খাওয়া শেষ করে বিন্তানো ফ্রান্সিসের কাছে এল।
–কী ব্যাপার বলো তো? ও জানতে চাইল।
–তোমাদের মন্ত্রীমশাই এক ধনভাণ্ডার এই রাজ্যেই কোথাও গোপনে রেখে গেছেন যার খোঁজ রাজা পাকোর্দো বা রানি কেউ রাখেন না। হ্যারি বললো।
–হ্যাঁ। তবে রাজা পাকোর্দো সেই ধনভাণ্ডার খোঁজার কোন চেষ্টাই করেননি। এই রাজা পাকোর্দো এক অদ্ভুত ধরনের মানুষ। বিন্তানো বলল।
যাক গে। আমি সেই ধনভাণ্ডার খুঁজে বের করবো। ফ্রান্সিস বলল।
–রাজা আনোতারও অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কোন হদিশই করতে পারেনি। বিন্তানো বলল।
–রাজা আনোতার মাথা মোটা লোক। ওর বুদ্ধিতে কুলোয় নি। ফ্রান্সিস বলল। –তুমি পারবে? বিন্তানো বলল।
–চেষ্টা তো করি। যাকগে তুমি রাজা পাকোর্দোর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এসো– আমরা রাজবাড়িরসব জায়গা খুঁজবো।
–বেশ। আমি রাজার অনুমতি নিতে যাচ্ছি। বিন্তানো বলল।
বিন্তানো চলে গেল। তখনই।
পরদিন সকালে মারিয়া এল। বলল–সকালে গুপ্ত ধনভাণ্ডার খুঁজতে বেরুবে। বলেছিলে।
–হ্যাঁ যাবো। আমরা রাজবাড়ীর অন্দরমহলে যাবো। বিন্তানো রাজার অনুমতি নিয়ে এসেছে।
মারিয়া আর হ্যারিকে সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্সিস চলল। যেতে যেতে মারিয়াকে বলল–রানি আর অন্দরমহলের স্ত্রীলোকদের কাছ থেকে জানবে অন্দরমহলের কোথাও গুপ্ত গর্ভঘর আছে কিনা। অথবা অব্যবহার্য কোন ঘরটর আছে কিনা।
–আচ্ছা। মারিয়া মাথা নেড়ে বলল।
ফ্রান্সিস! ডাক শুনে ফ্রান্সিস পিছু ফিরে তাকাল। দেখল বিন্তানো আসছে। বিন্তানো এগিয়ে এসে বলল–আমি তোমাদের সঙ্গে গেলে সব দেখতে টেখতে তোমাদেরসুবিধে হবে।
–বেশ। চলো। ফ্রান্সিস বলল।
রাজবাড়িতে ঢুকল সবাই। অন্দরমহলের দরজায় দাঁড়ানো প্রহরীকে হ্যারি বলল রানিমাকে খবর দাও–আমরা বিদেশিরা এসেছি। প্রহরী চলে গেল। একটু পরেই ফিরে এসে বলল–আপনারা আসুন।
ফ্রান্সিসরা অন্দরমহলে ঢুকল। খুব দামি আসবাবে অন্দরমহল সজ্জিত নয়। তবে যা কিছু আছে সেসব খুব সাজানো গোছানো। সুন্দর রুচির পরিচায়ক। শয়ন কক্ষগুলো দাসীদের ঘর ছক্কাপাঞ্জা খেলার ঘর–সব দেখল ফ্রান্সিসরা। ফ্রান্সিস বিশেষ করে পাথরের পাটা দিয়ে তৈরি দেয়ালগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। তখনই দেখল রাজার শয়নকক্ষের দেয়ালের একটা জায়গায় পরপর তিনটে পেরেক পোঁতা। পেরেকগুলোর নিচে আবছা চৌকোনো দাগ। ফ্রান্সিস বুঝল এখানে কিছুটাঙানো ছিল। এখন নেই।
জায়গাটা ভালো করে দেখতে দেখতে ফ্রান্সিস বলল
–বিন্তানো–এখানে এই তিনটে জায়গায় নিশ্চয়ই কিছু ছিল। –
-ঠিকই ধরেছে। এখানে তিনটে ছবি টাঙানো ছিল। বিন্তানো বলল।
কী ছবি? ফ্রান্সিস প্রশ্ন করল।
–মন্ত্রীমশাইয়ের আঁকা তিনটে ছবি। বিন্তানো বলল।
কী আঁকা ছিল সেই ছবিগুলোয়? ফ্রান্সিস বলল।
–মন্ত্রীমশাই যেমন আঁকতেন। বন-জঙ্গল, পাহাড় ঝর্ণা–এসব। বিন্তানো বলল।
–সেই ছবিগুলো এখন কোথায়? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
-সব ছবি মালখানা ঘরে। আগের রাজা আনোতার সব ছবি বস্তাবন্দী করে মালখানা ঘরে রেখে দিয়েছে। বিন্তানো বলল।
–সেই মালখানা ঘর কোথায়? ফ্রান্সিস বলল।
–ডানদিকে। শেষ ঘরটা। বিন্তানো বলল।
–চলো। ঐ ঘরটা দেখবো। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে মশাল লাগবে। ঘুপচি ঘর। আমি প্রহরীদের কাছ থেকে মশাল জ্বালিয়ে আনছি। বিন্তানো বলল।
–তাই আনো। ফ্রান্সিস বলল। বিন্তানো মশাল আনতে চলে গেল। একটু পরেই। দুটো জ্বলন্ত মশাল নিয়ে এল। ফ্রান্সিসকে একটা মশাল দিল।
সবাই ডানদিকে চলল। বেশ কিছুটা যেতে দেখা গেল ডানদিকে একটা ঘর। বেশ বড় ঘর। পাথরের দরজা ভেজানো। ফ্রান্সিস ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলল। ভেতরে ঢুকল সবাই। বাইরে থেকে ঘরটা যতটা বড় মনে হয়েছিল ভেতরে ঢুকে দেখা গেল ঘরটা তার চেয়েও বড়। মশালের আলোয় দেখা গেল ভাঙা আসবাবপত্র ভাঙা তরোয়াল বর্শা মাকড়শার জাল। একটা নাক চাপা গন্ধ। একপাশে দেখা গেল কাপড়ের বস্তা রাখা। বিন্তানো বলল–এই বস্তাগুলোয় বোধহয় ছবিগুলো রাখা হয়েছে।
ফ্রান্সিস হাতেধরা মশালটা হ্যারির হাতে দিয়ে বলল–বস্তার কাছে মশালটা ধরো। ফ্রান্সিস বস্তাগুলোর কাছে এল। মশালের আলোয় দেখল বস্তুগুলোর মুখ বাঁধা নেই। ফ্রান্সিস টেনে টেনে ছবিগুলো বের করতে লাগল। গুণে দেখল ছটা ছবি আছে। ফ্রান্সিস বলল–বিন্তানো মন্ত্রীমশাইর সব ছবিই কি এখানে আছে?
হ্যাঁ। এই রাজবাড়িতে ছিল তিনটে ছবি। বাকি তিনটে ছিল মন্ত্রীমশাইর বাড়িতে। একটা ছবিই তিনি বেশিদিন ধরে আঁকতেন। তাই ছবির সংখ্যা বেশি নয়। বিন্তানো বলল।
এবার ফ্রান্সিস একটা ছবি বের করল। চামড়া মেশানো কাগজের ওপর ছবিগুলো আঁকা। চারপাশ কাঠের টুকরো দিয়ে বাঁধানো। ফ্রান্সিস ছবিটা ভালোভাবে দেখল। সত্যিই .. গাছ লতাপাতা ফুল আর পাহাড় আঁকা। ফ্রান্সিস সব ছবিগুলোই একে একে দেখল। একটা ছবিতে ঝর্ণা আঁকা আছে। দুটো ছবিতে বনের মাথায় পাখি উড়ছে এরকম আছে। ফ্রান্সিস ছবিগুলো আবার দেখল। নিসর্গ চিত্র। এর মধ্যে কোন সূত্র পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। মনের আনন্দে আঁকা এক শিল্পীর ছবি।
সবাই ছবিগুলো দেখল। ফ্রান্সিস মারিয়াকে বলল–মারিয়া তুমি তো ছবি বোঝ। তোমার কাছে কেমন লাগছে ছবিগুলো।
–বেশ উঁচু মানের ছবি। মন্ত্রীমশাই নিঃসন্দেহে একজন যথার্থ শিল্পী ছিলেন। ছবিগুলোতে খুব বেশি রঙ ব্যবহার করা হয়নি। শুধু সবুজ নীল আর লাল। পাহাড়ের মাথায় সূর্যাস্তর লাল সূর্য আর মেঘ আঁকা হয়েছে। অন্য কোন ছবিতে লাল রঙ ব্যবহার করা হয় নি। কিন্তু আমি বলছি এই রঙগুলো উনি পেলেন কোথায়?
