–তাহলে আজ রাতেই কাজে নামাবে? হ্যারি জানতে চাইল।
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। একটু গলা চড়িয়ে বলতে লাগল–ভাইসব–রাতে খাওয়া জুটবে না। এটা জেনে নিজেদের তৈরি রাখো। রাতে কেউ ঘুমিয়ে পড়বে না। মান্যবর রাজা আপনিও ঘুমুবেন না। বেশ রাত হলে আমরা এখানে রাজা আনোতারের সৈন্যদের সৈন্যবাস আক্রমণ করবো।
–কিন্তু ফ্রান্সিস আমরা তো নিরস্ত্র। বিনেলা বলল।
লুঠ করবো। তারপর অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করবো। তখন ওরা ঘুমে অচেতন থাকবে। আমরা লাথি দিয়ে বন্ধ দরজা ভেঙে ঢুকবো। ওদের তৈরি হতে সময় দেব না। ঠিক এভাবেই আমরা ওদের বন্দী করবো। আমরা সব ছকের কথা বললাম। এটাকে কাজে পরিণত করার দায়িত্ব তোমাদের। আমার কথা শেষ। এবার তোমরা বিশ্রাম কর। ফ্রান্সিস বসে পড়ল। তারপর হ্যারিকে ডেকে বলল, হ্যারি রাজা পাকোর্দোর দুজন দেহরক্ষীকে আমার কাছে নিয়ে এসো। হ্যারি চলে গেল। একটু পরেই দুজন দেহরক্ষীকে নিয়ে এল। ফ্রান্সিস ওদের জিজ্ঞেস করল–রাজা জানি না। তবে রাজবাড়ির সঙ্গেই অস্ত্রাগার এটা জানি। আর একজন বলল-বোধহয় দক্ষিণ দিকের ঘরটাই অস্ত্রঘর। ঘরটা দখল করা যাবে। প্রহরী কেমন থাকে?
–অস্ত্রাগার বলে কথা। দু’চারজন প্রহরী তো থাকবেই একজন বলল।
হুঁ তা থাকবে–ফ্রান্সিস বলল–ঠিক আছে। তোমরা তরোয়াল পাবে। লড়াইয়ের জন্যে তৈরি থেকো।
–বেশ। দেহরক্ষী দুজন চলে গেল।
রাতে তো পেট ভরে খাবার জুটবে না। দুপুরের যেটুকু খাবার বেঁচে ছিল তাই সবাই ভাগ করে খেল। তারপর শুয়ে পড়ল।
রাত একটু গম্ভীর হতে ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। একটু গলা চড়িয়ে বলল–সবাই তৈরি হও। চলো।
সবাই উঠে দাঁড়াল। লড়াই করতে যাচ্ছে এতেই ভাইকিংদের আনন্দ। শুয়ে বসে সময় কাটানো ওদের ধাঁতে সয় না।
বনের মধ্যে দিয়ে সবাই রাজবাড়ির দিকে চলল। বন শেষ হয়ে আসতে ছাড়া ছাড়া ছাড়া গাছের বন শুরু হল।
এখানে ওখানে ডালপালার ফাঁক দিয়ে ভাঙা চাঁদের আলো পড়েছে। আস্তে আস্তে সবাই বনের ধারে চলে এল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল-থামো। সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল।
ফ্রান্সিস বন থেকে বেরিয়ে এল। চাঁদের আলোয় দেখল রাজবাড়ির দক্ষিণ দিকে একটা ঘরের সামনে কালো হলুদ পোশাক পরা দুজন প্রহরী প্রহরারত। ফ্রান্সিস ভাবল– যাক দু’জন প্রহরী। পরাভব জানানো সহজ হবে। ও ফিরে এসে শাঙ্কো আর বিনেলোকে বলল–শাঙ্কো–ছোরা ছুঁড়ব। বিনেলো অন্য কাকে কবজা করবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ সারতে হবে। কোনরকম শব্দ যেন না হয়।
তিনজনে বন থেকে বেরিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে প্রহরীদের কাছাকাছি চলে এল। শাঙ্কো হঠাৎ দাঁড়িয়ে জামার তলা থেকে ছোরা বের করে ছুঁড়ে মারল। ছোরাটা একজন প্রহরীর ডান কাঁধে বিধে গেল। সে তরোয়াল ফেলে দিয়ে কাধ চেপে বসে পড়ল। ফ্রান্সিস এক লাফ এগিয়ে গিয়ে তরোয়ালটা তুলে নিল। অন্য প্রহরীটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। বিনেলো ততক্ষণে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সে এই অতর্কিত আক্রমণে টাল সামলাতে পারল না। মাটিতে পড়ে গেল। ফ্রান্সিস তরোয়াল হাতে ওর সামনে এসে দাঁড়াল। চাপাস্বরে বলল তরোয়াল ফেলে দাও। কোন শব্দ করবে না। প্রহরীটি বোকার মত তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস তাড়া দিল জদি। প্রহরীটি উঠে বসে তরোয়ালটা ফেলে দিল। বিনেলা সঙ্গে সঙ্গে তরোয়ালটা তুলে নিল। ফ্রান্সিস তরোয়াল উঁচিয়ে বলল তোমরা শব্দ করলেই মরবে। আমরা অস্ত্রাগার লুঠ করবো। কেউ বাধা দিতে এলে মরবে। তারপর শাঙ্কোকে বলল–শাঙ্কো বন্ধুদের ডাকো। বলবে সবাই যেন নিঃশব্দে আসে। রাজাকে অপেক্ষা করতে বলবে। উনি যেন না আসেন।
শাঙ্কো বনের দিকে চলে গেল। একটু পরেই বন্ধুরা আর রাজার দেহরক্ষীরা যতটা দ্রুত সম্ভব ছুটে এল। আহত প্রহরীটির কোমরেঅস্ত্রাগারের দরজার তালার চাবি ঝুলছিল। ও কাঁধ থেকে ছোরাটা খুলে মাটিতে ফেলে দিল। শাঙ্কো দ্রুত ছোরাটা তুলে নিল। তারপর এক হ্যাঁচকা টানে ওর কোমর থেকে চাবিটা নিয়ে নিল। তারপর অস্ত্রাগারের তালা খুলতে গেল। ফ্রান্সিস আর বিনেলো খোলা তরোয়াল হাতে প্রহরী দু’জনের সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
শাঙ্কো তালা খুলে ফেলল। বন্ধুরা দ্রুত ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। স্তূপ করে রাখা তরোয়াল বর্শার থেকে তরোয়াল-বর্শা তুলে নিল। তারপর বাইরে চলে এল।
ফ্রান্সিস প্রহরী দুজনকে বলল–অস্ত্রঘরে ঢোকো। প্রহরী দুজনকে অস্ত্রঘরে ঢোকানো হল। শাঙ্কো তালা লাগিয়ে দিল।
এবার ফ্রান্সিস বলল–সৈন্যবাসে চলো। লাথি মেরে দরজা ভেঙে ঢোকো। সৈন্যদের হাতে অস্ত্র নেই। সবকটাকে বুন্দী কর। কেউ যেন পালাতে না পারে।
সবাই দ্রুত সৈন্যবাসের দিকে ছুটল। বারান্দা পার হয়ে ঘরগুলোর দরজায় লাথি মারতে লাগল। দরজা ভেঙে যেতে লাগল। ঘুমন্ত সৈন্যরা উঠে দেখল উদ্যত তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে আছে। আস্তে আস্তে সব সৈন্যকে সামনের মাঠে নিয়ে আসা হল। মাঠে বসিয়ে দেওয়া হল।
শাঙ্কো ততক্ষণে সৈন্যবাস থেকে লম্বা দড়ি নিয়ে এল। ছোরা দিয়ে দড়ি টুকরো টুকরো কাটল। সৈন্যদের হাত পিছমোড়া করে বেঁধে দেওয়া হল।
তখন ভোর হয়ে গেছে। সকালের রোদ পড়েছে বনভূমিতে, রাজবাড়িতে মাঠে।
রাজা পাকোর্দো ফ্রান্সিসের কাছে এলেন। বললেন–এদের বন্দী করলে। কিন্তু আমাদের বিপদ এখনও কাটে নি।
