বলো কী? এখানে! শাঙ্কো স্তম্ভিত।
হ্যাঁ। দেখছো না সমুদ্র একেবারে পাহাড়ের ধারেই। নিশ্চয় এই জলাশয়ের সঙ্গে সমুদ্রের যোগ আছে।
নির্ঘাত আছে, নইলে এখানে হাঙর আসবে কোথা থেকে? তা এখন কী করবে?
আবার নামব। হাঙরটাকে মারতে হবে। প্রহরীদের কাছ থেকে একটা তরোয়াল চেয়ে আনো।
শাঙ্কো প্রহরীদের কাছে গিয়ে হাঙরের ব্যাপারটা বলল। শুনে তারাও কম আশ্চর্য হল না। তারপর যখন শুনল ফ্রান্সিস তরোয়াল নিয়ে জলে নামবে তখন তাদের মুখে আর কথা যোগায় না। এই বিদেশিটা জলের মধ্যে একা হাঙরের সঙ্গে লড়াই করবে? সত্যি মিথ্যে যাচাই করতে একজন তার তরোয়াল তুলে দিল শাঙ্কোর হাতে।
তরোয়াল পেয়ে আবার ডুব দিল ফ্রান্সিস। আস্তে আস্তে নামতে লাগল নীচে। দাঁত দিয়ে তরোয়াল চেপে ধরে আছে। ওই তো হাঙরটা! দড়ি ছেড়ে এবার হাত ও পায়ে আস্তে জল ঠেলে এক জায়গায় স্থির হয়ে রইল সে। ভয়াল বিভীষিকা তার চারপাশে ঘুরতে লাগল। ঘুরতে ঘুরতে এক কোনার দিকে গিয়েই সেটা ছুটে এল ফ্রান্সিসকে লক্ষ্য করে। হাঙরটা যে এভাবে আক্রমণ করবে ফ্রান্সিস সেটা আগেই আঁচ করেছিল তাই সে দ্রুত জল ঠেলে আরও কিছুটা নীচে নেমে গেল। তরোয়াল নিল হাতে। হাঙর তখন তার মাথার ওপর এসে গেছে। ফ্রান্সিস শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে তরোয়ালটা হাঙরের পেটে ঢুকিয়ে দিল। নরম শরীর ভেদ করে সেটা প্রায় অর্ধেকটা ঢুকে গেল। জল উঠলো লাল হয়ে। ফ্রান্সিস তরোয়াল টেনে বার করেই দড়ি ধরে ঝকানি দিতে শুরু করল। শাঙ্কো তৈরি ছিল। তাড়াতাড়ি দড়ি টেনে ফ্রান্সিসকে তুলে নিল ওপরে।
হাঙরটা মরেছে? শাঙ্কো জিগ্যেস করল।
এখুনি মরবে। ওর হৃৎপিণ্ড ফুটো করে দিয়েছি। হাঁপাতে হাঁপাতে ফ্রান্সিস বলল।
এখন কি ফিরে যাবে? শাঙ্কো জানতে চাইল।
ফ্রান্সিস ওপারের দিকে তাকাল। সূর্য সরে গেছে। তবে উজ্জ্বল রোদ এখনও আসছে। –না আবার নামব। এখনও আলো আছে। ফ্রান্সিস বলল।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে ফ্রান্সিস আবার দড়ি ধরে জলে নামল। নীচে নামতেই দেখল তিনটে হাঙর ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা বড়, দুটো ছোট। মৃত হাঙরের চিহ্নমাত্র নেই। ওরা খেয়ে ফেলেছে।
ফ্রান্সিসকে আবার ওপরে উঠে আসতে হল। শাঙ্কো বলল, কী হল, উঠে এলে যে?
ফ্রান্সিস বলল তিনটে হাঙর এসেছে। এখন আর নামা যাবে না। আলোও কমে আসছে। ফিরে চলো। কালকে এ সময় আসতে হবে।
দড়ি তুলে নিয়ে ওরা ফিরল।
জলের লাল রং দেখে প্রহরীরা বুঝেছিল হাঙরটা তরোয়ালের ঘা খেয়ে মারা গেছে। ওরা বেশ সমীহ নিয়ে ফ্রান্সিসকে দেখতে লাগল। একা একটা তরোয়াল দিয়ে হাঙর মেরে ফেলল?
বিকেলের দিকে এন্তানো কয়েদঘরের দরজার কাছে এল। ফোকর দিয়ে তাকিয়ে বলল, ওখানে জলে নাকি হাঙর আছে।
হ্যাঁ। একটাকে মেরেছি। এখনও তিনটে আছে। ফ্রান্সিস বলল।
বুঝেছি। সমুদ্রের সঙ্গে এই জলাশয়ের যোগ আছে। একটা সুড়ঙ্গ মতো আছে সমুদ্রের দিক থেকে।
এটা আগে বলেননি।
তুমি ঐ জলাশয়ে নামবে তা তো আমি জানতাম না। যাক গে, স্বর্ণভাণ্ডারের হদিস পেলে কিছু?
এখনও সন্ধান পাইনি। কালকে যাব। দেখি।
দেখো চেষ্টা করে। তোমাদের মাংস-টাংস খেতে দিতে বলেছি। এন্তানো হেসে বলল।
হ্যাঁ। এখন খাবারটাবার ভালোই পাচ্ছি। শাঙ্কো বলল।
এন্তানে চলে গেল।
ফ্রান্সিস ডাকল, শাঙ্কো!
বলো। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল।
এন্তানো ভালো করেই জানে ঐ জলাশয়ে হাঙর আসে। হয়তো সারা পাহাড় খুঁজেছে। কোনো হদিস না পেয়ে কতকটা আন্দাজে ঐ জলাশয়ে লোকজন নামিয়েছিল। হাঙরের মুখ থেকে কেউ বেঁচে ফেরেনি। এন্তানো সব জানে। শুধু জানে না গুপ্ত স্বর্ণভাণ্ডার কোথায় আছে। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল।
পরেরদিন ফ্রান্সিসরা তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল। আবার প্রহরীদের পাহারায় চলল পাহাড়ের দিকে।
গুহার কাছে এসে এবার ফ্রান্সিস ভালোভাবে চারদিকে দেখল। পাহাড়ের বাঁপাশ পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্র। সুড়ঙ্গ থাকলে ওখানেই আছে। ডানপাশে সুলতান হানিফের বাড়ির ধ্বসস্থূল্প।
ওরা গুহায় ঢুকল। মাথা নিচু করে কিছুটা জায়গা পার হল। সামনেই জলাশয়। এখানে আলো আছে।
শাঙ্কো দড়ির একটা মাথা জলে ফেলে অন্য মাথাটা চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস দড়ি ধরে বলল, শাঙ্কো, তুমি একা ঠিক পারবেনা। ওদেরও সময়মতো দড়ি ধরে টানতে বলো।
শাঙ্কো প্রহরীদের কাছে ডাকল। তিনজন এগিয়ে এলে শাঙ্কো বলল, আমি বললে দড়ি ধরে টানতে শুরু করবে।
আবার তোমার বন্ধু হাঙরের পাল্লায় পড়বে নাকি? একজন প্রহরী বলল
দেখা যাক। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল। তারপর দড়ি ধরে জলে নামল। সূর্যের আলো তখন সরাসরি জলাশয়ের ওপর পড়ল। ফ্রান্সিস ডুব দিয়েই দেখল হাত কয়েক দূরে হাঙর তিনটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে দড়িতে হ্যাঁচকা টান দিল। চারজন মিলে দড়ি টানতে লাগল। ফ্রান্সিস এবার বেশ দ্রুতই উঠে এল।
এখনও হাঙর আছে? শাঙ্কো জানতে চাইল।
হ্যাঁ। তিনটেই আছে।
কী করবে?
ওগুলোকে এখান থেকে তাড়াতে হবে।
কী করে?
ফ্রান্সিস শক্ত পাথরের ওপর শুয়ে পড়তে পড়তে বলল, ভাবছি।
কিছু পরে ফ্রান্সিস উঠে বসল। বলল, ছক কষা হয়ে গেছে। ও একজন প্রহরীকে বলল, আমরা তো বন্দী। তুমি বাজার এলাকা থেকে মাংস নিয়ে এস।
কীসের মাংস?
