ফ্রান্সিস ডেক-এর ওপর উঠে এল।
গলা চড়িয়ে বলল, ভাইসব। সামাল। ঝড় আসছে। ততক্ষণে ভাইকিংরা জাহাজের পাল নামিয়ে ফেলেছে। ফ্লেজার দৃঢ় হাতে জাহাজের হুইল চেপে ধরেছে। মাস্তুলের ওপর থেকে পেড্রো নেমে এসেছে। নীচের দাঁড়ঘর থেকে দাঁড়ীরা ডেক-এ উঠে এসেছে। মাস্তুল আর হালে বাঁধা দড়িদড়া টেনে ধরে সবাই প্রস্তুত হতে হতেই প্রচণ্ড বেগে ঝড় ঝাঁপিয়ে পড়ল ফ্রান্সিসদের জাহাজের ওপর। শুরু হল ভাইকিংদের সঙ্গে ঝড়ের লড়াই। তখনই মুষলধারে বৃষ্টি নামল। ফুঁসে উঠতে লাগল সমুদ্রের ঢেউ।
আজ আর মারিয়ার সূর্যাস্ত দেখা হল না।
ঝড় চলল। উঁচু উঁচু ঢেউ এসে জাহাজের গায়ে ভেঙে পড়তে লাগল। প্রচণ্ড দুলুনির মধ্যেও ভাইকিংরা দড়িদড়া টেনে ধরে জাহাজ ভাসিয়ে রাখল।
প্রায় আধঘণ্টা ধরে ঝড়ের ঝাপটা চলল। তারপরই আকাশের কালো মেঘ উড়ে যেতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই অস্তাচলগামী সূর্য দেখা গেল। ঝড়ের ঝাপটার বেগ কমল। ডেক-এর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ভাইকিংরা যেন স্নান করে উঠেছে। কেউ কেউ এখানে-ওখানে বসে রইল। কেউ কেবিনে গেল ভেজা পোশাক পাল্টাতে।
ফ্রান্সিস ফ্লেজারের কাছে এল। বলল, দিক ঠিক রাখতে পেরেছ?
অসম্ভব। ঝড়ের ধাক্কায় জাহাজ যে কোনদিকে চলেছে বুঝতে পারছি না।
তাহলে যে কোনো ডাঙায় জাহাজ ভেড়াও। সেখানে খোঁজ নিতে হবে কোথায় এলাম। মোটামুটি উত্তরদিকটা ঠিক রাখার চেষ্টা করো।
দেখি, ফ্লেজার বলল।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলছে। মাস্তুলের ওপরে পেড্রো নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ডাঙার দেখা নেই।
আট-দশদিন কেটে গেল। কিন্তু কোথায় ডাঙা? ফ্রান্সিসরা চিন্তায় পড়ল। কোথায় চলেছে জাহাজ? বন্ধুরা ফ্রান্সিসের কাছে আসে। আশঙ্কা প্রকাশ করে। বলে, লোকবসতি থেকে আমরা অনেক দূরে কাথাও চলে এসেছি।
-না। এখনও সেটা বল যায় না। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলে। ফ্রান্সিসের কথার প্রতিবাদ করে না ওরা। কিন্তু মন থেকে বিপদের আশঙ্কা যায় না।
ডাঙার দেখা নেই। ফ্রান্সিসের বন্ধুদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বেড়েই চলল।
সেদিন বিকেলে নজরদার পেড্রো মাস্তুলের ওপর থেকে চেঁচিয়ে উঠল, ডাঙা, ডাঙা দেখা যাচ্ছে। শাঙ্কো ডেকএই বসেছিল। ছুটে রেলিঙের কাছে গেল। বিকেলের পড়ন্ত আলোয় দেখল সত্যিই ডাঙা, তবে গাছপালায় ভরা। খুব সম্ভব জঙ্গল। তা হোক, শক্ত মাটি তো বটে। বন্ধুরা এসে ভিড় জমাল। সবাই খুশি। ডাঙার দেখা পাওয়া গেছে।
শাঙ্কো ছুটল ফ্রান্সিসকে খবর দিতে। ফ্রান্সিসেরও দুশ্চিন্তা কম ছিল না। একটু পরেই ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে এল। পেছনে মারিয়া আর হ্যারি। জঙ্গল এলাকা পার হয়ে জাহাজ তখন একটা ছোট বন্দরের কাছে এসেছে। ফ্রান্সিস হারির দিকে তাকিয়ে বলল, যাক ডাঙার দেখা মিলল। ফ্রান্সিস ফ্লেজারের কাছে এল। বলল, এই ছোট বন্দরেই জাহাজ ভেড়াও। দেখা যাককোথায় এলাম?
দেখা গেল বাড়ি-ঘরদোর জাহাজঘাট থেকে বেশ দূরে।
কী করবে? হ্যারি জানতে চাইল।
রাতে আর যাব না। রাতের অচেনা অজানা জায়গায় গিয়ে বিপদে পড়েছি। ভোর হোক। তখন যাব খোঁজ করতে। ফ্রান্সিস বলল।
আবার একদিন দেরি হবে। মারিয়া বলল।
জোরে জাহাজ চালিয়ে একদিন পুষিয়ে নেব। ফ্রান্সিস উত্তর দিল।
জাহাজঘাটে নোঙর ফেলা হল। রাতের খাওয়া সেরে সবাই শুতে গেল। শাঙ্কো কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে ডেক-এই শুয়ে পড়ল। আকাশের চাঁদের আলো অনুজ্জ্বল। চারধার মোটামুটি আবছা দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রের জোর হাওয়া বেশ ঠাণ্ডা। সারাদিনের রোদে পোড়া শরীর আরাম পেল। শাঙ্কো আর বন্ধুরা ঘুমিয়ে পড়ল।
তখন শেষ রাত। হঠাৎ বর্শামুখের খোঁচা খেয়ে শাঙ্কোর ঘুম ভেঙে গেল। দেখল উদ্যত বর্শা হাতে দু’তিনজন কালো মানুষ। তাদের সারা শরীর ভেজা। বোঝা গেল সাঁতরে এসে জাহাজে উঠেছে। অন্য বন্ধুদেরও বর্শা দিয়ে খোঁজা দিতে লাগল তারা। সকলের ঘুম ভেঙে গেল। ওরা উঠে বসল। কালো বর্শাধারীরা সংখ্যায় দশ-বারো জন। বর্শাধারীদের মধ্যে থেকে একজন মোটা মতো লোক এগিয়ে এল। দাঁত বার করে হেসে বলল, আমরা তোমাদের জাহাজ লুঠ করতে এসেছি। তোমাদের দেখেই বুঝতে পারছি এখানে দামি কিছু পাব না। তবু সোনার মুদ্রা-টুদ্রা যা পাব তাতেই আমাদের লাভ। তাছাড়া পোশাক-টোশাক তো আছেই।
পোশাক-আসাকও লুঠ করবে? শাঙ্কো অবাক হয়ে জিগ্যেস করল।
যা পাওয়া যায়। লোকটি বলল। বোঝা গেল লুঠেরার দলের সর্দার এই লোকটিই।
নাও, যার কাছে আছে বের করো শিগগিরি। সর্দার তাগাদা লাগাল।
ভাইকিংরা বাধা দিতে পারল না। নিরস্ত্র অবস্থায় এখন লড়াইও করা যাবে না। যে যার ফেট্টি থেকে খুচরো মুদ্রা ডেক-এর ওপর ঠকঠক করে ফেলতে লাগল। সর্দারের সঙ্গীরা তা কুড়িয়ে নিল। শাঙ্কো ফেট্টি থেকে একটা সোনার চাকতি ফেলল। ঠক করে চাকতির শব্দ হল। সর্দার সঙ্গে সঙ্গে শাঙ্কোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শাঙ্কোর কোমরের ফেট্টি খামচে? ধরতেই আর একজন শাঙ্কোকে পেছন থেকে চেপে ধরল। সর্দার একটানে শাঙ্কোর কোমরের ফেট্টি খুলে ফেলল। ঠক ঠক শব্দে আরও কয়েকটা সোনার চাকতি পড়ল। সর্দার নিজেই সেগুলো কুড়িয়ে নিল। হেসে বলল, এই তো, কে বলল যে তোমরা গরিব?
ওপরের ডেক-এ যখন লুঠ চলছে তখন ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। ও বুঝল ওপরে কিছু একটা ঘটছে। বিছানার নীচ থেকে একটানে তরোয়াল বের করে সিঁড়ি দিয়ে ডেক এ উঠে এল ফ্রান্সিস। দেখল বর্শা হাতে একদল লোক। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে বলল, জাহাজ লুঠ করতে এসেছে। একজন বর্শার ফলাটা শাঙ্কোর পিঠে চেপে ধরল। শাঙ্কো আর কিছু বলল না। অন্য এক লুঠেরা ফ্রান্সিসকে লক্ষ্য করে বর্শা ছুঁড়ল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে সিঁড়ির কয়েক ধাপ নীচে নেমে এল। বর্শাটা সিঁড়ির ওপর গেঁথে গেল।
