হ্যাঁ। সেই কথাই হয়েছে। দুটো মশাল নিয়ে এসো। ফ্রান্সিস বলল।
দুজনে কয়েদঘরের বাইরে বেরিয়েএল। সবাই পাহাড়মুখো চলল। প্রহরীর একজনের হাতে দুটো নেভানো মশাল।
পাহাড়ের কাছে এসে গুহামুখটা দেখতে পেল ফ্রান্সিস। সে কোমরের ফেট্টিতে গোঁজা চামড়ার টুকরোটা বের করল। গুহামুখের সঙ্গে মেলাল। মাথা নেড়ে বলল, এন্তানো ভুল দেখেছে। গুহামুখের সঙ্গে আঁকাবাঁকা রেখার কোনো মিল নেই।
তাহলে এই আঁকাবাঁকা রেখা কীসের? শাঙ্কো জানতে চাইল।
সেটাই তো বুঝতে পারছি না। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল।
প্রহরীর একজন চকমকি ঠুকে মশাল দুটো জ্বালাল। তারা সবাই ঢুকল অন্ধকার গুহার ভেতরে। মশালের আলোয় দেখল চারপাশে এবড়ো-খেবড়ো পাথর। ছাদ এত নিচু যে মাথা ঝুঁকিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। কিছুটা গিয়েই অবশ্য ছাঁদ উঁচু হল। তখন সোজা হয়ে ওরা এগিয়ে চলল।
হঠাইআলোর ঝলকানি। সামনেই একটা ছোট জলাশয়। এটাকে বলা যায় না। তেমন বড় কিছুনয়। জলাশয়েরতীরেদাঁড়িয়ে ওপরেতাকাতেইফ্রান্সিস অবাক। ওপরটায় বেশকিছুটা জায়গা জুড়ে ফঁকা। আকাশ দেখা যাচ্ছে। সূর্য অবশ্য সরে গেছে। তবে তার আলো আসছে। তাই জলাশয় এলাকাটা মোটামুটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ওপর থেকে কি অতীতে কখনও বিরাট পাথরের চাই ভেঙে পড়েছিল? তাই কি ওপরটা ফঁকা? ফ্রান্সিসের ভাবনার মধ্যে শাঙ্কো বলে উঠল, গুহা তো এরপরেই শেষ। এখানে কিআর কিছু দেখার আছে?
না। ফ্রান্সিস চারদিকে তাকাতে তাকাতে বলল, এবার পাহাড়ের ওপরটা দেখব, চলো।
শাঙ্কো প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে বলল, চলো, ওপরে ওঠা যাক।
সবাই গুহা থেকে বেরিয়ে এল। তারপর পাথরে পা রেখে রেখে ওপরে উঠতে লাগল। বেশ কিছুটা উঠতেই সেই ফাঁকা জায়গাটায় এল। ফ্রান্সিস পাথরে ভর রেখে ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে নীচে জলাশয়টার দিকে তাকাল। জলাশয়টা মোটামুটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। উঠে আসবে হঠাৎ জলাশয়ের চারপাশের পাড়টা কেমন পরিচিত মনে হল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে কোমরের ফেট্টিতে গোঁজা চামড়ার টুকরোটা বের করল। আঁকাবাঁকা রেখা।
আশ্চর্য! জলাশয়ের পাড়ও তো এমনি আঁকাবাঁকা। ও আবার পাথরে ভর রেখে ফাঁকা জায়গাটায় ঝুঁকে পড়ল। জলাশয়ের আঁকাবাঁকা পাড়টা দেখল। নকশার সঙ্গে মেলাল। হুবহু এক। জলাশয়টির পাড়ই নকশাটাতে আঁকা হয়েছে। ও গলা চড়িয়ে ডাকল, শাঙ্কো। শাঙ্কো তখন আরও ওপরে উঠতে যাচ্ছিল। দাঁড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিসের কাছে এসে বলল, কী ব্যাপার? ফ্রান্সিস ওর হাতে নকশাটা দিল। বলল, ঝুঁকে পড়ে নীচের জলাশয়টার দিকে তাকাও। দেখ ওটার আঁকাবাঁকা পাড়ের সঙ্গে নকশার আঁকাবাঁকা রেখা মেলে কিনা!
শাঙ্কো পাথরে ভর রেখে ফাঁকটার মধ্যে দিয়ে জলাশয়টার দিকে তাকাল। তারপর নকশাটা বের কর জলাশয়ের আঁকাবাঁকা পাড়ের সঙ্গে মেলাল। ও অবাক হয়ে গেল। দুটো হুবহু মিলে যাচ্ছে। শাঙ্কো লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ধ্বনি তুলল, ও–হো–হো
ফ্রান্সিস হেসে ভাইকিংদের ভাষায় বলল, ঐ জলাশয়েই আছে সুলতান হানিফের গুপ্ত স্বর্ণভাণ্ডার।
–কিন্তু সূর্য দর্শন? শাঙ্কো জানতে চাইল।
তার মানে সূর্য যখন মাথার ওপরে আসবে, উজ্জ্বল রোদ পড়বে, নীচে জলাশয় স্পষ্ট দেখা যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে কী করবে এখন?
ফিরে যাব। এখন সূর্য সরে গেছে।
জলাশয়ের জলে স্পষ্ট কিছুই দেখা যাবে না। কাল জলাশয়ে নামব যখন সূর্য ঠিক মাথার ওপর থাকবে।
ফিরে আসার সময় ফ্রান্সিস একজন প্রহরীকে বলল, তোমাদের দলপতি এন্তানো তো আমাদের জাহাজে যেতে পারবে না। অথচ প্রায় কুড়ি হাত লম্বা শক্ত দাঁড় চাই। তোমরা দিতে পারবে?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। কয়েদঘরেই দড়ি রাখা আছে। প্রহরীটি জানাল।
প্রহরীদের সঙ্গে ফ্রান্সিসরা কয়েদঘরে ফিরে এল।
শাঙ্কো, দেখো তো এখানে দড়ি আছে কিনা। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়তে পড়তে বলল। শাঙ্কে এদিক-ওদিক খুঁজতে খুঁজতে দড়ি পেল। দড়িটা টেনেটুনে বুঝল শক্ত দড়ি। ওরা অভিজ্ঞ, সহজেই দড়ি কত শক্ত বুঝতে পারে।
পরদিন দুজনে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল। তারপর প্রহরীদের পাহারায় ওরা যখন জলাশয়ের ধারে পৌঁছল তখন সূর্য প্রায় মধ্যগগনে।
ওরা অপেক্ষা করতে করতেই সূর্য ফাঁকা জায়গাটার মাথায় এল। চড়া রোদ পড়ল জলাশয়ে।
শাঙ্কো দড়ি চেপে ধরল। ফ্রান্সিস দড়ি ধরে ধরে জলাশয়ে নামল। জলের মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে চারদিক।
এবার চিন্তা–কোথায় থাকতে পারে সেই গুপ্তস্বর্ণভাণ্ডার ফ্রান্সিস এবড়ো খেবড়ো পাথুরে দেওয়ালের গায়ে হাত দিয়ে দেখে দেখে খুঁজতে লাগল কোনো গোপন গহ্বর পায় কিনা।
হঠাৎ কী যেন সাঁৎ করে সরে গেল।
ফ্রান্সিস ঘুরে তাকাল। হাঙর! ভীষণভাবে চমকে উঠল ফ্রান্সিস। দড়ি ধরে সে মারল এক হঁচকা টান। ওপরে শাঙ্কো তার সংকেত পেয়ে তাড়াতাড়ি দড়িটা গোটাতে শুরু করল। ফ্রান্সিস দড়িটা দু’পায়ে জড়িয়ে ধরল, ফলে দড়ির সঙ্গে সেও উঠতে লাগল ওপরে। ওদিকে হাঙরটা ছুটে আসছে। ফ্রান্সিস প্রায় তখন পৌঁছে গেছে। সে এক লাফ দিয়ে পাড়ে উঠে পড়ল। ভয়ে উত্তেজনায় সে তখন হাঁপাচ্ছে।
কী হল, লাফিয়ে উঠে পড়লে যে? শাঙ্কোর স্বরে রাজ্যের বিস্ময়।
হাঙর, কোনো রকমে হাঁপাতে হাঁপাতে উত্তর দিল ফ্রান্সিস।
