এক সকালে ফ্রান্সিস হ্যারিকে ডেকে বলল, হ্যারি, আমি এখন অনেকটা সুস্থ। আর এখানে পড়ে থেকে কী হবে? জাহাজ ছাড়তে বলল। উত্তরমুখো। দেশের দিকে। হ্যারি শাঙ্কোদের ডেকে বলল সে কথা। সবাই আনন্দে হৈ হৈ করে উঠল। পাল খাটাল। জাহাজ ছেড়ে দিল। কয়েকজন চলে গেল দাঁড়ঘরে। দ্রুত দাঁড় বাইতে লাগল। জাহাজ পূর্ণগতিতে চলল। পালগুলো জোরালো বাতাসে ফুলে উঠল। জাহাজ সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে দ্রুত ছুটল।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে হাঁটতে পারছে এখন।
রাত হলে সিঁড়ি বেয়ে আস্তে আস্তে ডেকে উঠে আসে ও। ধীরে ধীরে ডেকে পায়চারি করে। মাস্তুলের ওপর বসে থাকা নজরদার পেড্রোকে ডেকে বলে, পেড্রো, ঘুমিয়ে পড়ো না। নজর রাখো। পেড্রোও গলা চড়িয়ে বলে, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। রাত জেগে না। তোমার বিশ্রামের, ঘুমোবার খুব দরকার। এ সময় হ্যারিও ডেকে উঠে আসে। দুজনের কথা হয়। জাহাজঠিক দিকে যাচ্ছে কিনা, কবে নাগাদ দেশে পৌঁছোনো যাবে এসব নিয়ে আলোচনা চলে।
দিন পনেরো কুড়ি নির্বিঘ্নেই কাটল। ঝড়-বৃষ্টির মুখে পড়তে হয়নি। কিন্তু ডাঙার দেখা নেই। পেড্রো দিনরাতমাস্তুলের ওপর থেকে চারদিকে নজর রাখছে। কিন্তু চারদিকেই জল। ডাঙার কোনো চিহ্নই দেখতে পাচ্ছেনা।
ফ্রান্সিস এখন একটু খুঁড়িয়ে হলেও মোটামুটি হাঁটাচলা করতে পারছে। মাঝে মাঝে শাঙ্কো বিনেলোর সঙ্গে তরোয়ালের খেলা খেলে। আগের মতো তড়িৎগতিতে অবশ্য চলাফেরা করতে পারছে না। বাঁ পায়ের জোর বেশ কমে গেছে।
জাহাজ চলছে। কিন্তু কোথায় ডাঙা? ফ্রান্সিস, হ্যারি বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ল। ওদিকে জাহাজে পানীয় জল, খাদ্য ফুরিয়ে আসছে। ডাঙায় পৌঁছোতেই হবে। বন্ধুরা পাল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দাঁড় টেনে জাহাজের গতি বাড়াতে লাগল। জাহাজের গতি বাড়ল। কিন্তু ডাঙা চোখে পড়ছে না।
ভাইকিংরা সমুদ্রকে ভালোভাবেই চেনে। আবাল্য দেখে এসেছে এই সমুদ্রকে। ভোরের আবছা কুয়াশায় ঢাকা সমুদ্র তারপর সূর্যোদয়ের সেই অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য। আকাশে সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় উজ্জ্বল রোদের ঝিকিমিকি পূর্বের আকাশে রক্তিমাভা ছাড়াছাড়া মেঘের গায়ে কত বিচিত্র রঙের খেলা। তার মধ্যে দিয়ে সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য। মাঝিরা তো এসময় ডেক-এ উঠে রেলিং ধরে দাঁড়াবেই। বড় ভালোবেসে এই সূযাস্তের দৃশ্য দেখতে। সন্ধ্যার মুখে দুটো একটা করে তারা ফুটতে থাকে। তারপরে রাত্রির আকাশের বিপুল শূন্যতায় লক্ষ তারারভিড়। ক্ষীণ চাঁদদিনে দিনে পূর্ণতা পায়। পূর্ণিমায় মস্তবড় চাঁদ। আদিগন্ত সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় জ্যোত্সারঝলকানি। সমুদ্রের হাওয়ায় ভাইকিংরা অনেকেই ডেক-এ এসে শুয়ে বসে থাকে। সারাদিনের কাজ শেষ। আবার কখনও কখনও সমুদ্রের ভয়ঙ্কর রূপও দেখে। ঘন কলো মেঘে আকাশ ঢেকে যায়। আঁকা বাঁকা বিদ্যুৎ মাথার ওপর ঝলসে ওঠে। প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টিঝাঁপিয়ে পড়ে ওদের জাহাজেরওপর। শুরু হয় ঝড়ের তাণ্ডবের সঙ্গে লড়াই। ভাইকিংদের জাহাজের জীবন তো এটাই। এই জীবনই ওদের প্রিয় একান্ত আপন।
এখন কিন্তু ভাইকিংরা বড় চিন্তায় পড়েছে। অনেকদিন হয়ে গেল জাহাজ চলেছে তে চলেছেই। মাটির দেখা নেই। অবশ্য এই অভিজ্ঞতা ওদের কাছে নতুন কিছু নয়। তবু এই সময় ওরা বেশ বিমর্ষ হয়ে পড়ে। কখনও দল বেঁধে, কখনও একা একা জাহাজের রেলিং ধরে। চারপাশে গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে যদি পাহাড়ের মাথায় সবুজ গাছগাছালি দেখা যায়। নজরদার পেদ্যে অবশ্য মস্তুলের ওপর ওর বসার জায়গায় চারদিকে নজর রেখে চলেছে। তবু ভাইকিংদের মন মানে না। সময় পেলেই ডেক-এ এসে রেলিং-এর কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। জাহাজে এখন আর নাচ-গানের আসর বসে না। সকলেরই মন খারাপ। শুধু ফ্রান্সিস আর হ্যারি নিরুদ্বেগ। দুজনে কখনও কখনও ডেক-এ উঠে আসে। বন্ধুরা বেশ চিন্তিত মুখে দুজনের কাছে আসে ফ্রান্সিস হেসে ওদের আশ্বস্ত করে। বলে–সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানো তোমাদের কাছে নতুন কিছু তোনয়। সাহস হারিও না। এখনও খাদ্য আর পানীয় জলে তেমন টান পড়েনি। নাচগানের আসর বসাচ্ছো না কেন? সিনাত্রার দিকে তাকিয়ে বলে–সিনাত্রা–নতুন নতুন গান বাঁধো। গান গাও। মনে কোন দুর্ভাবনাকে কোনরকম প্রশ্রয় দিও না। ফ্রান্সিসের কথায় বন্ধুরা কিছুটা আশ্বস্ত হয়। সিনাত্রা উৎসাহিত হয়ে বলে ওঠে–ভাই সব–নতুন নতুন গান বেঁধেছি। রাতে শোনাবো। বন্ধুদের মধ্যে একটু উৎসাহের সঞ্চার হয়। কেউ কেউ বলে ওঠে –ঠিক আছে। বসাও নাচগানের আসর।
দিন কাটে। বিকেল হয়। পশ্চিম আকাশে রঙের আলোর বন্যা বইয়ে সূর্য অস্ত যায়। সেই সূর্যাস্ত আর কেউ না দেখুক মারিয়া রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দেখবেই। সেই সূর্যাস্তের দৃশ্য মারিয়ার কাছে প্রতিদিনই নতুন বলে মনে হয়। দেশ থেকে বাবা-মার কাছ থেকে কত দূরে ক্ষুধা তৃষ্ণায় দুর্বল শরীর তবু মারিয়া সূর্যাস্ত দেখতে আসে। এতে মারিয়া যেন মনে খুব শান্তি পায়। ভুলে থাকতে পারে ক্ষুধাতৃষ্ণার কষ্ট। শরীরের দুর্বলতা।
রাতের খাবার খেয়ে অনেক বন্ধু ডেক-এ উঠে আসে। ডাঙার দেখা নেই। কাজেই ফুরিয়ে আসা-খাদ্য জল খাওয়া সবাই কমিয়ে দিয়েছে। ডাঙায় না পৌঁছানোনা পর্যন্ত — খাদ্য জল না পাওয়া পর্যন্ত বেঁচে তো থাকতে হবে। এটা জানতে পেরে ফ্রান্সিস হ্যারিও খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। কাউকে না জানিয়ে মারিয়াও খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে।
