ত্রিম্বা।
এখানকার রাজা কে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
রাজা নেই। তবে শ’ দেড়েক বছর আগে এক সুলতান ছিল। সুলতান হানিফ।
মুসলিম রাজা? ফ্রান্সিস অবাক।
হ্যাঁ। কিছুদুরে সুলতানের বাড়ি এখন ধ্বংসস্তূপ।
খুব বড়লোক ছিল বুঝি? কৌতূহল বাড়তে থাকে ফ্রান্সিসের।
হ্যাঁ। তার স্বর্ণভাণ্ডারের কথা লোকে এখনও বলে।
এখান থেকে পোর্তুগাল কত দূরে?
তা বলতে পারব না। গরিব মানুষ। দেশ বিদেশে ঘুরব সাধ্য নেই। বৃদ্ধ উত্তর দিল।
তবু কিছু তো ধারণা আপনার আছে?
হবে উত্তরমুখো কোথাও।
ঠিক আছে। এটুকু জানলেই হবে। ফ্রান্সিস বলল।
ওদের কথা শেষ হতে না হতেই গাছের নীচে দাঁড়ানো যোদ্ধার দল ওদের কাছে এল। একজন রোগাটে চেহারার যোদ্ধা জিগ্যেস করল, কী কথা হচ্ছিল তোমাদের?
এখান থেকে পোর্তুগাল কতদূর সেটাই জানতে চেয়েছিলাম। শাঙ্কো বলল।
তোমরা বিদেশি? যোদ্ধাটি জানতে চাইল।
হ্যাঁ। আমরা ভাইকিং। শাঙ্কো বলল।
লুঠেরার জাত। যোদ্ধা যুবকটি হেসে বলল।
লোকে বলে বটে। কিন্তু আমরা লুঠেরা নই। বরং আগের বন্দরে একদল লুঠেরা আমাদের জাহাজ লুঠ করেছে। ফ্রান্সিস ওদের কথোপকথনে যোগ দিল।
তোমরা এখানে এসেছ কেন? যোদ্ধা যুবকটি বলল।
আমাদের দেশ মানে ইউরোপ কতদূর সেটা জানতে। ফ্রান্সিস বলল।
তরোয়াল এনেছ কেন?
যদি হঠাৎ আক্রান্ত হই তাহলে লড়াই করব বলে, ফ্রান্সিস বলল।
আমাদের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে পারবে?
তোমাদের সঙ্গে লড়াই করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও নেই। ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে তরোয়াল ফেলে দাও। যোদ্ধাটি বলল।
বেশ, আমরা আমাদের জাহাজে ফিরে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস জানাল।
না। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে কোমর থেকে তরোয়াল খুলে বলল, আমাদের সঙ্গে লড়াই করো। যদি তারপরেও বেঁচে থাকো তবে জাহাজে ফিরে যাবে।
আমরা দুজনমাত্র। লড়াই করবনা। ফ্রান্সিস বলল।
কাপুরুষ! তাচ্ছিল্যে মুখ বাঁকাল যোদ্ধাটি।
বিনা কারণে রক্তপাত আমরা চাই না। ফ্রান্সিস বলল।
তোমাদের বন্দী করা হল। চলো আমাদের সঙ্গে।
কোথায়? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
আমাদের দলপতির কাছে। দলপতি কী হুকুম করে দেখো। যোদ্ধাটি ওদের বলল।
কিন্তু আমরা তো কোনো অপরাধ করিনি। এবার শাঙ্কো উত্তর দিল।
সেসব দলপতি বুঝবে। এখন চুপচাপ আমাদের সঙ্গে চলো।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করল, ওদের বাধা দিতে যাওয়া বোকামি হবে।
কথাটা ও নিজেদের ভাষায় বলল। ফলে যোদ্ধারা কিছু বুঝল না। যে ওদের সঙ্গে কথা বলছিল সেই যোদ্ধাটি বেশ চড়াগলায় হুকুম করল, তরোয়াল ফেলে দাও।
ফ্রান্সিস বলল, শাঙ্কো, তরোয়াল ফেলে দাও। শাঙ্কো তবু ইতস্তত করছিল, যোদ্ধাটি শাঙ্কোর মাথার ওপর তরোয়াল উঁচিয়ে ধরল। এবার শাঙ্কো তরোয়াল ফেলে দিল।
একজন যোদ্ধা তরোয়াল দুটো তুলে নিল।
যোদ্ধাদের পেছনে পেছনে যেতে যেতে ফ্রান্সিস শাঙ্কো দেশীয় ভাষায় বলল, অতজনের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে আমাদের জীবন বিপন্ন হবে। দেখা যাক ওদের দলপতি কী বলে?
বাজার এলাকা ছাড়িয়ে লালচে ধুলোর পথ। মাঝে মাঝে সমুদ্রের দিক থেকে জোর হাওয়া আসছে। লালচে ধুলো উড়ছে। চোখ-মুখ ঢেকে মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। দূরে দেখা যাচ্ছে একটা ছোট পাহাড়।
বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পরে ফ্রান্সিসরা দেখল সামনে একটা বড় বাড়ি। বাড়িটা তৈরি পাথর আর কাঠ দিয়ে। তার পাশেই একটা ছোট সম্পূর্ণ ঘর।
শাঙ্কো মৃদুস্বরে বলল, পাশেরটা নিশ্চয়ই কয়েদঘর।
হুঁ। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল। কিছু বলল না।
বড় ঘরটার দরজা খোলা। সেই রোগা যোদ্ধাটি বলল, ভেতরে ঢোকো ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো ঘরটায় ঢুকল। বাইরের চড়া রোদ থেকে এসে প্রথমে কিছুই দেখতে পারছিল না। চোখে অন্ধকারসয়ে আসতে দেখল, একজন বয়স্ক লোক একটা কাঠের আসনে বসে আছে। আশ্চর্য! এই কালো লোকদের দেশে বয়স্ক লোকটি শ্বেতকায়। বোঝাই যাচ্ছে এ দলপতি। দলপতি ফ্রান্সিসদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর মোটা গলায় বলল, তোমরা বিদেশি?
আপনিও তো বিদেশি। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যাঁ। পোতুর্গীজ। আমার নাম এন্তানো। তোমরা? দলপতির প্রশ্ন।
আমরা ভাইকিং। আমার নাম ফ্রান্সিস।
তোমাদের বদনাম আছে। এন্তানো বলল।
জানি। আমরা তার পরোয়া করি না। ফ্রান্সিস গলায় জোর দিয়ে বলল।
তুমি দেখছি বেশ তেজি। ভালো।
ফ্রান্সিস কোনো কথা বলল না।
কিন্তু তোমাদের তো বিশ্বাস নেই।
ফ্রান্সিস চুপ করে রইল।
অবিশ্বাসের কোনো কাজ তো আমরা করিনি। এবার বলল শাঙ্কো।
তাছাড়া আমরা এখানে থাকতে আসিনি। ফ্রান্সিস যোগ করল।
আসার সময় তো একটা ছোট পাহাড় দেখেছ?
হ্যাঁ দেখেছি। পেছন দিকে। ফ্রান্সিস বলল।
ঐ পাহাড় থেকে কত যে চুনিপান্না মূল্যবান পাথর পেয়েছি। দেখবে?
না। ওসব দেখে কী হবে? ফ্রান্সিস বলল।
ঐ চুন্নিপান্না সব বিক্রি করে দেব। তারপর দেশে ফিরে গিয়ে রাজার হালে বাকি জীবন কাটিয়ে দেব।
এসব আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমরা শুনে কী করব? ফ্রান্সিস বলল।
এইজন্য শুনবে যে তোমরা সেই দামি পাথর চুরি করতে এখানে এসেছ।
ফ্রান্সিস অবাক। কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। শাঙ্কো বলে উঠল–আপনার দামি পাথরের কথা আমরা এই প্রথম শুনলাম।
উঁহু। এন্তানো হাসল, তোমরা সব খোঁজখবর নিয়েই এসেছ।
এ আপনার অন্যায় দোষারোপ ফ্রান্সিস প্রতিবাদ করে উঠল।
