ফ্রান্সিস একা লড়াই করতে ভরসা পেল না। সর্দার গলা তুলে বলল, কেউ কথা বললেই মরবে। দুজন বর্শাধারী দুজন ভাইকিং-এর বুকে বর্শারফলা চেপে ধরল। ফ্রান্সিস বুঝল এদের কথা মতো চলতেহবে। নইলে বন্ধুরা মরবে। ও ডেক-এ উঠে এল। হাতের তরোয়াল ডেক এর ওপর ফেলে দিল। বলল, আমরা লড়াই করবনা, তোমরা লুঠপাট করে চলে যাও।
সর্দার সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে বলল, নীচে চল্।
ওরা পাঁচজন সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। কেবিন ঘরগুলোয় ঢুকতে লাগল। শোরগোলে ভাইকিংদের ঘুম ততক্ষণে ভেঙ্গে গেছে। সর্দার তাদের সতর্ক করে বলল, চুপচাপ সব বসে থাকো। ভাইকিংরা চুপ করে বিছানায় বসে রইল। চলল পোশাক লুঠ। ভাইকিংরা বিছানায় বসে অবাক চোখে দেখতে লাগল।
ফ্রান্সিস বেরোবার সময় কেবিন ঘরের দরজা খুলে রেখে বেরিয়েছিল। সর্দার খোলা দরজা পেয়ে ঢুকে পড়ল। তখন মারিয়া ঘুম ভেঙে বিছানায় বসে আছে। মারিয়াকে দেখে সর্দার বুঝল এখানে কিছু গয়নাগাটি পাওয়া যাবে। ও বর্শাটা মারিয়ার দিকে তাক করে বলল, সব গয়নাগাটি দিয়ে দাও।
আমি তো বিয়ের নিমন্ত্রণ খেতে আসিনি যে গয়নাগাটি পরে আসব। মারিয়া বেশ ঝাঝের সঙ্গে বলল।
সর্দার বিশ্বাস করল না। কড়া গলায় শাসাল, কথা বাড়িও না। যা আছে দাও নইলে মরতে হবে।
মারিয়া এবার ভয় পেল। যেভাবে বর্শা তাক করে আছে, একটু এদিক ওদিক দেখলে ছুঁড়ে মারতে পারে।
ফ্রান্সিস কোথায়? মারিয়া জিগ্যেস করল। সর্দার বুঝল তরোয়াল হাতে লোকটাই ফ্রান্সিস। বলল, ওপরের ডেক এ। আমার চারজন সঙ্গী ওকে ঘিরে আছে। আর কথা না। গয়নাগাটি দাও।
মারিয়া আর কিছু বলল না। বিছানার ধারে রাখা চামড়ার ঝোলাটা বের করল। ভেতরে হাত ঢুকিয়ে গয়নার কাঠের বাক্সটা বের করে আনল। বাক্সটা এগিয়ে ধরে বলল, এই নাও। কাউকে হত্যা করতে পারবে না। সর্দার খুশির হাসি হেসে বলল, না না। আমাদের দামি জিনিস পেলেই হল। মানুষ মারব কেন? তারপর জিগ্যেস করল আর কিছু নেই?
না। আমার কাছে আর কিছু নেই।
সর্দার কথা বাড়াল। গয়নার বাক্সটা বগলে চেপে বেরিয়ে গেল।
পোশাক লুঠ শেষ করে সঙ্গীরা ডেক-এ উঠে এল। সর্দারও এল। দুজন গিয়ে পাটাতন ফেলল।
পাতা পাটাতন দিয়ে লুঠেরার দল দ্রুত নেমে গেল। তারপর পাটাতনটা জলে ফেলে দিল। তখনই সূর্য উঠল। ভোরের আলোয় দেখা গেল ওরা ডানপাশের জঙ্গলের দিকে চলেছে।
ততক্ষণে ভাইকিংরা খোলা তরোয়াল হাতে ডেক-এ উঠে এসেছে। পাটাতন নেই, পাঁচ-সাতজন জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তরোয়াল দাঁতে চেপে ধরা। ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বাধা দিতে গেল, বিপদ বাড়িও না। চলে এসো। ওরা শুনল না। তীরভূমিতে উঠে লুঠেরার দলের দিকে ছুটল। কিন্তু ধরবার আগেই জঙ্গলে ঢুকে পড়ল দলটা। ভাইকিংরা জঙ্গলের কাছে গিয়ে থমকে গেল। এই জঙ্গলের মধ্যে কোথায় খুঁজবে লুঠেরাদের? ওরা দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁপাতে লাগল। দলের মধ্যে বিস্কো ছিল। সে বলল, আমরা সংখ্যায় কম। এখন। জঙ্গলে ঢোকা নিরাপদ নয়। ফিরে চলল। তবু কয়েকজন জঙ্গলে ঢুকতে চাইল। বিস্কো বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ওদের সামলাল।
বিস্কোরা ফিরে এসে দেখল শাঙ্কোরা পাটাতন জল থেকে এনে পেতে দিয়েছে। তারা জাহাজের ডেক-এ উঠে আসতেই ফ্রান্সিস বলল, আর এক মুহূর্তও এখানে নয়। আবার একদল লুঠেরা এসে হাজির হবে। তখন সমস্যা বাড়বে। পাল তুলে দাও। নোঙর তোলো। দাঁড়ঘরে যাও। ফ্লেজার জাহাজ ছাড়ো।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ আবার ভাসল। সমুদ্র এখন অনেকটা শান্ত। ফ্রান্সিস ফ্লেজারকে বলল, উত্তরদিক ঠিক রেখে চালাও।
ঢেউ ভেঙে জাহাজ এগিয়ে চলল। দুদিন পরে একটা বন্দরের কাছে এল। জাহাজটা। তখন বেলা হয়েছে।
হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল, একটা বন্দর দেখা যাচ্ছে। কী করবে?
জাহাজ বন্দরে ভেড়াতে বলো। দেখি খোঁজখবর করে।
ফ্লেজার জাহাজঘাটে জাহাজ ভেড়াল। শাঙ্কো নোঙর ফেলল। ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে এল। দেখল জাহাজঘাটে আরও কয়েকটা জাহাজ নোঙর করা। বড় বন্দর। বাড়ি-ঘরদোর, লোকজন আছে। বাজার এলাকায় লোকজনের ভিড়। সকলেই কালো। বোঝা গেল এখানে কালো মানুষদেরই বসতি।
হ্যারি জিগ্যেস করল, নামবে?
হ্যাঁ, উত্তর দিল ফ্রান্সিস, দুপুরের খাওয়া সেরে যাব। রাতে খোঁজখবর করতে গেলে বিপদ হতে পারে।
আমি যাব?
না। শাঙ্কোকে নিয়ে আমি নামব।
বন্ধুরা নেমে একটু ঘুরে বেড়াতে চাইছিল, হ্যারি বলল।
না, আবার কোনো বিপদে পড়বে। তখন ওদের বাঁচাতে আমাদের কয়েকজনকে ছুটতে হবে। আমি আর শাঙ্কো গেলেই হবে।
দুপুরের খাওয়া শেষ হল। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো কোমরে তরোয়াল গুঁজে জাহাজ থেকে নামল।
বেশ কিছু গাছের নীচে বাজার বসেছে। ফ্রান্সিস লক্ষ করল, প্রথম গাছটার নীচে কোমরেতরোয়াল গোঁজা কয়েকজন কালো যোদ্ধা। যোদ্ধারা ওদের দুজনকে বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছে। ফ্রান্সিস বিপদ আঁচ করল। কিন্তু এখনই ফিরে যেতে গেলে বিপদ বাড়বে।
ফ্রান্সিস বাজারের কাছে এল। একজন বৃদ্ধ কেনাকাটা সেরেফিরছিল। বৃদ্ধটি ফ্রান্সিসদের দেখে হাসল। ফ্রান্সিস একটু অবাকই হল। বৃদ্ধটি হাসল কেন? ও বৃদ্ধের কাছে গেল। জিগ্যেস করল, আমাদের দুজনকে দেখে হাসলেন কেন?
তোমরা বিদেশি, তাই দেখে। বৃদ্ধ আবার হাসল।
হাঁ, আমরা বিদেশি। এই বন্দরের নাম কী? শাঙ্কো বলল।
