শাঙ্কো আস্তে আস্তে বলল, জাহাজে চলো। ফ্রান্সিস আস্তে মাথা নাড়ল। বলল, না। এন্তানোর কাছে চলে। স্বর্ণভাণ্ডারের হদিসটা দিয়ে আসি।
বেশ চলো। হেঁটে যেতে পারবে? শাঙ্কো বলল।
দেখি। চেষ্টা করি। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে উঠে বসল। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের ডান হাতটা নিজের কাঁধে তুলে নিল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর ওপর ভর দিয়ে আস্তে আস্তে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল।
সবাই চলল। গুহার-এবড়ো-খেবড়ো মেঝের ওপর দিয়ে আহত ফ্রান্সিসের হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। শাঙ্কো প্রহরীদের বলল, ভাই তোমরাও ওকে ধরো। প্রহরীরা দুজন এগিয়ে এল।
ফ্রান্সিসকে নিয়ে সবাই আস্তে আস্তে গুহা থেকে বেরিয়ে এল। চলল এন্তানোর বাড়ির দিকে।
বেশ সময় লাগল ওদের পৌঁছতে কয়েদঘরের সামনে এলে একজন প্রহরীকে ফ্রান্সিস বলল, এন্তানোকে খবর দাও। প্রহরীটি চলে গেল।
এন্তানো প্রহরীটির কাছেই সব শুনেছিল। প্রায় ছুটে এল।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে সব চলল। এন্তানো খুব খুশি। এবার শাঙ্কো বলল, আমরা জাহাজে ফিরে যাব। আপনার দুজন প্রহরীকে সঙ্গে যেতে বলুন।
নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। এন্তানো বলে উঠল। যে দুজন প্রহরী ফ্রান্সিসকে ধরে ধরে নিয়ে এসেছিল তাদের বলল, ওদের জাহাজে পৌঁছে দিয়ে এসো।
ফ্রান্সিস কোমরের ফেট্টি থেকে বেশ কিছু সোনার চাকতি আস্তে আস্তে বের করল। সেগুলো এন্তানোর দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল, এই নিন। এন্তানো লাফিয়ে এগিয়ে এল। শাঙ্কোও পোশাকের মধ্যে থেকে স্বর্ণমুদ্রাগুলো রেখে সোনার চাকতিগুলো এন্তানোর হাতে দিল। এন্তানো খুশিতে প্রায় লাফাতে লাগল।
ফ্রান্সিসকে ধরে ধরে সবাই চলল। জাহাজঘাটের দিকে। ফ্রান্সিস খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলল।
পথে শাঙ্কো লক্ষ্য করল ফ্রান্সিসের পায়ে বাঁধা ফেট্টির কাপড়টা রক্তে ভিজে উঠেছে। রক্ত-পড়া বন্ধ হয়নি।
শাঙ্কো দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রহরীদের বলল, কাঁধে করে নিয়ে চলো। বেশ রক্ত পড়ছে। হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া চলবে না। রক্ত পড়ে ও দুর্বল হয়ে পড়বে।
না না, হেঁটে যেতে পারব। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল।
চুপ করে থাকো। শাঙ্কো প্রায় ধমকের সুরে বলল। তিনজনে ফ্রান্সিসকে কাঁধে তুলে নিল।
শেষ বিকেলে জাহাজঘাটে পৌঁছল ওরা। পাটাতন দিয়ে উঠছে, হ্যারি রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিল। ও চেঁচিয়ে উঠল, এসো সবাই। ফ্রান্সিস আহত।
বন্ধুরা ছুটে এল ডেক-এ। হ্যারির কথা মারিয়া অস্পষ্ট শুনল। ও বুঝল না ঠিক কী হয়েছে। ও এ সময় সূর্যাস্ত দেখতে যায়। তাই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। তখনই ফ্রান্সিসের বন্ধুদের গুঞ্জন শুনল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আহত ফ্রান্সিসকে কাঁধে নিয়ে বন্ধুরা দরজার সামনে এল। মারিয়া কেমন বিমূঢ় হয়ে গেল। বন্ধুরা ফ্রান্সিসকে বিছানায় শুইয়ে দিল। এতক্ষণে ফ্রান্সিসের রক্তমাখা দেখে মারিয়া হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল।
ফ্রান্সিস তাকে অভয় দিয়ে বলল,
কেঁদো না। সামান্য কেটেছে। কয়েকদিনের মধ্যেই ভালো হয়ে যাব। এ কথায় মারিয়া সান্ত্বনা পেল না। ও একইভাবে কাঁদতে লাগল।
ততক্ষণে শাঙ্কো ভেনকে ডেকে এনেছে। ভেন ওর বদ্যি-ঝোলা ওষুধ বয়াম নিয়ে এসে লেগে পড়ল ফ্রান্সিসের চিকিৎসায়। শাঙ্কো, বিস্কো, সিনাত্রা ফ্লেজার, আর সব বন্ধুরা নিশ্চুপ হয়ে দেখতে লাগল। মনে মনে বিশ্বাস, ভেন থাকতে ফ্রান্সিসের বিপদ হবে না। ও ঠিক সেরে উঠবে। সূর্য বিদায় নিলেও কাল নতুন আশার আলো নিয়ে সে উদয় হবে। বন্ধুরা সব নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।
অভিশপ্ত দ্বীপে ফ্রান্সিস
অতিকায় হাঙরের কামড়ে গুরুতর আহত ফ্রান্সিসের দিন কাটতে লাগল বিছানায় শুয়ে। ফ্রান্সিসের ডান হাঁটুর কাছেমাংস খুবলে নিয়েছিল সেই বড় হাঙরটা। ফ্রান্সিসের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। ক্ষত সম্পূর্ণ না সারা পর্যন্ত বিছানায় পড়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। বয়স্ক বৈদ্য ভেন চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষত শুকোবার সব রকম ওষুধই ভেন ব্যবহার করছে। তবু ভয় যাচ্ছে না ওর মন থেকে। যদি ক্ষত বিষিয়ে ওঠে? ভেন তিনবেলা ওষুধ দিয়ে যাচ্ছে আর মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে যেন ক্ষত বিষিয়ে না ওঠে। এই আশঙ্কার কথা, এই ভয়ের কথা ভেন কাউকে বলছে না।
ওদিকে ফ্রান্সিসও মনে মনে ওর এই অসহায় অবস্থাটা মেনে নিতে পারছে না। ওর মতো দুঃসাহসী দৃপ্ত যুবক এই ভাবে বিছানায় পড়ে আছে এটা মারিয়াও মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু উপায় তো নেই। মারিয়া দিনরাত সেবাশুশ্রূষা করে চলেছে। পাছে মারিয়ার মন দুর্বল হয়ে পড়ে তাই ফ্রান্সিস মুখ বুজে সব জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করে যাচ্ছে। বন্ধুদের মুখে হাসি নেই। রাতে আর জাহাজের ডেকে নাচ-গানের আসর বসে না। ওরা মাঝে মাঝেই এসে ফ্রান্সিসকে দেখে যায়। নীরবে নিজেদের কাজ করে যায়। ভেনের চিকিৎসার ওপর ওদের গভীর বিশ্বাস। ফ্রান্সিস নিশ্চয়ই সুষ্ঠু হবে। আবার আগের মতোইতরোয়ালের লড়াই চালাতে পারবে।
দিন সাতেকের মধ্যে ফ্রান্সিস খুবই দুর্বল হয়ে পড়ল। ও যদিও সেটা কাউকে বুঝতে দিচ্ছিল না। কিন্তু মনের দুশ্চিন্তা কাটতে চায় না। যদি সত্যিই ও এভাবে মারা যায় তাহলে মারিয়ার কী হবে? বন্ধুরাই বা কী করবে?
আস্তে আস্তে ফ্রান্সিস কিছুটা সুস্থ হল। ভেনের ওষুধ আর মারিয়ার শুশ্রূষায় ফ্রান্সিস দিন পনেরোর মধ্যে হৃতশক্তি অনেকটাই ফিরে পেল। মারিয়া ও ফ্রান্সিসের বন্ধুরা নিশ্চিন্ত হল।
