়ার বুক কেঁপে উঠল। দক্ষিণ দিগন্ত থেকে ঘন কালো মেঘ এসেছে। বেশ দ্রুতই উঠে আসছে মাঝ আকাশের দিকে। বাতাস পড়ে গেছে। রোদের তেজ অনেক কমে গেছে। শাঙ্কোর উচ্চস্বর শোনা গেল–ভাই সব, ঝড় আসছে? তৈরি হও। ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি শুরু হল। কিন্তু সকলেরই শরীর আধপেটা খেয়ে সামান্য জল খেয়ে খেয়ে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই দুর্বল শরীর নিয়েই ঝড় বৃষ্টির সঙ্গে লড়তে হবে। অনেকেই বেশ চিন্তায় পড়ল।
দক্ষিণ আকাশ থেকে ঘন কালো মেঘ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মাঝ-আকাশে উঠে আসতে লাগল। সূর্য ঢাকা পড়ে গেল। অন্ধকার হয়ে এল আকাশ সমুদ্র। অন্ধকার আকাশ চিরে শুরু হল আঁকাবাঁকা বিদ্যুতের ঝলকানি। ভাইকিংরা দ্রুত পাল নামিয়ে ফেলল। দাঁড় বাওয়া আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সবাই ডেক-এ এসে জড়ো হল। প্রচণ্ড ঝড়ের সঙ্গে ওরা লড়তে অভ্যস্ত। ঝড়ের প্রথম ধাক্কাটা সামলাবার জন্যে সবাই মাস্তুলের পালের কাঠের দড়িদড়া ধরে তৈরি হল। কিন্তু আধপেটা খেয়ে তৃষ্ণায় দুর্বল সবাই। ওদের নির্ভীক মনে একটু সন্দেহের অনুভূতিও জাগল। এই দুর্বল শরীরে কতক্ষণ লড়তে পারবে ঝড়ের সঙ্গে। হ্যারি ছুটে এল শাঙ্কোদের কাছে। চিৎকার করে বলল শাঙ্কো শিগগির নিচে যাও কয়েকজন। তিনটে জলের পীপেই নিয়ে এসো। ডেক-এ রাখো। যতটা সম্ভব বৃষ্টির জল ধরে রাখে। এই সুযোগ কাজে লাগাও। পানীয় জলের সমস্যাটা কিছু দিনের জন্যে মেটানো যাবে। শাঙ্কোরা তিন চারজন ছুটল সিঁড়ির দিকে খালি জলের পীপে আনতে।
দেখতে দেখতে প্রচণ্ড জোরে ঝড় ঝাঁপিয়ে পড়ল। জাহাজের ওপর। ঝড়ের প্রথম ধাক্কায় জাহাজটা কাত হয়ে গেল। পরক্ষণেই সোজা হল। শুরু হল বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি। বিদ্যুতের ঝলকানি আর বাজ পড়ার মুহুর্মুহু গম্ভীর ধ্বনি আর মুষলধারে বৃষ্টি। দুর্বল শরীর নিয়েও ভাইকিংরা ঝড়বৃষ্টির সঙ্গে লড়াই চালাল। দু’চারজনের দড়িধরা হাতের মুঠি ঝড়ের ঝাপটায় আলগা হয়ে গেল। ছিটকে ডেক-এর ওপর পড়ে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে পরক্ষণেই উঠে এসে দড়ি চেপে ধরতে লাগল। ঝড়ের তাণ্ডব চলল।
ভাইকিংদের সৌভাগ্য বলতে হবে ঝড়বৃষ্টি বেশিক্ষণ চলল না। বৃষ্টি আস্তে আস্তে কমে গেল। ঝড়ের ঝাপটার তীব্রতাও কমল। বিদ্যুৎ ঝলকানি আর বজ্রনাদ অবশ্য চলল কিছুক্ষণ।
আস্তে আস্তে মেঘ কেটে গেল। বিদ্যুতের ঝলকানি বন্ধ হল। বন্ধ হল বজ্রধ্বনি। আকাশ পরিষ্কার হল। পশ্চিম আকাশে ডুবে গেছে সূর্য। কমলা রঙের আভা তখনও লেগে আছে পশ্চিম দিগন্তের কাছে। একটা দুটো করে তারা ফুটতে লাগল।
দুর্বল শরীর নিয়ে অসহ্য ক্লান্তিতে বেশ কয়েকজন ভাইকিং ডেক-এর ওপর শুয়ে রইল। বৃষ্টিতে ভেজা সসপে পোশাক গায়ে। শাঙ্কোরা কয়েকজন পীপের কাছে ছুটে এল। দেখল–বেশ বৃষ্টির জল জমেছে পীপে তিনটেতে। ওদের মুখে হাসি ফুটল। হ্যারি এসে পীপের জল দেখে বলে উঠল সাবাস শাঙ্কো। শাঙ্কোরা কয়েকজন পীপে তিনটে কাঁধে নিয়ে সিঁড়ির দিকে চলল। যাক কিছুদিনের জন্যে খাবার জলের সমস্যা মিটল।
জাহাজ চলল। কিন্তু সেই এক ঘেয়েমি সীমাহীন জলরাশি চারদিকে। ডাঙার দেখা নেই। পেড্রো মাস্তুলের মাথায় নিজের জায়গায় বসে চারদিকে নজর রাখছে। কিন্তু কোথায় ডাঙা? কোথায় মাটি পাহাড় সবুজের ছোঁয়া। পেড্রোকে দুপুরে খাওয়ার সময় এক ডাকা হয়। রাতে তো খাওয়া বন্ধ। পেড্রো তাড়াতাড়ি নেমে আসে। খেয়ে নিয়েই আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসে। তৃষ্ণায় জল পাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু খাওয়া তো সামান্য। দুর্বল শরীরেও বড় ক্লান্তি নেমে আসে। দিনের বেলা খেয়ে এসে নিজের ছোট্ট গোল ঘরের জায়গায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়। তারপরেই শুরু হয় সারারাত জেগে তীক্ষ্ণ নজরদারি। কিন্তু ডাঙা কোথায়? ডাঙার দেখা নেই।
