দুজনেই একটু দূরে সরে এল। ধোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাপগুলো কিলবিল করতে করতে বেরিয়ে আসতে লাগল। হ্যারি আর বিন্তানো অবাক। এত সাপ? সাপগুলো এদিক ওদিক পালিয়ে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই অনেক সাপ বেরিয়ে এল। ফ্রান্সিস তবু কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর বলল–হ্যারি তোমার কোমরের ফেট্টিটা খোল। হ্যারি খুলে দিল। ফেট্টিটা নিয়ে বলল শাঙ্কো এবার গুহার মধ্যে চলো। বোধ হয় সব সাপ পালিয়েছে।
তিনজনে গুহারমধ্যে ঢুকল। বিন্তানোও খোঁড়াতে খোঁড়াতেওদের পেছনে পেছনে চলল।
গুহায় ঢুকে ফ্রান্সিস মশালের আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিকে ভালো করে দেখল। না। কোন সাপ নেই। হ্যারি আর বিন্তানো অত সোনা পান্না হীরে চুনি দেখে হতবাক।
ফ্রান্সিস বেদীটার কাছে গেল মশালটা হ্যারির হাতে দিল তারপর ফেট্টির কাপড়টা পাতলা। সোনার চাকতি হীরে মুক্তো চুনি পান্না সব কাপড়টায় ভরল। কাপড়ের মুখটা বাঁধল। একটা বোঁচকামত হল। শাঙ্কো বাঁ হাতে মশালটা নিয়ে বোঁচকাটা ডানহাতে ঝুলিয়ে নিল।
সবাই গুহা থেকে বেরিয়ে এল। বনের মধ্যে ঢুকল। চলল প্রায় অন্ধকার পথ বনতল দিয়ে। সঙ্গে বিন্তানো।
বন থেকে যখন বেরিয়ে এল তখন সন্ধে হয়ে গেছে। দুপুরে খাওয়া হয় নি। সবাই ক্ষুধার্ত। শাঙ্কো বলল–এখন কী করবে?
–আগে খেয়ে নি। ভীষণ খিদে পেয়েছে। তারপর রাজার কাছে যাবো। বিন্তানকে বলল–তুমিও আমাদের সঙ্গে খেয়ে নাও।
ঘরে ঢুকতে বন্ধুরা হৈ হৈ করে উঠল। তাদের প্রশ্ন ছিল না খেয়ে এতক্ষণ কোথায় ছিলে তোমরা। রাজকুমারী সেই তোমরা বেরিয়ে যাবার পর এসেছেন। এখনও কিছুই মুখে দেননি।
–মারিয়া তুমি খেয়ে নিলে পারতে। ফ্রান্সিস বলল।
–উপবাসী তোমরা কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছো আর আমি পেট ভরে খাবো?
–ঠিক আছে। আমাদের সঙ্গে খাবে চলো। ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু গুপ্ত ধনভাণ্ডারের কোন হদিশ পেলে? মারিয়া জানতে চাইল।
ফ্রান্সিস হেসে বলল–শাঙ্কো বোঁচকা খোল।
শাঙ্কো হাতের বোঁচকাটা ঘাসপাতার বিছানায় রাখল। গিট খুলে কাপড়টা খুলে দিল। একসঙ্গে সেই সোনার চাকতি হীরে মুক্তো দেখে সবাই হতবাক। কিছুক্ষণ সবাই চুপ। সিনাত্রা একলাফে উঠে দাঁড়িয়ে ধ্বনি তুলল–
-ও-হো-হো। সবাই ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোরা খাওয়া দাওয়া সেরে নিজেদের ঘরে এল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল। তারপর উঠে বসল। বলল–হ্যারি চলো–রাজা পাকোর্দোকে তার প্রাপ্য দিয়ে আসি। কাল সকালেই আমরা জাহাজে ফিরে যাবো।
ফ্রান্সিস হ্যারি চলল রাজবাড়ির দিকে। সঙ্গে ধনভাণ্ডারের বোঁচকা নিয়ে শাঙ্কোও চলল।
সদর দেউড়িতে পাহারারত প্রহরীকে হ্যারি বলল–যাও। রাজাকে গিয়ে বলো বিদেশিরা এসেছে। দেখা করতে চায়। বিশেষ প্রয়োজন।
প্রহরী চলে গেল। কিছু পরে ফিরে এসে বলল–মন্ত্রণাঘর খুলে দিয়েছি। আপনারা বসুন। মান্যবর রাজা আসছেন।
ফ্রান্সিসরা রাজবাড়িতে ঢুকেমন্ত্রণাকক্ষে এল। একটা পাথরের টেবিল ঘিরেআসনপাতা। একজন প্রহরী একটা মশাল জ্বেলে রেখে গেল। ফ্রান্সিসরা আসনে বসল। শাঙ্কো বোঁচকাটা টেবিলের ওপর রাখল।
কিছুক্ষণ পরে রাজা ঢুকলেন। বললেন–আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছো?
–হ্যাঁ। কালকে সকালে আমরা আমাদের জাহাজে ফিরে যাচ্ছি।
–বেশ। তোমরা আমার জন্যে যা করেছে তা আমি কোনদিন ভুলবো না।
–মান্যবর রাজা–মন্ত্রীমশাই যে ধনরত্ন গোপনে রেখেছিলেন তা আমরা উদ্ধার করেছি।
বলল কি। এ তো সত্যিই সুসংবাদ। রাজা একটু আশ্চর্য হয়েই বললেন। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ইঙ্গিত করল। শাঙ্কো গিট খুলে কাপড়টা টেবিলে পেতে দিল। সোনা হীরে মনিমুক্তো গয়নাগাটি ছড়ানো কাপড়ের ওপর। রাজা পাকোর্দো কিছুক্ষণ অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন–এত দামি জিনিস। আমি কল্পনাও করি নি। যা হোক–তোমরা কষ্ট করে উদ্ধার করেছো–তোমাদেরও তো কিছু দিতে হয়।
–আমাদের দশটা সোনার চাকতি দিন তাহলেই হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–না-না। এত সামান্য–রাজা বললেন।
–না। এর বেশি কিছু চাই না। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। তোমরা যেমন চাও। রাজা কুড়িটা সোনার চাকতি দিলেন। ফ্রান্সিস আর আপত্তি করল না।
ফ্রান্সিসরা উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস বলল–তাহলে আমরা যাচ্ছি।
ফ্রান্সিসরা রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। নিজেদের ঘরে এল।
রাত হচ্ছে। মারিয়া আর রাজবাড়িতে গেল না। ফ্রান্সিসদের সঙ্গে থেকে গেল।
ভোর হল। সবাই উঠে পড়ল। সবাই তৈরি হতে লাগল।
সকাল হল। সকালের খাবার এল। খেয়ে দেয়ে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে এল। মাঠ পার হয়ে বনভূমিতে ঢুকল। চলল সমুদ্রের দিকে।
একটু বেলায় জাহাজঘাটে পৌঁছল। ফ্রান্সিস রাঁধুনি বন্ধুদের ডেকে বলল–রান্না শুরু কর। দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে জাহাজ ছাড়বো। রাঁধুনি বন্ধুরা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। কয়েকজন পালের দড়িফড়ী বাঁধতে লাগল।
দুপুরের খাওয়া শেষ হতে জাহাজের নোঙর তোলা হল। জাহাজ ছেড়ে দেওয়া হল। জাহাজ চলল সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে।
দুপুর থেকেই আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছিল। ঝড়ের পূর্বাভাস। ভাইকিংরা জাহাজেই ঘুরে বেড়ায়। আকাশের মতিগতি ওরা ভালো বোঝে। মেঘে সূর্য ঢাকা পড়ে গেল। প্রায় অন্ধকার হয়ে এল চারদিক।
শুরু হল মেঘগর্জন। সেইসঙ্গে কালো আকাশ চিরে বিদ্যুতের ঝলকানি।
