শাঙ্কো আর বিনেলোকে নিয়ে হ্যারি চলল রাজবাড়ির দিকে।
ওরা রাজবাড়ির রাজসভাঘর এঘর ওঘর খুঁজলো। কোথাও বিন্তানোকে পেল না। খুঁজতে খুঁজতে রান্নাঘরের পাশের রসুইঘরে গেল। দেখল কাঠের লম্বা পাটাতনে বসে বিন্তানো খাবার খাচ্ছে। হ্যারি ওর সামনে এসে দাঁড়াল। খেতে খেতে বিন্তানো মুখ তুলে বলল–কী ব্যাপার?
–তোমাকেই খুঁজছিলাম। ফ্রান্সিস তোমাকে ডেকেছে। আমাদের সঙ্গে চলো। হ্যারি বলল।
–আমি কী করে যাবো? আমার অনেক কাজ। রাজা খবর পেয়েছিল। তার বেশ কিছু সৈন্য বনে পাহাড়ে আত্মগোপন করে আছে। তাদের আনতে যেতে হবে। রাজার হুমুক। বিন্তানো খেতে খেতে বলল।
তার আগে ফ্রান্সিসের কাছে চলো। হ্যারি বলল।
না না। রাজার হুকুম। বিন্তানো বলল।
হ্যারি ডাকল– শাঙ্কো। শাঙ্কো জামার তলায় হাত ঢুকিয়ে ছোরাটা বের করল। ছোরাটা বিন্তানোর পিঠে চেপে ধরে শাঙ্কো বলল–তোমাকে আমাদের সঙ্গে যেতেই হবে। তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। বিন্তানো এতটা ভাবেনি। ও বোকাটে মুখে শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে রইল। শাঙ্কো তাড়া লাগালজলদি খেয়ে নাও। বিন্তানো বুঝল এ বড় কঠিন ঠাই। ওকে মেরেই না ফেলে। ও হাপুস্ হুপুস করে খেয়ে নিল। হাতমুখ ধুয়ে বলল–বেশ চলো।
বিন্তানোকে নিয়ে ফিরে এসে ওরা দেখল ফ্রান্সিস শুয়ে আছে। ওদের দেখে ফ্রান্সিস উঠে বসল। বলল–বিন্তানো–দুর্ঘটনার পরে আমি বেঁচে আছি মরে গেছি–এসব না দেখেই পালিয়ে এলে কেন?
–ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। বিন্তানো বলল।
–যদি বলি তুমি ভালো করেই জানতে ঐ পাথরের চাইটা নড়বড়ে। যে কেউ ওটায় উঠলে টাল সামলাতে পারবে না। ফ্রান্সিস বলল।
-না-না। আমি জানতাম না। বিন্তানো জোরে মাথা নেড়ে বলল।
–না বিন্তানো-তুমি জানতে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস মন্ত্রীমশাই নিশ্চয়ই তার গুপ্ত। ভাণ্ডারের কিছু হদিশ তোমাকে দিয়ে গেছেন। ফ্রান্সিস বলল।
-না-না। আমি কিছু জানি না। মন্ত্রীমশাই এই ব্যাপারে আমায় কিছু বলে যান নি। বিন্তানো একইভাবে বলল।
উঁহু। তুমি জানো ফ্রান্সিস বলল।
–বললাম তো–ফ্রান্সিস ওকে কথাটা শেষ করতে দিল না। বলে উঠল
কথা বাড়িও না। ঐ ছবিগুলো সম্বন্ধে মন্ত্রীমশাই নিশ্চয়ই তোমাকে কিছু বলে গেছেন।
–বলেছিলেন–তবে তেমন কিছু না।
–তেমন কিছু কিনা সেটা আমি বুঝবো। তুমি বলো–মন্ত্রীমশাই কী বলেছিলেন?
কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন–আমার আঁকা ছবিগুলো সাংকেতিক।
–সাংকেতিক–এই শব্দটাই বলেছিলেন?
–হ্যাঁ।
–কোন বিশেষ একটা ছবি না সব ছবি?
–তা তো বলতে পারবো না।
–কাজেই বোঝা যাচ্ছে–ছবিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা আমি আগেই ভেবেছিলাম। এবার নিশ্চিত হলাম। যাক গে বিন্তানো-জেনে রাখো তোমার সঙ্গে আমার সব সম্পর্ক শেষ। তোমাকে আমি আর বিশ্বাস করি না। একটা কথা–এই গুপ্ত ধনভাণ্ডার আমি উদ্ধার করবোই। রাজাকে বলে তোমাকে তার কিছু অংশ দিতাম। সেটা আর তোমার ভাগ্যে জুটল না। তুমি যাও। আর কক্ষণো আমাদের কাছে এসো না। বিন্তানো আর কোন কথা বলতে পারলো না। আস্তে আস্তে চলে গেল।
–ছবিগুলো আবার ভালো করে দেখতে হবে। মেলাতে হবে বাস্তব বনের দৃশ্যগুলোর সঙ্গে। সব রহস্যের সমাধান আছে ঐ ছবিগুলোরই মধ্যে। ফ্রান্সিস বলল।
–এতগুলো ছবির মধ্যে থেকে সূত্র পাবে কী করে? হ্যারি জানতে চাইল।
–সেটা ছবিগুলো বাছাই করে হিসেব করতে হবে। সেইজন্যেই ছবিগুলো ভালোভাবে দেখতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
পরের দিন সকালে ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল-চলো। রাজবাড়িতে যাবো। ছবিগুলো ওখানেই রাখা হয়েছে।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি রাজসভায় যখন পৌঁছল তখন রাজসভায় বিচার চলছে।
–একটু অপেক্ষা করতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
বিচারের কাজ চলল। একসময় বিচার শেষ হল। রাজা পাকোর্দো ফ্রান্সিসকে এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিস এগিয়ে গিয়ে মাথা একটু নিচু করে সম্মান জানিয়ে বলল– মান্যবর রাজা–আমরা মন্ত্রীমশাইয়ের আঁকা ছবিগুলো আমাদের ঘরে নিয়ে যাবো। ছবিগুলো ভালো করে দেখতে চাই।
–বেশ তো। রাজা বললেন। তারপর একজন প্রহরীকেইশারায় ডাকলেন। ফ্রান্সিসকে বললেন–প্রহরী যাচ্ছে। ওই ছবিগুলো তোমাদের ঘরে পৌঁছে দেবে।
ফ্রান্সিস হ্যারি রাজবাড়ির বাইরে এসে অপেক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে প্রহরী ছবিগুলো নিয়ে এল। ফ্রান্সিসরা ওকে নিয়ে চলল।
ফ্রান্সিসদের ঘরে ছবিগুলো রেখে প্রহরী চলে গেল। ফ্রান্সিস ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল। তুমি তিনখানা ছবি নাও। হ্যারিকে বলল–তুমি একটা নাও। বাকি দুটো আমি নিচ্ছি। এবার চলো–বন পাহাড়ের দিকে।
ছবি নিয়ে বনভূমিতে ঢুকল তিনজনে।
আগের দিন দেখা জায়গাটায় এল। ফ্রান্সিস দৃশ্যটার সঙ্গে ছবিগুলো মেলাতে মেলাতে একটা ছবি মেলাল। হিসেব করে দেখল ছবিটা মন্ত্রীমশাইর বাড়িতে ছিল।
আবার চলল তিনজনে। গতকালের জায়গায় এল। ছবি মেলাল। মন্ত্রীর বাড়িতে রাখা ছবিটা মিলল।
এমনি করে ঝর্নার কাছে এল। ছবি মিলিয়ে দেখল দুটো ছবির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। এই দুটো ছবি রাজার শয়ন কক্ষের দেয়ালে টাঙানো ছিল। সূর্য অস্ত যাচ্ছে পাহাড়ের গায়ে–এই তিন নম্বর ছবিটা মিলল না। এটাও রাজার শয়নকক্ষেটাঙানো ছিল। ফ্রান্সিস ছবিটা। নিয়ে আরো বাঁদিকে সরে এল। আকাশের দিকে তাকাল। সূর্য প্রায় মাথার ওপর। যদি সূর্যটাকে পাহাড়ের গায়ে নামিয়ে ভাবা যায় অর্থাৎ অস্ত যাচ্ছে এরকম ভাবা যায় তাহলে মিলে যাচ্ছে। তখনই ভালোভাবে মেলাতে গিয়ে দেখল পাহাড়ের নিচে একটা গুহামত। কিছু গাছ ডালপাতার আড়াল দেখা যাচ্ছে। খুব স্পষ্ট নয়। কিন্তু ছবিতে সেটা আঁকা নেই। ফ্রান্সিস একটু আশ্চর্যই হল। মন্ত্রীমশাই এত নিখুঁত গাছডালপালা পাহাড়ের অংশ নীল আকাশ পাখি এঁকেছেন অথচ ঐ অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে গুহামুখটা সেটাই আঁকেন নি। কী করে এই ভুলটা হল? তাহলে কি উনি গুহামুখটা দেখতে পাননি? অথবা ইচ্ছে করেই ওটা বাদ দিয়েছেন। বাদ দিয়ে থাকলে কেন বাদ দিয়েছেন? ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–পাহাড়ের গায়ে একটা অস্পষ্ট গুহামুখ। হ্যারি ভালো করে তাকাল। সত্যিই তো! একটা গুহামুখ। তবে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছেনা। হ্যারি বলল–হ্যাঁ। তবে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছেনা।
