কী রকম! ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
একদিন গভীর রাতে জাহাজে রাখা ধনসম্পত্তি সব চুরি করে একটা নৌকায় চড়ে পালিয়ে গিয়েছিল হানিফ। সমুদ্রের উঁচু উঁচু ঢেউয়ের সঙ্গে লড়ে একসময় এখানে এসে উপস্থিত হয়েছিল। বেশ অর্থ ব্যয় করে ঐ পাহাড়ের নীচে বিরাট বাড়ি তৈরি করেছিল, এখন সেটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে আর নিজেকে সুলতান বলে ঘোষণা করে দিল। এখানকার কালো অধিবাসীরা ওকে স্বীকারও করে নিয়েছিল।
তারপর? ফ্রান্সিস বলল।
সুলতান হানিফের ইচ্ছে হল, সে আরো ধনী হবে। সোনার ভাণ্ডার গড়ে তুলবে। উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে এখানকার কিছু বলশালী যুবকদের নিয়ে সে একটা লুঠেরার দল গড়ে তুলল। শক্তপোক্ত একটা জাহাজও কিনল।
তারপর এই সুমদ্রে যাতায়াতকারী জলদস্যুদের জাহাজ আক্রমণ করতে লাগল। জলদস্যুদের হারিয়ে দিয়ে সে তাদের ধনসম্পদ লুঠ করতে লাগল। যাত্রীবাহী জাহাজও ও বাদ গেল না। দিনে দিনে তার সংগ্রহ করা সোনা বেড়েই চলল।
এন্তানো থামল। তারপর আবার বলতে লাগল–এ কাহিনীর সঙ্গে আমার এক পূর্বপুরুষ জড়িয়ে আছে। তিনিও এন্তানো নামে পরিচিত ছিলেন। আসলে আমরা পূর্বপুরুষদের নাম বহন করি কিনা, তাই।
বলেন কি? আপনার এক পূর্বপুরুষ জলদস্যু ছিল? ফ্রান্সিস একটু অবাক হয়েই বলল।
হ্যাঁ। সেই এন্তানো জলদস্যুদের দলে ঢুকেছিলেন। পরে ক্যাপ্টেন হয়ে ছিলেন।
অনেকে কিন্তু বংশের সঙ্গে জলদস্যুদের সম্পর্ক স্বীকার করে না। ফ্রান্সিস বলল।
আমি স্বীকার করি। যা সত্য তা জানাতে লজ্জা বা ভয় করি না।
ঠিক আছে। বলুন ফ্রান্সিস বলল।
সুলতান হানিফ একদিন ক্যাপ্টেন এন্তানোব জাহাজ আক্রমণ করে বসল। আর সেটাই হল মস্ত ভুল। ক্যাপ্টেন এন্তানের জলদস্যুরা ছিল অভিজ্ঞ যোদ্ধা। সংখ্যাতেও বেশি। হানিফ হার স্বীকার করতে বাধ্য হল। কিন্তু তাকে বন্দী করা গেল না। বন্দিত্বের অপমান এড়াতে সে তরোয়াল বিঁধিয়ে আত্মহত্যা করল। তার স্বর্ণভাণ্ডার গুপ্তই রয়ে গেল। এন্তানো থামল।
ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, সুলতান হানিফ কি কোনো সূত্র রেখে যাননি?
সূত্র বলতে যা বোঝায় তেমন কিছুনয়। এসব কাহিনি আমাদের পরিবারে অনেকদিন যাবৎ চলে আসছে।
তা থেকে কিছু জানা আছে আপনার? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
হ্যাঁ, একটা ব্যাপার জানি। কিন্তু সেটা কোনো সূত্র কিনা বলতে পারবনা।
তবু আপনি বলুন। ফ্রান্সিস আগ্রহী হল।
সুলতান হানিফ আত্মহত্যা করলে তার পোশাক তল্লাশি করেছিলেন আমার পূর্বপুরুষ এক ক্যাপ্টেন এন্তানো পেয়েছিলেন একটা সাদা চামড়ার টুকরো। তাতে গোলমতো আঁকাবাঁকা রেখা। দুর্বোধ্য।
ফ্রান্সিস বেশ চমকে উঠল। সেই চামড়ার টুকরোটা কোথায়?
আমার কাছেই আছে। ওটা দেখেই তো সন্ধান চালিয়েছিলাম।
ওটা দেখতে পারি?
দেখতে দিতে আপত্তি নেই। কিন্তু স্বর্ণভাণ্ডারের সন্ধান পেলে সব আমার। তুমি কিন্তু কিছুই পাবে না। এন্তানো বলল।
আমি তো আগেই বলেছি। স্বর্ণভাণ্ডারের ওপর আমার বিন্দুমাত্র লোভ নেই।
বেশ। তাহলে দেখো। এই বলে এন্তানো পোশাকের ভেতর থেকে চামড়ার টুকরোটা বের করে ফ্রান্সিসকে দিল। ফ্রান্সিস দেখল একটা কালচে হয়ে যাওয়া চামড়ার টুকরো। একপিঠে আঁকাবাঁকা গোলমতো দাগ। নীচে মনে হল মাত্র দুটো শব্দ আরবী অক্ষরে লেখা।
নীচে কী লেখা? ফ্রান্সিস দেখতে দেখতে বলল।
একজন আরবদেশীয় লোককে দিয়ে পড়িয়েছিলাম, সে বলেছিল ওতে নাকি দুটো শব্দ লেখা–সূর্য দর্শন।
এই আঁকাবাঁকা রেখাগুলো কী মনে হয় আপনার? ফ্রান্সিস জিগ্যেস করল।
গুহামুখ এন্তানো বলল।
ঐ পাহাড়ে তাহলে একটা গুহা আছে।
হ্যাঁ। আর আছে একটা হ্রদমতো।
হ্রদ? পাহাড়ের মধ্যে? ফ্রান্সিস একটু অবাকই হল।
হ্যাঁ। প্রকৃতির খেয়াল। এন্তানো বলল।
সব দেখতে হবে। নকশাটা আমি রাখব?
ঠিক আছে। ওটা হারিও না যেন।
না-না। আমি যত্ন করে রেখে দেব। এটাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। কোনোমতেই হারানো চলবে না। কিন্তু একটা কথা, কয়েদঘরে বসে তো এই নকশার রহস্য সমাধান করা যাবে না। আমাদের চলাফেরায় স্বাধীনতা দিতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
তোমরা যদি স্বর্ণভাণ্ডার খোঁজার নাম করে পালিয়ে যাও! এন্তানো বলল।
সঙ্গে দুজন সশস্ত্র প্রহরী দিন। তাহলে নিরস্ত্রআমরা পালাতে পারবনা, প্রস্তাব দিল ফ্রান্সিস।
বেশ। তাহলে দুজন নয়, তিনজন সশস্ত্র প্রহরী তোমাদের পাহারা দেবে।
তাহলে আজ দুপুর থেকেই কাজে নামব। ফ্রান্সিস বলল।
কোনো আপত্তি নেই। প্রহরীদের বলে দিচ্ছি। এন্তানো বলল।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো দুপুরে খেতে বসল। এবেলা খাবারের পরিমাণ বেশি। ফ্রান্সিস হাসল। শাঙ্কো বলল, তুমি হাসছ?
খাবার কত বাড়িয়ে দিয়েছে দেখেছ! সোনার লোভ বড় সাংঘাতিক।
তুমি এত নিশ্চিত হয়ে বললে, না পারলে ভীষণ বিপদে পড়ব।
আগে সব দেখি শুনি। এই চামড়ার টুকরোয় আঁকা নকশার রহস্যের সমাধান নিশ্চয়ই করতে পারব। তাহলেই সুলতান হানিফের স্বর্ণভাণ্ডার হাতের মুঠোয়।
আজ থেকেই কাজ শুরু করবে?
হ্যাঁ। দেরি করব না। আমাদের দেরি দেখলে বন্ধুরা চিন্তায় পড়বে। ফ্রান্সিস খেতে খেতে বলল।
খাওয়া শেষ হলে একজন প্রহরী এগিয়ে এল। সে বলল, চলো। তোমরা নাকি সোনা খুঁজতে যাবে? আমরা তিনজন তোমাদের পাহারা দেব।
