শুয়োর, ঘোড়া, ভেড়া–যে কোনো মাংস। তিনটে ঠ্যাং আনবে। ফ্রান্সিস বলল।
দাম? প্রহরী হাত বাড়াল।
শাঙ্কো কোমরের ফেট্টি থেকে একটা স্বর্ণমুদ্রা দিল। প্রহরীরা স্বর্ণমুদ্রা দেখে একটু অবাকই হল। একজন প্রহরী চলে গেল।
ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পরে প্রহরী তিনটে ভেড়ার ঠ্যাং নিয়ে এল। ফ্রান্সিস ঠ্যাং তিনটে নিয়ে বলল, চলো, সমুদ্রের দিকে যাব।
সবাই চলল। পাথরের ওপর পা রেখে রেখে সবাই সমুদ্রের ধারে এল। সমুদ্রের ঢেউ পাহাড়ের গায়ে ভেঙে পড়ছে। জল ছিটকে উঠছে। ফ্রান্সিস ঠ্যাং তিনটে কোমরে গুজল।
তারপর জলাশয় কোন দিকটায় সেটা বুঝে নিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জলের তলাটা মোটামুটি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল পাথরের গা। ডুব সাঁতার কাটতে গিয়ে হঠাৎই দেখল একটা প্রায় গোল মুখমত। ও বুঝল এখান দিয়েই সুড়ঙ্গের শুরু। জলের ওপর ভেসে উঠল ফ্রান্সিস। একটু দুরেই প্রহরীরা আর শাঙ্কো দাঁড়িয়ে আছে। বুকভরে দম নিয়ে ফের ডুব দিল। প্রায় অন্ধকার গুহামুখ দিয়ে ঢুকে পড়ল। দুত জল ঠেলে ডুব সাঁতার দিয়ে সুড়ঙ্গের অনেকটা ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর কোমরের ফেট্টি থেকে তিনটে ঠ্যাং বের করে একটু দূরে দূরে ঠ্যাংগুলো সুড়ঙ্গের এবড়ো-খেবড়ো মেঝেয় রেখে দিল।
দম ফুরিয়ে আসছে। ফ্রান্সিস দ্রুত ডুবসাঁতার কেটে সুড়ঙ্গমুখে ফিরে এল। তারপর জল ঠেলে ওপরে ভেসে উঠল খোলা হাওয়ায়। মুখ হাঁ করে বড় বড় শ্বাস নিতে লাগল সে।
একটু ধাতস্থ হতে ধীরে সাঁতার কেটে তীরের দিকে এগিয়ে গেল ফ্রান্সিস। তীরের পেছল পাথরে পা রেখে রেখে উঠে এল।
ফ্রান্সিস, ঠ্যাং তিনটে কী করলে? শাঙ্কো বলল।
সুড়ঙ্গের মধ্যে রেখে এসেছি মাংসের গন্ধে এবার হাঙর তিনটে ওখানে চলে আসবে। তখন জলাশয় নিরাপদ। চলো, গুহার মধ্যে যাই। মাথার ওপর সূর্য থাকতে থাকতে জলাশয়ে নেমে খোঁজ শেষ করতে হবে।
সবাই গুহামুখ দিয়ে আবার জলাশয়ের কাছে এলো।
একটু বিশ্রাম করে নাও। শাঙ্কো বলল।
না-না, আলো চলে যাবে। শাঙ্কো বলল।
আবারও ফ্রান্সিস দড়ি ধরে জলাশয়ের জলে নামল। জলের মধ্যে দেখল হাঙর তিনটে নেই। দেরি করা যাবে না। যদি ওরা মাংস খাওয়া শেষ করে ফিরে আসে।
ফ্রান্সিস জল ঠেলে একেবারে নীচে নেমে এল। পাথুরে দেয়াল ধরে ধরে ডুব সাঁতার দিয়ে চলল।
না! পাথর ছাড়া কিছু নেই।
জল ঠেলে ওপরে উঠল। হাঁ করে শ্বাস ফেলল। দম নিল। আবার ডুব দিল। এবার অন্যদিকে। হাতড়ে চলল পাথরের দেয়াল।
হঠাৎ একটা প্রায় চৌকোনো পাথর হাতে ঠেকল। ফ্রান্সিস পাথরটা ধরে টানল। নড়ল পাথরটা। আবার প্রাণপণ জোরে টানল। চৌকোনা পাথর সবটা খুলল না।
খোঁজ পেলে? শাঙ্কো বলে উঠল।
প্রায়।
দম নিয়ে আবার ডুব দিল ফ্রান্সিস দ্রুত চৌকোনা পাথরের কাছে এল। আবার প্রাণপণে টানল। পাথরটা এবার খুলে এল। প্রায় অন্ধকার খোদল একটা। ভালো করে তাকাতে দেখল খোদলভর্তি সোনার চাকতি। অল্প আলোতেও চকচক করছে। ও দ্রুত হাতে দু’মুঠো সোনার চাকতি তুলে নিল। কোমরের ফেট্টিতে চেপে চেপে খুঁজতে খুঁজতে ওপরে উঠে আসতে লাগল।
দম ফুরিয়ে এসেছে। দ্রুত জল ঠেলে ওপরে উঠে আসতে লাগল। তখনই আবছা দেখল বড় হাঙরটাকে।
ফ্রান্সিস চমকে উঠল। হাঙরটা যে ছুটে আসছে! দড়িতে জোর হ্যাঁচকা টান দিল সে। ওপর থেকেশাঙ্কো আর প্রহরীরা দড়ি ধরে প্রাণপণে টেনে ওকে তুলতে লাগল। হাঙরও ধেয়ে আসছে পিছন পিছন। একেবারে শেষ মুহূর্তে তার দাঁতের ঘষা লাগল ফ্রান্সিসের হাঁটুতে। মাংস খুবলে এল। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল।
ততক্ষণে ওরা জল থেকে টেনে তুলে ফেলেছে ফ্রান্সিসকে। ফ্রান্সিস পাড়ে উঠে শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো ঝুঁকে পায়ের ওপর পড়ল। দরদর করে রক্ত পড়ছে ক্ষত দিয়ে। ফ্রান্সিস ডান হাতটা কপালের ওপর রেখে যন্ত্রণা সহ্য করতে লাগল।
শাঙ্কো নিজের কোমরের ফেট্টি খুলে ফেলল। ছোরাটা পড়ে গেল। খুঁড়িয়ে নিয়ে কোমরে গুঁজে নিল। পাথরের ওপর টং টং শব্দ করে সাত-আটটা স্বর্ণমুদ্রা পড়ে গেল। একটা গড়িয়ে গেল জলে। শাঙ্কোর সেদিকে খেয়াল নেই। ও ক্ষতস্থানে ফেট্টিটা চেপে .. ধরল। রক্ত পড়া একটু বন্ধ হল। শাঙ্কো এবার ফেট্টিটা হাঁটুতে জড়িয়ে শক্ত করে বাঁধল। ফ্রান্সিস একটু ককিয়ে উঠল। শাঙ্কো গড়িয়ে পড়া সোনার চাকতি কটা কোমরে গুজল।
শাঙ্কোর আর জিগ্যেস করতে মন হল না ফ্রান্সিস স্বর্ণভাণ্ডারের খোঁজ পেয়েছে কিনা। সে তখন আহত ফ্রান্সিসকে নিয়ে উদ্বেগে কাতর। প্রহরীরাও এই আকস্মিক ঘটনায় কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না।
শাঙ্কো কোলের ওপর ফ্রান্সিসের মাথা তুলে নিল। ফ্রান্সিস চোখ বুজে যন্ত্রণা সহ্য করছে। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের মাথায় হাত বুলোতে লাগল। মুখে কথা নেই। প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থা। তবুওর চোখ দিয়ে জল পড়ল না। ও কাঁদলে ফ্রান্সিসের মন দুর্বল হয়ে পড়বে।
বেশ কিছুক্ষণ পরে ফ্রান্সিস কোমরের ফেট্টি থেকে তিনটে সোনার চাকতি বের করল। হেসে আস্তে আস্তে দুর্বলস্বরে বলল, শাঙ্কো, সুলতান হানিফের–স্বর্ণভাণ্ডারের সন্ধান-পেয়েছি।
ওসব কথা থাক। এখন কোনো কথা বলো না। কষ্ট বাড়বে। অশ্রুরুদ্ধ স্বরে শাঙ্কো বলল।
চোখ খুলে ফ্রান্সিস ওপরের ফাঁকা জায়গাটার দিকে তাকাল। মৃদুস্বরে বলল, সূর্যদর্শন।
