–অথচ ছবিতে ঐ গুহামুখটা নেই। প্রশ্ন হ’ল–কেন নেই? ফ্রান্সিস বলল।
–মন্ত্রীমশাই তো বৃদ্ধই ছিলেন। নজরে পড়েনি হয়তো। হ্যারি বলল;
উঁহু। ব্যাপারটা অত সহজ সরল নয়। বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যেই ওটা আঁকেন নি। সামান্য ফুল পাখি বাদ যায় নি আর ঐ গুহামুখটা বাদ যাবে? ফ্রান্সিস বলল।
–এই ব্যাপারটা তো রাজা পাকোর্দোর নজর পড়ার কথা। হ্যারি বলল।
নজরে পড়ে নি। কারণ উনি ছবিটা আমার মত মিলিয়ে দেখেন নি। ভুলে যেও না মন্ত্রীমশাই তাঁর ছবিগুলো সম্পর্কে বলেছিলেন–তার ছবিগুলো সাংকেতিক। কোন সংকেত না দেওয়াও এক ধরনের সংকেত। চলো ঐ গুহামুখটা দেখবো। ফ্রান্সিস বলল।
তিনজনে গাছপালা বুনো ঝোঁপের মধ্যে দিয়ে চলল। একটু পরেই গুহামুখে এসে দাঁড়াল। গুহামুখ খুব বড় নয়। মাথা নিচু করে একজন মানুষ ঢুকতে পারে এমন।
ফ্রান্সিস গুহামুখের দিকে চলল। হ্যারি বলে উঠল সাবধান ফ্রান্সিস—অচেনা অজানা গুহা। ফ্রান্সিস মুখ ফিরিয়ে বলল কিন্তু দেখতে তো হবে–গুহাটা কত লম্বা। ভেতরেও কী আছে।
ফ্রান্সিস পায়ে পায়ে মাথা নিচু করে গুহার মধ্যে ঢুকল। বাইরের উজ্জ্বল রোদ থেকে গুহায় একটু ঢুকে দেখল শুধু অন্ধকার। এবড়ো খেবুড়ো গুহার গায়ের আভাস। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। অন্ধকারটা চোখে সয়ে আসতে অস্পষ্ট দেখল গুহাটা খুব বড় নয়। আর একপা ফেলতেই পায়ের নিচে কী কিলবিল করে উঠল। সাপ! ফ্রান্সিস লাফ দিয়ে সরে এল। ভাগ্য ভালো। কামড়ায় নি।
ফ্রান্সিস গুহা থেকে বেরিয়ে এল। হ্যারিদের কাছে এল। বলল–গুহাটা বেশি বড় নয়। ভেতরে সাপের গায়ে পা দিয়েছিলাম। যাকগে মশাল ছাড়া কিছুই দেখা যাবে না।
তখনই হঠাৎ পেছনে ডাল ভেঙে পড়ার শব্দ হল। সঙ্গে কার আর্তস্বর। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে পেছনে লাফ দিয়ে এক বুনো ঝোঁপের ওপর পড়ল। তারপর যে গাছের ডাল ভেঙে ঝুলছিল আর এক লাফে সেখানে গিয়ে পড়ল। আলো অন্ধকারে দেখল বিন্তানো চিৎ হয়ে পড়ে আছে। শাঙ্কো ওকে টেনে তুলল। বিন্তানো চোখমুখ কুঁচকে বলল–কোমরে বড্ড লেগেছে।
–আমরা কী করি তাই দেখতে গাছে উঠেছিলে–তাই না? শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। খুব আক্কেল হয়েছে। বিন্তানো বলল।
–ফ্রান্সিসের কাছে চলো। শাঙ্কো বলল।
শাঙ্কো বিন্তানোকে ধরে ধরে ফ্রান্সিসের কাছে নিয়ে এল। শাঙ্কো বলল–এই যে বিন্তানো। আমাদের ওপর নজরদারি চালাতে গিয়ে গাছের ডাল ভেঙে মাটিতে পড়েছে।
–বিন্তানো কী শাস্তি চাও? ফ্রান্সিস বলল।
যথেষ্ট শাস্তি হয়েছে আমার। কোমরটা বোধহয় ভেঙেই গেছে।
-ঠিক আছে ঐ ভাঙা কোমর নিয়ে যাও। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দু’টো মশাল নিয়ে এসো।
–বেশ। যাচ্ছি। কিন্তু মশাল নিয়ে কী করবে? বিন্তানো জানতে চাইল।
–এই গুহায় ঢুকবো। ফ্রান্সিস বলল।
–সর্বনাশ। এই গুহায় সাপের আড্ডা। এই গুহার ত্রিসীমানয় কেউ আসেনা। বিন্তানো বলল।
–ঠিক আছে। তুমি মশাল চকমকি পাথর নিয়ে এসো। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। যাচ্ছি। তবে কোমরের যা অবস্থা। বিন্তানো বিরসমুখে বলল।
-ওটাই তোমার শাস্তি। যাও। ফ্রান্সিস বলল।
বিন্তানো বিড়বিড় করে আপনমনে বকতে বকতে চলে গেল। ফ্রান্সিসরা এখানে ওখানে পাথরের ওপর বসে রইল।
বিন্তানো যখন মশাল নিয়ে ফিরে এল তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এসেছে। বিন্তানো দু’টো মশাল ফ্রান্সিসের হাতে দিয়ে একটা পাথরের ওপর বসে হাঁফাতে লাগল। মুখ কুঁচকে কোমরের ব্যথা সহ্য করতে লাগল।
শাঙ্কো চকমকি পাথর ঠুকে মশাল জ্বালল। ফ্রান্সিসকে একটা মশাল দিল। অন্যটা নিজে নিল।
এবার দুজনে মশাল হাতে গুহার মধ্যে ঢুকল। একটা কেমন ঠাণ্ডা হাওয়া গুহার মধ্যে থেকে ছুটে এল। ফ্রান্সিসের শরীরটা একটু কেঁপে উঠল।
বেশ কিছুটা যেতেই চোখের সামনে এক অদ্ভুত দৃশ্য। ফ্রান্সিস থমকে দাঁড়াল। পেছনে শাঙ্কোকে হাত দিয়ে থামাল। সামনেই একটা অমসৃন পাথরের বেদী মত। কত বিচিত্র রঙের সাপ ছোটবড় সাপ এদিক ওদিক কিলবিল করছে। নড়ছে জড়াজড়ি করছে ফণা তুলছে। মশালের আলো পড়ে সাপগুলোর গায়ের আঁশ চক্করছে। আরও আশ্চর্য ছোট চত্বরটা জুড়ে ছড়ানো হীরে মুক্তো। মণিমানিক্য গয়না গাটি। ওগুলোর মধ্যে দিয়েই সাপগুলো যেন খেলে বেড়াচ্ছে।
তাকিয়ে থাকতে থাকতে ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল
–শাঙ্কো–মন্ত্রীমশাই এখানেই এই ধনসম্পদ গোপনে রেখেছিলেন।
–তাহলে এটাই সেই গুপ্ত ধনভাণ্ডার? শাঙ্কো মৃদুস্বরে বলল।
–হ্যাঁ। ছবিতে কোন সংকেতনা দিয়েই এই সংকেত দিয়ে গিয়েছিলেন। ফ্রান্সিস বলল।
কী করবে এখন? শাঙ্কো প্রশ্ন করল।
–সাপ তাড়াবার ব্যবস্থা করতে হবে। বাইরে চলো। ফ্রান্সিস বলল।
দু’জনে গুহা থেকে বেরিয়ে এল। হ্যারি সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল কিছুহদিশ পেলে?
–হ্যাঁ। এই গুহাতেই আছে গুপ্তধন। কিন্তু তা উদ্ধার করতে এখনও কিছু কাজ বাকি। চলো-বেশ কিছু শুকনো কাঠ জোগাড় করতে হবে।
একটু খোঁড়াতে খোঁড়াতে বিন্তানো এগিয়ে এল। বলল–গুপ্তধন এখানেই আছে?
-হ্যাঁ। তবে এখনো হাতের নাগালের বাইরে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা মশাল পাথরের খাঁজে রেখে বনের মধ্যে ঢুকল। গাছের শুকনো ডালপাতা জোগাড় করে নিয়ে এল। গুহার মুখে জড়ো করল। মশালের আগুনে ডালপাতায় আগুন জ্বালল। তারপর সেসব গুহার মধ্যে ছুঁড়ে ফেলতে লাগল। আগুনে ধোঁয়ারও সৃষ্টি হল। গুহা ধোঁয়ায় ভরে গেল। সেইসঙ্গে আগুনও ছড়াল। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো–গুহামুখ থেকে সরে এসো।
