সেদিন পূর্ণিমার কাছাকাছি সময়। নক্ষত্র ছাওয়া কালো আকাশে উজ্জ্বল প্রায় গোল চাঁদ জ্যোৎস্না ছাড়িয়েছে ডেউয়ের মাথায় অনেক দূর পর্যন্ত। হাওয়া ছুটেছে শন্ শন্। জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়াল সিনাত্রা। জ্যোৎস্না ধোয়া সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ওর ক্ষুধা তৃষ্ণাকাতর শরীর যেন রোমাঞ্চিত হল। ও চিৎকার করে বলে উঠল –হে পৃথিবী তুমি কী সুন্দর। দুজন চারজন করে অনেকেই ডেক-এ উঠে এল। কিছুক্ষণের মধ্যে ফ্রান্সিসও হ্যারি আর মারিয়াকে নিয়ে ডেক-এ উঠে এল। শাঙ্কো নিয়ে এসেছে একটা খালি পীপে। গান নাচের সঙ্গে তাল দেবে বলে। দাঁড়িয়ে থাকা সিনাত্রার চারপাশে গোল হয়ে বসল সবাই। সিনাত্রা ওর সুরেলা কণ্ঠে গান ধরল–
স্বদেশ তুমি স্বদেশেই থাকো।
আমি তো সারা বিশ্বের।
এই সাগরই আমার ঘরবাড়ি।
এই সাগরই আমার মা
এই মায়ের কোলই আমার শেষ শয্যা।
নাচের গান নয়–টানা বড় সুন্দর সুরের গান। সিনাত্রার সুরেলা কণ্ঠের গান চলল। শাঙ্কো পীপে হাত ঠুকে বাজাতে ভুলে গেল। মারিয়ার চোখে তো জল এসে গেল। হ্যারিও মুখ নিচু করে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ঘিরে বসা বন্ধুদেরও মন বিষণ্ণ হল। ফ্রান্সিস একবার চারদিকে তাকিয়ে নিল। বুঝল সিনাত্রার কণ্ঠের জাদুতে গানটা বড় সুন্দর। কিন্তু এই বিষাদের গান সুর মনকে দুর্বল করে দেয়। ফ্রান্সিস বলে উঠল-সিনাত্রা আনন্দের গান গাও, সুখের গান গাও। জানো তো –দেশের পাহাড়ি এলাকায় যখন বরফ গলে গিয়ে প্রথম কচিকচি সবুজ ঘাস গজিয়ে ওঠে–মেষ পালকেরানবজীবনের গান গাইতে গাইতে ভেড়ার পাল নিয়ে যায়, সেই আনন্দ উল্লাসের গান গাও! সিনাত্রা হেসে বলল, বেশ। আবার সিনাত্রা গান ধরল
কিন্তু রাজকুমারী নই। তোমাদের মতই একজন। মারিয়া একটু অভিমানের সুরে বলল।
–এটা ভালো করেই জানি। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল
মারিয়া–এরকম কথা তোমাকে আগে কোনদিন বলিনি। আজ কেন বললাম জানোবাবা-মার জন্যে দেশের কথা ভেবে ভেবে এতদিন পরে তোমার মন অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। তাই তোমার মনে সাহস জোগা। ক্ষুধাতে তৃষ্ণার সঙ্গে লড়াই করতে যাতে মনকে শক্ত রাখতে পারো তাই এসব কথা বলা। রাজকুমারী বলে তোমাকে এসব কথা বলিনি। মারিয়া কিছুক্ষণ ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল –তুমি আগে থেকে অনেককিছু ভেবে রাখো।
নইলে আমাদের আর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী বলা হয় কেন। যাক গে–শোন– আমাদের এখন সাবধান হবার সময় হয়েছে। তুমি হ্যারিকে এখানে আসতে বলল। আমি এখন সিঁড়ি দিয়ে বেশি ওঠানামা করতে চাই না। পা দুটোকে যথাসাধ্য বিশ্রাম দিচ্ছি। মারিয়া উঠে হ্যারিকে খবর দিতে চলল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই হ্যারি এল। বলল কী হয়েছে ফ্রান্সিস? তোমাকে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে।
–স্বাভাবিক। জাহাজে খাদ্যাভাব, জলের অভা চলছে। কিছুদিনের মত খুব ভেবে চিন্তে আমাদের চলতে হবে।
–এসব তো নতুন কিছু নয়। এই সমস্যা তো এর আগে হয়েছে। হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ। ডাঙায় পৌঁছেতেই হবে। খাদ্য চাই, জল চাই।
–কিন্তু কী করবে? ফ্লেজার তো অভিজ্ঞ হাতেই জাহাজ চালাচ্ছে। পেড্রো মাস্তুলের ওপর থেকে দিনরাত নজর রেখে চলেছে। ও না অসুস্থ হয়ে পড়ে।
–আমরাও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারি। এখন আমরা যাতে আরো কিছুদিন সুস্থ থেকে, চি, ডাঙার সন্ধান করতে পারি তার ব্যবস্থা করতে হবে। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল– রাতের খাবার খেয়ে সবাইকে ডেক-এ আসতে বলে। আমার কিছু বলার আছে।
বেশ বলছি। হ্যারি চলে গেল।
রাতের খাওয়া শেষ হল। ভেন বাদে আর সব ভাইকিং বন্ধুরা জাহাজের ডেক-এ উঠে এল।
মেঘমুক্ত আকাশে অনেক তারার ভিড়। সারাদিন গুমোটের পর জোর হাওয়া ছুটেছে। আধভাঙা চাঁদের আলো পড়েছে সমুদ্রের জলের ঢেউয়ের মাথায়। সবাই জড়ো হতে ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে ডেক-এ উঠে এল। পেছনে মারিয়াও এল।
ফ্রান্সিস বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে বলতে লাগল।–ভাই সব। আমরা খাদ্য ও পানীয় জলের সমস্যার মুখোমুখি পড়েছি। এরকম সমস্যায় এর আগেও পড়েছি। তখন দেখা গেছে জল কষ্ট সহ্য করতে না পেরে বুদ্ধি হারিয়ে দু-একজন সমুদ্রের নোনা জল খেয়েছে। তারপরেই যা হওয়ার হয়েছে। বমি করেছে, মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। কষ্ট বেড়েছে আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমি প্রথমেই সাবধান করে দিচ্ছি-দাঁত চেপে জল তেষ্টা সহ্য করবে। সমুদ্রের নোনা জল খাবে না। এতে খুব কষ্ট হবে। কিন্তু ক্ষুধার সঙ্গে জল তেষ্টার সঙ্গে লড়াই করার বাড়তি শক্তি শরীরে থাকবে। ফ্রান্সিস থামল।
সবাই নিশ্চুপ। শুধু দুরন্ত বাতাসের শন শন শব্দ শোনা যাচ্ছে। সব বন্ধুরা মনেযোগ দিয়ে ফ্রান্সিসের কথা শুনতে লাগল ফ্রান্সিসের ওপর ওদের অগাধ বিশ্বাস। ওরা জানে বিপদের মুখে ফ্রান্সিস কক্ষণো বিচলিত হয় না। বরং আরো বেশি ধীর স্থির হয়। অবশ্য তরোয়ালের লড়াই চালাবার সময় কিন্তু ফ্রান্সিসের অন্য রূপ। দৃঢ় মুখ। চোখে শ্যোন দৃষ্টি। টান টান শরীর। ফ্রান্সিস বলতে লাগল ভাইসব — জাহাজে অল্প দিনের মধ্যেই ভীষণ খাদ্যাভাব জলের অভাব দেখা দেবে যদি না এর মধ্যে আমরা ডাঙায় পৌঁছে খাদ্য ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে পারি। তাই বলছি কাল থেকে যতট পারো কম খাবার খাবে আর কম জল খাবে। অন্তত ডাঙার সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত। নজরদার পেড্রো রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে নজর রেখে চলেছে। ডাঙার দেখা আমরা পাবোই। আমরা বীরের জাতি। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় অসহায়ভাবে মৃত্যু আমরা মেনে নেবনা। আমার যা বলার বললাম। আমার বিশ্বাস আমরা আমাদের সঙ্কল্পে অটল থাকতে পারবো। ফ্রান্সিস থামল। উৎসাহিত বন্ধুরা ওদের সংকল্পের ধ্বনি তুলল ও-হো-হো… মৃদুস্বরে কথা বলতে বলতে সবাই সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতে লাগল। শুধুশাঙ্কো বিনেলো আর অন্য দুএকজনকে নিয়ে ডেক-এর ওপর শুয়ে পড়ল। বৃষ্টি না হলে শাঙ্কো বরাবর ডেক-এ শুয়ে ঘুমোয়। তবে ঘুমের মধ্যেও ও সজাগ থাকে। বলা যায় না– পেড্রোর নজর এড়িয়ে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ওঠা কোন জলদস্যুদের ক্যারাভেন একেবারে কাছে চলে আসতে পারে। বিদেশি লোকরাও নৌকোয় চড়ে এসে ওদের আক্রমণ করতে পারে। সে সময় শাঙ্কোরা চিৎকার করে বন্ধুদের ঘুম। ভাঙিয়ে সেই অতর্কিত আক্রমণের মোকাবিলা করতে পারবে।
