মারিয়া কেঁদে ফেলল। ছুটে গিয়ে ফ্রান্সিসের মাথা কোলে তুলে নিয়ে বসে পড়ল। ভীতস্বরে ডাকল–ফ্রান্সিস–ফ্রান্সিস–হ্যারিও ততক্ষণে এসে পড়েছে। ফ্রান্সিস চোখ মেলে তাকাল। তারপর আস্তে আস্তে উঠে বসল।
-খুব লেগেছে? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
–মাথাটা–ঘুরছে। ম্লান হেসে ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া সঙ্গে সঙ্গে ওর পোশাকের নিচে লম্বালম্বি ছিঁড়ে ফেলল। আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের মাথায় বাঁধতে লাগল। ফ্রান্সিস চোখমুখ কুঁচকে বলল লাগছে। এবার মারিয়া সাবধানে বাঁধতে লাগল। বাঁধা শেষ হল। ফ্রান্সিসের বোধহয় একটু কষ্ট কমল। ও আস্তে আস্তে উঠতে গেল।
–এখন উঠো না। একটু শুয়ে থাকো হ্যারি বলল।
–ঝোঁপটা থাকায়–চোটটানইলে হাত পা ভাঙতো। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল।
–ঠিক আছে। একটু বিশ্রাম নাও। হ্যারি বলল।
–না-না–গায়ে তেমন লাগেনি। ফ্রান্সিস বলল।
–তবু একটু পরে ওঠো। মারিয়া বলল।
–বেশ। ফ্রান্সিস শুয়ে রইল। একটু পরে বলল–বিন্তানো কোথায়?
–ও আসেনি। হ্যারি বলল।
–হুঁ। ফ্রান্সিস শুয়ে রইল। মারিয়া হ্যারি বসে রইল।
এবার ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। তখনও ওর শরীরটা অল্প অল্প কাঁপছে। বলা যায় একেবারে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচলোও। একেবারে মৃত্যু না হলেও হাত পা ভেঙে চিরদিনের জন্যে পঙ্গু হয়ে যেত।
মারিয়া তখনও ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–আমি সুস্থ। কেঁদো না। মারিয়া হাতের উল্টো পিঠে দু’চোখ মুছে বলল–হাঁটতে পারবে?
মনে হয়–পারবো। কথাটা বলে ফ্রান্সিস একবার টাল নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। হ্যারি ওকে প্রায় জড়িয়ে ধরে চলল। হ্যারি শরীরের দিক থেকে বরাবরই দুর্বল। ও কি পারে ফ্রান্সিসের শরীরের ভার সামলাতে? তবু টান নিতে নিতে চলল।
বেশ কিছুক্ষণ পরে তিনজনে পাথরের চাইটার পেছন থেকে বাইরে বেরিয়ে এল।
আশ্চর্য! বিন্তানো নেই। হ্যারি আশা করেছিল বিন্তানো এসে ফ্রান্সিসকে ধরলে ফ্যান্সিসকে বাকি পথটা সাবধানে নিয়ে যাওয়া যাবে। হ্যারি এদিক ওদিক তাকিয়ে বার বার ডাকতে লাগল–বিন্তানো-বিন্তানো। নাঃ। বিন্তানো এই তল্লাটেই নেই। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে বলল
–এই সন্দেহ আমি আগেই করেছিলাম।
–কী সন্দেহ? তার মানে–মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ। বিন্তানো জানতো ঐ পাথরের ওপর দাঁড়ানো বিপজ্জনক। ফ্রান্সিস বলল।
–বিন্তানো সব জেনেশুনে–হ্যারিকথাটা শেষ করতে পারল না। ফ্রান্সিস বলল
–হ্যাঁ বিন্তানো মন্ত্রীমশাইয়ের ছবি সম্বন্ধে এমন কিছুজানে যা ও আর কাউকে জানাতে চায় না। আমার খোঁজখবরের নমুনা দেখেও বুঝতে পেরেছেআমি ঠিকপথে এগোচ্ছি। তাইও আমাকে মেরে ফেলতে বা আহত করতে চেয়েছিল যাতে আমি খোঁজাখুঁজি করতে না পারি।
-আশ্চর্য! আমরা এতটুকু বুঝতে পারি না। হ্যারি বলল–এরমধ্যে ওকে শাস্তি পেতে হবে।
–ঠিক আছে। যা করার ঠিক করবো। ফ্রান্সিস বলল।
ওরা বনে ঢুকল। গায়ে হাতে পায়ে ব্যথা যন্ত্রণা নিয়ে ফ্রান্সিস বনের মধ্যে দিয়ে চলল। হ্যারি বেশ কষ্ট করে ফ্রান্সিসকে ধরে ধরে নিয়ে চলল।
বনের বাইরে মাঠে এসে ওরা যখন পৌঁছলো তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে।
ওরা সৈন্যাবাসের ঘরে ঢুকতে বন্ধুরা প্রায় ছুটে এল। সবাই জানতে চায় ফ্রান্সিস কিভাবে আহত হল। হ্যারি আস্তে আস্তে সব বলতে লাগল। ফ্রান্সিস ততক্ষণে ঘাসপাতার বিছানায় শুয়ে পড়েছে।
মারিয়া ভেনএর কাছে ছুটে এল। বলল–ফ্রান্সিস আহত। কপাল কেটে গেছে। একটা কিছু করুন।
কী করবো রাজকুমারী। আমার ওষুধ টষুধ সবই তো জাহাজে। আপাতত একটা কাজ করুন। শুনলাম তো পড়ে গিয়ে লেগেছে। এক কাজ করুন। গায়ে হাতে পায়ে। জলে ভেজা ন্যাকড়া বুলিয়ে দিন। কষ্ট অনেকটা কমবে।
–বেশ। তাই করছি। মারিয়া বলল।
–বলছিলাম–রাজা পাকোর্দোর সঙ্গে তো ফ্রান্সিসের সম্পর্ক খুব ভালো। রাজাকে বললে তার বৈদ্য এসে ওষুধ দিয়ে যেতে পারবে। হ্যারি বলল।
হ্যাঁ। এটা করা যায়। আমি নিজে রাজাকে বলতে যাবো। মারিয়া বলল।
মারিয়া ফ্রান্সিসের কাছে এল। নিজের পোশাকের ঝুল থেকে আরো কাপড় ছিঁড়ল। একটা কাঠের গ্লাসে জল নিয়ে এল। তারপর ন্যাকড়া ভিজিয়ে ফ্রান্সিসের সারা গায়ে আস্তে আস্তে বুলিয়ে দিতে লাগল। ফ্রান্সিস চোখ বুজে শুয়ে রইল।
এবার মারিয়া হ্যারিকে ডাকল। বলল হ্যারি-ফ্রান্সিসের গায়ে হাতে পায়ে জলে ভেজা ন্যাকড়াটা বুলিয়ে দাও। আমি বৈদ্য ডাকার ব্যবস্থা করছি।
–বেশ। আপনি যান। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া রাজার সঙ্গে দেখা করতে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরে রাজবৈদ্য এল। ফ্রান্সিসকে পরীক্ষা টরীক্ষা করে কপালে ওষুধ লাগাল। শরীরেও মাখবার ওষুধ দিয়ে গেল। ওষুধ পড়ায় ফ্রান্সিস একটু সুস্থবোধ করল। চুপ করে কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি–বিন্তানোকে দেখেছো?
না। হ্যারি মাথা নেড়ে বলল।
–একটু রাজবাড়িতে যাও। ওকে খুঁজে বের কর। তারপর ধরে নিয়ে এসো। ফ্রান্সিস বলল।
–ও যদি আসতে না চায়? হ্যারি বলল।
–জোর করে নিয়ে আসবে। ফ্রান্সিস বলল।
–ওসব জোরাজুরি–আমি পারবো না। বরং শাঙ্কো আর বিনেলো যাক।
-ঠিক আছে। তুমি ওদের দুজনকে ডাকো। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি দু’জনকে ডেকে নিয়ে এল। ওরা আসতে ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি বিন্তানোকে ধরে আনতে যাচ্ছে। যদি বিন্তানো আসতে না চায় শাঙ্কো তুমি ছোরা দেখিয়ে ওকে নিয়ে আসবে।
