তোমরা জাহাজে চড়ে এসেছ? এন্তানো জানতে চাইল।
হ্যাঁ, ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল।
বাজারে একজন বুড়োর কাছে এসব খবর পেয়েছে। এন্তানো আবার হাসল।
আমরা খোঁজ নিচ্ছিলাম–শাঙ্কো বলতে গেল। এন্তানো ডান হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিল। বলল, এই ত্রিম্বার সর্বত্র আমার চর আছে। আমি এখানে বসে থাকি, কিন্তু এই তল্লাটের সব খবর রাখি।
ফ্রান্সিস বুঝে উঠতে পারল না। কী বলবে তবে এটা বুঝল যা-ই বলুক না কেন এন্তানো ওদের চোর অপবাদ দেবেই। তার ওপর জলদস্যু বলে ওদের বদনাম তো আছেই। তাই ফ্রান্সিস চুপ করে রইল। এন্তানো রোগা যোদ্ধাটির দিকে তাকাল। বলল, ওদের কয়েদঘরে নিয়ে যাও। শাঙ্কো মৃদুস্বরে দেশীয় ভাষায় বলল, আবার কয়েদঘর। ফ্রান্সিসও সেই ভাষায় বলল, উপায় নেই। ও যা বলে সে ভাবেই চলতে হবে।
পালাব না? শাঙ্কো জানতে চাইল।
সব দেখে বুঝে তবে। এখন চলো, বলে এগোল ফ্রান্সিস।
রোগা যোদ্ধাটির পেছনে পেছনে ওরা চলল। ওদের অনুমান ঠিক! সেই পাথরের ঘরের শক্ত কাঠের দরজার সামনে আনা হল ওদের। তিনজন প্রহরী দাঁড়িয়ে। তারা ঘরের তালা খুলে দরজা খুলে দিল। ফ্রান্সিসরা ঢুকল।
ঘর অন্ধকার কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। অন্ধকার বাড়ল। ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে রইল।
আস্তে আস্তে অন্ধকার চোখে সয়ে এল। ওরা দেখল মেঝেয় শুকনো ঘাস বিছানো। আর তিন-চারজন কালো মানুষ বন্দী সেখানে। তারা ফ্রান্সিসদের একবার শুধু দেখল। বুঝল না দলপতি নিজে শ্বেতাঙ্গ হয়ে সেই সাদা মানুষদেরই বন্দী করল কেন?
ফ্রান্সিস বিছানো ঘাসে শুয়ে পড়ল। আবার কয়েদঘরের একঘেয়ে অসহ্য জীবন! কিন্তু কিছুই করার নেই। দরজার দিকে তাকাল। পালাবার ছক কষতে হলে ঘরের সব কিছু ভালোভাবে দেখতে হয়। ঘরটায় কোনো জানালা নেই। দরজায় কিছু ফঁকফোঁকর করা। ওখান দিয়েই যা আলো-বাতাস আসছে।
একজন বন্দী ফ্রান্সিসকে জিগ্যেস করল, তোমরা তো দলপতি বিন্তোনের মতো সাদা মানুষ। তোমাদের বন্দী করল কেন?
আমরা নাকি এন্তানোর দামি পাথর চুরি করতে এসেছি।
আমাদেরও চোর বলেছে। বন্দী করেছে। পালাতে হবে। কালো যুবকটি বলল।
দেখো চেষ্টা করে পারো কিনা। ফ্রান্সিস বলল।
পরদিন সকালে ওদের সামান্য খাবার দিল। সবজির ঝোল আর একটা করে পোড়া রুটি। শাঙ্কো প্রতিবাদ করল, এত কম খাবার দিলে হবে? এই খেয়ে কি খিদে মেটে?
সেটা দলপতিকে বলো। তার হুকুমেই দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশনকারী বলে চলে গেল।
একটু বেলায় কয়েদঘরের দরজা খুলে গেল। এক প্রহরী ঢুকে জিগ্যেস করল, ভাইকিং কারা?
আমরা দুজন। শাঙ্কো বলল।
চলো, দলপতি ডেকেছে।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে এল। চলল প্রহরীদের প্রহরায় এন্তানোর ঘরের দিকে।
আধো-অন্ধকার ঘরে ঢুকল দুজনে। এন্তানো সেই একইভাবে কাঠের আসনে বসে আছে। ওদের দেখে হেসে বলল, কেমন আছ তোমরা?
ভালো নেই। আধপেটা খেতে হচ্ছে শাঙ্কো জানাল।
ঠিক আছে। খাবারের পরিমাণ বাড়ানো হবে। এন্তানো বলল। তারপর যোগ করল, তোমাদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ আছে।
আপনার চরেরা বলেছে বোধহয়? ফ্রান্সিস বলল।
হ্যাঁ। তাছাড়া যে বুড়োটার সঙ্গে তোমরা কথা বলেছিলে তাকেও নিয়ে আসা হয়েছিল। সে বলেছে, তোমরা নাকি সুলতান হানিফের গুপ্ত স্বর্ণভাণ্ডারের কথা জানতে চেয়েছিলে?
মিথ্যে কথা। আমরা জানতে চেয়েছিলাম পোর্তুগাল কতদূর। ফ্রান্সিস বলল।
উঁহু, এন্তানো মাথা নাড়ল। তোমরা সুলতান হানিফের গুপ্ত স্বর্ণভাণ্ডারের কথা জানতে চেয়েছিল।
আমরা এই প্রথম সুলতান হানিফের নাম জানলাম। বৃদ্ধ এটুকু বলেছিল যে, দেড়শো দু’শো বছর আগে এখানে একজন সুলতান রাজত্ব করে গেছেন। সুলতানের স্বর্ণভাণ্ডার নিয়ে আমরা কিছুই জানি না। ফ্রান্সিস বলল।
বিশ্বাস হচ্ছে না। এন্তানো মাথা নাড়ল।
ঠিক আছে সেই স্বর্ণভাণ্ডার উদ্ধার করে দেব। ফ্রান্সিস বলল।
এন্তানো বেশ চমকে উঠল, দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে আমি সেই স্বর্ণভাণ্ডার উদ্ধার করতে পারিনি। আর তুমি কালকে এসে বলছ পারবে!
হ্যাঁ, পারব, ফ্রান্সিস দৃঢ়স্বরে জানাল। শাঙ্কো একবার ফ্রান্সিসের প্রতিজ্ঞাদৃঢ় মুখের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস এখনই এতটা নিশ্চিত হচ্ছে কেন? মৃদুস্বরে সে বলল, এতটা নিশ্চিত হয়ো না।
উপায় নেই। মুক্তি পেতে হবে। ফ্রান্সিসও তেমনি মৃদুস্বরে বলল।
বিস্ময়ের বদলে এন্তানের মনে এবার উঁকি দিল সন্দেহ। সে বলল, তোমরা স্বর্ণভাণ্ডার উদ্ধার করে সব সোনা নিয়ে পালিয়ে যাবে!
একটা সোনার টুকরোও নেব না। ফ্রান্সিস তাকে অভয় দিল।
এবার শাঙ্কো ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে বলল, এই বন্ধু অনেক গুপ্ত ধনভাণ্ডার বুদ্ধি খাটিয়ে পরিশ্রম করে উদ্ধার করেছে। আপনি ওকে বিশ্বাস করতে পারেন।
বেশ! দেখো চেষ্টা করে। এন্তানো অবিশ্বাসের সুরে বলল।
আমি সুলতান হানিফের কথা, স্বর্ণভাণ্ডারের কথা বিস্তৃতভাবে জানতে চাই। ফ্রান্সিস বলল।
তাতে লাভ?
এইসব ইতিহাসের মধ্যেই থাকে গুপ্তধনের সূত্র। আপনি বলুন। ফ্রান্সিস বলল।
এন্তানো বলতে শুরু করল, সুলতান হানিফের জন্ম পারস্যে। ভাগ্যান্বেষণে মিশরে আসে। সেখান থেকে জাহাজে করে এখানে। পথে জলদস্যুদের পাল্লায় পড়ে। জাহাজ। লুঠ হয়। হানিফ সেই জলদস্যুদের দলে ঢুকে পড়েছিল। সেই দস্যুরা বেশ কিছু জাহাজ লুঠ করেছিল। লুণ্ঠিত বেশ কিছু জাহাজ লুঠ করেছিল। লুণ্ঠিত সোনা-হীরে মণি-মুক্তো লুকিয়ে রাখার জন্য দ্বীপ খুঁজে বেড়াচ্ছিল। হানিফ চোরের ওপর বাটপাড়ি করল।
