বিন্তানো বলল–গাছ-গাছালির রস সবুজ পাথর ফলের রস এসব থেকেই উনি রঙ তৈরি করে নিতেন। এই কাজে কখনো সখনো মন্ত্রী মশাইকে আমিও সাহায্য করেছি।
–হুঁ–ফ্রান্সিস বলল–ছবিগুলো নিয়ে চলো। পরে ভালোভাবে দেখতে হবে।
সবাই মালখানা ঘর থেকে ছবিগুলো নিয়ে বেরিয়ে এল। মশাল নিভিয়ে ফেলা হল।
বেরিয়ে আসার আগে ফ্রান্সিস রাজার শয়নকক্ষে ঢুকল। দেখল রাজা একটা চামড়া এ মেশানো লম্বা কাগজ পড়ছেন। ফ্রান্সিস বলল–ভেতরে আসবো? রাজা কাগজ রেখে উঠে বসলেন। বললেন–এসো এসো। ফ্রান্সিস রাজার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল–মাননীয় রাজা-আপনার এই ঘরের দেয়ালে তিনটে চতুষ্কোণ ছাপ দেখলাম। কী ছিল ঐ তিনটে জায়গায়?
–মন্ত্রীমশাইয়ের আঁকা তিনটে ছবি পেরেকে ঝোলানো ছিল। অনেকদিন ছিল। তাই পাথরের দেয়ালে ছাপমত পড়ে গেছে। রাজা বললেন।
–আমরা মালখানাঘর থেকে বস্তাবন্দী করে রাখা ছবিগুলোনিয়ে এসেছি। অনুরোধ কোন তিনটে ছবি টাঙানো ছিল যদি দয়া করে দেখিয়ে দেন। কথাটা বলে ফ্রান্সিস ছবিগুলো তুলে তুলে রাজাকে দেখাতে লাগল। রাজা তিনটে ছবি দেখালেন।
–ঠিক এই তিনটে ছবিই? ফ্রান্সিস প্রশ্ন করল।
–হা হা। তিনরাত তো ছবিগুলো দেখতাম। ভুল হবে কী করে। রাজা বললেন।
ফ্রান্সিস বিন্তানোকে বলল–ছবি তিনটে যেখানে ঝোলানো ছিল সেভাবে ঝুলিয়ে দাও। বিন্তানো ছবি তিনটে নিয়ে পেরেকে ঝুলিয়ে দিল। ফ্রান্সিস দেখল একটা ছবিতে শুধু গাছপালা ফুল। অন্যটায় একটা ঝর্ণাআঁকা চারপাশে গাছপালা ফুল। অন্যটায় পাহাড়ের পেছনে লাল সূর্য অস্ত যাচ্ছে। গাছপালা ফুল।
–তাহলে বাকি ছবিগুলো মন্ত্রীমশাইয়ের বাড়িতে ছিল। তাই না বিন্তানো?
-হ্যাঁ। মন্ত্রীমশাইয়ের বাড়িতে ঐ তিনটে ছবি আমি দেখেছি অনেকদিন। ফ্রান্সিস মনোযোগ দিয়ে ছবিগুলো দেখতে লাগল। ছবিগুলোর রঙ খুব উজ্জ্বল নয়। কিন্তু মঙগুলো বেশ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। রঙগুলো অনুজ্জ্বল হওয়ায় কেমন যেন স্বপ্নে দেখা গাছ লতাপাতা ফুল পাহাড় মনে হচ্ছে।
–ম্যান্যবর রাজা–আমরা তাহলে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।
–এসো। রাজা বললেন। তারপর কাগজটা পড়তে লাগলেন।
ফ্রান্সিরা রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। সৈন্যাবাসের দিকে আসতে আসতে হ্যারি বলল–এবার কী করবে?
–দুপুরে খেয়েদেয়ে বনভূমি পাহাড়ের দিকে যাবো। মন্ত্রীমশাই কোন কোন জায়গার ছবি এঁকেছিলেন সেটা মেলাবো। ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে বনপাহাড় এলাকায় যাবে? বিন্তানো জানতে চাইল।
-হ্যাঁ। তুমিও আমাদের সঙ্গে যাবে। ছবির সঙ্গে ঐ এলাকা মেলাবো। তুমি সঙ্গে থাকলে সুবিধে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–আমিও যাবো। মারিয়া বলল।
–নিশ্চয়ই যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
দুপুরের খাওয়া দাওয়া সারল ফ্রান্সিসরা বিন্তানো আর মারিয়া এল। ফ্রান্সিসরা চলল বনভূমি আর পাহাড়ের দিকে।
বনের মধ্যে ঢুকল সবাই। বনতলে অন্ধকার। গাছের গুঁড়ি এড়িয়ে ঝোঁপ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলল সবাই।
একটা অল্প ফাঁকা জায়গায় এল সবাই। সামনের দিকে তাকিয়ে বিন্তানো বলল– এখানে বসে মন্ত্রীমশাই ছবি এঁকেছিলেন। ফ্রান্সিস ভালো করে তাকিয়ে দেখল সমানে গাছগাছালি লতাপাতা। গাছে গাছে জড়ানোলতাগাছগুলোয় সুন্দর ঘন নীল রঙের ফুল ফুটে আছে। ফ্রান্সিস চিন্তা করে দেখল এমনি গাছলতার ফুল মন্ত্রীমশাই এঁকেছেন। বিন্তানো এগিয়ে চলল। পেছনে ফ্রান্সিসরা। একটা খাদের কাছে এল। খাদের ধারে এসে বিন্তানো বলল–এখানে বসেও মন্ত্রীমশাইছবি এঁকেছেন। ফ্রান্সিস সামনের দিকে বেশ মনোযোগের সঙ্গে তাকাল। দেখল গাছগাছালির পেছনে পাহাড়ের মাথাটা দেখা যাচ্ছে। গাছগুলো হলুদ ফুলে ফুলে ছাওয়া। ফ্রান্সিস চিন্তা করল মন্ত্রীমশাইয়ের একটা ছবির কথা। বুঝল এমনি দৃশ্যই দেখেছে একটা ছবিতে।
আবার চলল সবাই। তখনই জলে ছড়িয়ে পড়ার মৃদুশব্দ শুনল। বেশ কিছুটা এগোতেই দেখল একটা ঝর্ণ। কালচে পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে ঝর্ণার জল গড়িয়ে নামছে। এখন জলের শব্দ স্পষ্ট। ঝর্ণার দু’ধারে ফার্ন গাছের ঝোঁপ। ফ্রান্সিসের মনে পড়ল ঝর্ণা আঁকা ছবিটা। এখানেও বড়বড় গাছ রয়েছে। তবে ফুল নেই কোথাও। দূরে পাহাড়ের মাথাটা অনেক বড় দেখাচ্ছে। পাহাড়ের মাথার দিকে সূর্য। সূর্য অস্তগামী। এই ছবিটাও ফ্রান্সিসের মনে পড়ল।
বন শেষ। তারপরেই কালচে পাথরের পাহাড় শুরু। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল– এদিকে আর গাছগাছালি নেই।
–ঠিকই ধরেছো-বিন্তানো হেসে বলল–শুধু পাহাড় মন্ত্রীমশাই কখনও আঁকেন নি। শুধু গাছপালা ঝর্না ফুল এসব এঁকেছেন। তবে পাহাড়ের দিকে বসে এদিকে তাকিয়ে বনের ছবিও এঁকেছিলেন।
চলো। দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা বিন্তানোর পেছনে পেছনে চলল। পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বিন্তানো চলল। একজায়গায় এসেওপরের দিকে উঠতে লাগল কিছুটা উঠতেই দেখা গেল পাথরের একটা বড় চাই। অঙ্ক আঙ্গুল দিয়ে চাইটা দেখিয়ে বিন্তানো বলল–ঐ চাইটার ওপর উঠতে হবে।
–হ্যারি–তোমরা থাকো। আমি উঠছি। ফ্রান্সিস বলল। ফ্রান্সিস পাথরের চাইয়ের খাঁজ ধরে ধরে উঠতে লাগল। বিন্তানো কিন্তু উঠল না। এটা দেখে মারিয়া বলল–তুমি উঠলে না?
আগে তো উঠেছি। তাই আর উঠলাম না। বিন্তানো বলল। কিন্তু মারিয়া অত সহজভাবে ব্যাপারটা নিল না। ও দুশ্চিন্তায় পড়ল। ততক্ষণে ফ্রান্সিস পাথরের চাইটার ওপর উঠে দাঁড়িয়েছে। মারিয়া চিৎকার করে ফ্রান্সিসকে সাবধান করতে গেল। তখনই পাথরের চাইটা জোরে নড়ে গেল। ফ্রান্সিস টাল সামলাতে পারল না। পা হড়কে চাইটার পেছনে পড়ে গেল। সেইসঙ্গে কিছু পাথরের টুকরো ধুলো ঝুরঝুরু করে পড়ল। একটু পরেই মারিয়া চিৎকার করে ডাকল ফ্রান্সিস। তারপর ঐ চাইটার পেছন দিকে ছুটল। কিন্তু দ্রুত যাবে কী করে? ছোট ছোট পাথরের চাই ছড়ানো। তার মধ্যে দিয়েই মারিয়া টাল সামলে নিল। হ্যারি সম্বিত ফিরে পেল। সেও চলল ওদিকে। শুধু বিন্তানো দাঁড়িয়ে রইল। পাথরের ছোট ছোট চাইয়ের ওপর পা রেখে রেখে টাল সামলাতে সামলাতে বেশ কিছুক্ষণ পরে দুজনে ওপারে পৌঁছল। দেখল একটা বুনো জংলা গাছের ঝোঁপের ওপর ফ্রান্সিস কাত হয়ে পড়ে আছে। কাছে এসে দেখল ফ্রান্সিসের কপাল দিয়ে রক্ত ঝরছে। ফ্রান্সিস চোখ বুজে পড়ে আছে।
