বেঞ্জামিন চোখ মেলে ওর দিকে তাকাল।
–তুমি কি আমাদের সঙ্গে যেতে চাও? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–না। বেঞ্জামিন স্পষ্টস্বরে বলল–আমি আমাদের জাহাজে ফিরে যাবো।
–আর কিছুক্ষণের মধ্যে তোমাদের জাহাজের চিহ্নমাত্রও থাকবে না।
–তার মানে? বেঞ্জামিন অবাক চোখে ওর দিকে তাকাল।
–তোমাদের ক্যারাভেল-এর গোলাঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়ে এসেছি। শুনতে পাচ্ছো না গোলা ফাটার আওয়াজ?
বেঞ্জামিন আর কোন কথা বলল না।
–বেঞ্জামিন–ফ্রান্সিস বলল–অনেক নিরীহ, নিরাপরাধ মানুষের চোখের জলে, বুকের রক্তে ভিজে গেছে তোমাদের ঐ ক্যারাভেল-এর ডেক, কয়েদঘর। অনেক অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে ঐ অভিশপ্ত ক্যারাভেল-এর ওপর। ওটাকে পোড়াতে পেরে আমার আজ আনন্দের সীমা নেই। ঐ ক্যারাভেল-এর সঙ্গে লা ব্রুশকে পোড়াতে পারলে, আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম। কিন্তু এবার সেটা হ’ল না। একটু থেমে ও বলল–আমরা দেশে ফিরে যাচ্ছি। কিন্তু আমি আবার আসবো। লা ব্রুশের সঙ্গে আমার শেষ বোঝাপড়া এখনো বাকি।
বেঞ্জামিন একইভাবে ওপরে তাকিয়ে থেকে বলল–আমি হুকুমের চাকর।
সেটা আমি বুঝি বেঞ্জামিন। তাই বলছি তুমি আমাদের সঙ্গে দেশে চলো।
বেঞ্জামিন আস্তে-আস্তে মাথা নাড়ল।
–তাহলে কি করবে এখন? আমরা এক্ষুণি জাহাজের নোঙর তুলবো। তাড়াতাড়ি বলো। বেঞ্জামিন ধীরস্বরে বলল–আমাকে ভাজিম্বাদের একটা নৌকায় তুলে দাও। আমি চাঁদের দ্বীপে যাবো।
–লা ব্রুশ যা নিষ্ঠুর হৃদয়হীন পশু, ও তোমাকে মেরে ফেলবে।
–তবু–বেঞ্জামিন মাথা নাড়ল–আমাকে ওর কাছেই ফিরে যেতে হবে।
–বেঞ্জামিন–তুমি কেন নিজেকে ঐ নরঘাতকটার কাছে নিয়ে যেতে চাইছো? বেঞ্জামিন একবার ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকাল। তারপর মুখ ফিরিয়ে বলল–লা ব্রুশের মত প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষকে তোমরা চেনো না। আমি যদি পালিয়ে যাই, ও কখনো না কখনো দেশের দিকে ফেরার পথে লিসবনের কাছাকাছি কোন জায়গায় আড্ডা গাড়বে। তারপর ওর কোন বিশ্বস্ত লোককে পাঠিয়ে আমার বৌ-ছেলেমেয়েকে খুন করাবে।
–বলো কি? ফ্রান্সিস আর ওখানে যারা উপস্থিত ছিল, সকলেই লা ব্রুশ যে কি সাংঘাতিক মানুষ, সেটা বুঝল।
তার চেয়ে এইভালো আমার যা হবার হোক–আমার বৌ-ছেলেমেয়ে বেঁচে থাক।
ফ্রান্সিস বা হ্যারি কেউ কোন কথা বলল না। দু’জনেই চুপ করে রইল। তারপর ফ্রান্সিস হ্যারিকে ডাকলো–চলো ওপরে ডেক-এ যাই।
যাবার সময় দু’জন ভাইকিংকে বললো তোমরা বেঞ্জামিনকে ওপরে নিয়ে এসো।
ওরা ডেকের ওপর এসে দাঁড়াল। দেখলো ক্যারাভেলটা দাউদাউ করে জ্বলছে। আগুনের আভায় ধারে কাছে সমস্ত এলাকাটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। মাঝে-মাঝে দু একটা গোলা ফাটছে। আগুনের ফুলকি ছিটকে উঠছে অনেকদূর পর্যন্ত।
বেঞ্জামিনকে তখন ওপরে আনা হয়েছে। ও শূন্যদৃষ্টিতে জ্বলন্ত জাহাজটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মুখ ফেরাল।
ঝড়-বৃষ্টি তখন থেমে গেছে। বাতাসের সেই উন্মত্ত বেগ আর নেই।
ফ্রান্সিসদের জাহাজের কাছে একটা ভাজিম্বাদের গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরী করা নৌকা ঢেউয়ের মাথায় ওঠা-নামা করছিল। ফ্রান্সিস একজন ভাইকিংকে বলল ঐ নৌকাটা জাহাজের কাছে নিয়ে আসতে। ভাইকিংটা জাহাজের দড়ি বেয়ে-বেয়ে জলে নামল। সাঁতরে গিয়ে নৌকোটা জাহাজের কাছে নিয়ে এল। একটা কাছিতে ফাঁস মত পরানো হ’ল। তার মধ্যে বেঞ্জামিনকে বসিয়ে সেই নৌকাটায় ধরে-ধরে নামিয়ে দেওয়া হল। একটা দাঁড়ও দেওয়া হ’ল। ভাইকিংটা নৌকোটাকে সজোরে চাঁদের দ্বীপের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজে দড়ি বেয়ে-বেয়ে আবার জাহাজে উঠে এল।
জ্বলন্ত ক্যারাভেলটার আলোয়াদের দ্বীপের তীর পর্যন্ত অনেকটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। ওরা দেখল–সেই নৌকাটা আস্তে-আস্তে, চাঁদের দ্বীপের দিকে চলেছে। বেঞ্জামিন দাঁড় টানছে বাঁহাতে। কিছুক্ষণ সেই দিকে তাকিয়ে থেকে ফ্রান্সিস সকলের দিকে তাকাল। বললো–নোঙর তোলো। দাঁড় ঘরে যাও–পাল খুলে দাও। এক্ষুণি জাহাজ ছাড়ো।
ভাইকিংদের মধ্যে উৎসাহের ঢেউ বয়ে গেল। বন্দীজীবনের শেষ। এবার মুক্ত জীবন। স্বদেশে ফিরছে সবাই। উৎসাহের সঙ্গে যে যার কাজে লেগে পড়ল! জাহাজ চলল উত্তর মুখে। ভাইকিংদের দেশের উদ্দেশ্যে। বেগবান বাতাস। মেঘমুক্ত আকাশ শান্ত সমুদ্রের ওপর দিয়ে জাহাজ চলল।
পরদিন দুপুরের দিকে চোখে পড়ল ডাইনীর দ্বীপের তটরেখা, সবুজ পাহাড়, গাছ গাছালি। সকলেই ছুটে এল ফ্রান্সিসের কাছে। ফ্রান্সিস তখন নিজের কেবিনঘরে শুয়ে ছিল। নির্বিবাদে হীরে দুটো নিয়ে দেশে না ফেরা পর্যন্ত ওর মনে স্বস্তি নেই। সবাই এসে বলল–ডাইনীর দ্বীপে এসে গেছে। বিস্কোকে খুঁজে দেখবো আমরা।
ফ্রান্সিস উঠে বসল। বললো জাহাজ তীরে ভেড়াও। জানি না বিস্কো বেঁচে আছে। কিনা, তবু আমাদের খুঁজে তো দেখতে হবে।
সমুদ্রতীরের যত কাছে সম্ভব, জাহাজ ভেড়ানো হ’ল। কিন্তু ভাইকিংদের আর দ্বীপে যেতে হ’ল না। ওরা ডেক থেকে দেখলো সমুদ্রতীরে কে একজন লোক হাতে একটা ছেঁড়া জামা নিয়ে ঘোরাচ্ছে। দূর থেকে চিনতে কষ্ট হলেও বুঝলো, ঐ লোকটাই বিস্কো।
জাহাজ থেকে একটা ছোটো নৌকো নামানো হ’ল। কয়েকজন যাবে বিস্কোকে আনতে। ফ্রান্সিস ওদের বলল লা ব্রুশের গুপ্ত ভান্ডারের সব কিছু আমরা নিয়ে আসবো। আগে বিস্কোকে সঙ্গে নিয়ে সে সব আনতে হবে।
