তিনজনে পোশাকগুলো নিয়ে বনের আড়ালে চলে গেল। তিনজনেই নিজেদের পোশাকের ওপর কালো পোশাক পরে নিল।
ওরা বনের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল। চলল রাজবাড়ির দিকে।
রাজবাড়ির সদর দেউড়ির কাছে এসে দেখল মাত্র একজন পাহারাদার বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে। রাজা আনোতার এখানে নেই। কাজেই পাহারার কড়াকড়ি নেই। ফ্রান্সিসরা প্রহরীর সামনে দিয়েই রাজ বাড়ির আর এক পাশে চলে এল। ফ্রান্সিস দূরত্বটা হিসেব করে দেখল রাজবাড়ি থেকে বনভূমির দূরত্ব খুবই কম। এই দূরত্ব দ্রুত ছুটে পার হতে বেশি সময় লাগবেনা।
একপাক রাজবাড়িটা ঘুরে এল। কিন্তু রসুই ঘরটা কোথায় বুঝে উঠতে পারল না। এবার বড় দেউড়ির সামনে এল। দেউড়ি দিয়ে রাজবাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। প্রহরীটি ওদের একবার দেখল শুধু। কিছু বলল না।
রাজবাড়িতে ঢুকেই ডানদিকে মন্ত্রণাকক্ষ। বাঁহাতি একটা গলিমত। ফ্রান্সিস বুঝল সোজা গেলে রাজসভা ঘর পড়বে। ও বাঁ দিকের গলিপথটা দিয়ে ঢুকে চলল। কিছুদূর গিয়ে গলিপথটা ডানদিকে চলে গেছে। সেই গলিপথে ঢুকতেই নাকে ঘিসলার গন্ধ লাগল।
ফ্রান্সিস হেসে মৃদুস্বরে বলল–রান্নাঘর সামনেই।
ডানহাতি একটা দরজা তিনজনই রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল। বিরাট উনুন জ্বলছে। তিনজন রাঁধুনি রান্না করছে। একজন রাঁধুনি ওদের দেখে বলল–যাও। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিবেশনকারী খাবার নিয়ে যাবে।
–আমাদের খুব তাড়া। রাজার হুকুম এক্ষুণি পেয়েই আমাদের পাহাড়ের ওপারের বাতারিয়ায় যেতে হবে।
–তাহলে পেছনের রসুইঘরে বসে খেয়ে নাও। আমরাই খেতে দেব। রাঁধুনি বলল।
–তাহলে তো ভালোই হয় ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা পাশের রসুইঘরে ঢুকল। দেখল দুটো বিরাট থালাভর্তি রুটির স্তূপ। একটা বড় কাঠের ডেকচিও রয়েছে। একজন রাঁধুনি এল। দেয়ালে আটকানো একটা লম্বা কাঠের পাটাতনে রান্না করা খাবার রাখা। রাঁধুনি একটা হাতা নিয়ে এসেছিল। পাটাতনের একপাশে রাখা লম্বা শুকনো পাতা নিয়ে পেতে দিল। রাঁধুনি দ্রুতহাতে চারটে করে রুটি পাতার ওপর রাখল। ফ্রান্সিস চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে পেছন দিকে একটা হুড়কো লাগানো দরজা দেখল। বলল–একটু হাত ধোবো যে। রাঁধুনি জলের বিরাট জালাটা দেখিয়ে বলল–গ্লাসে করে জল নিয়ে এসো। ফ্রান্সিসরা কাঠের গ্লাসে জল নিয়ে এল। রাঁধুনি ততক্ষণে পেছনের দরজাটার হুড়কো খুলে দিয়েছে। বলল–এই দরজার বাইরে গিয়ে হাত ধুয়ে এসো। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে দরজার বাইরে গেল। চারদিকে তাকিয়ে দেখল–হাত কুড়ি দূরে বন শুরু হয়েছে। হাতমুখ ধুতে ধুতে ও মৃদুস্বরে বলল–এই দরজা দিয়েই আমরা পালাবো। হাত বাড়ানো দূরত্বে বনের আড়াল পাবো।
– রসুই ঘরে ফিরে এসে খেতে বসল। রাঁধুনি ততক্ষণে মাংসের ঝোলও পাতায় ঢেলে দিয়ে গেছে। ফ্রান্সিসরা গোগ্রাসে খেতে লাগল।
রাঁধুনি চলে গিয়েছিল। ফিরে এল। ফ্রান্সিস বলল–আর একদফা রুটি মাংস দাও। আমাদের ওতেই হবে। তোমাকে আর আসতে হবে না। রাঁধুনি আর একদফা খাবার দিয়ে চলে গেল। তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে ফ্রান্সিস চাপা স্বরে বলল–আর দেরি নয়। দু’জনে, দুটো রুটির থালা নাও। আমি মাংসের ডেকচিটা নিচ্ছি।
তিনজনে দ্রুত সব খাবার নিয়ে পেছনের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস উঁকি দিয়ে দেখল রাজবাড়ির সামনের মাঠ ফাঁকা মাঠে কোন সৈন্য নেই। চাপাস্বরে বলল ছোটো-জঙ্গলের দিকে। তিনজন ছুটে গিয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়ল।
তিনজনেই হাঁপাচ্ছে তখন। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলল তিনজন। একটু এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে সেইবিরাট গাছটা দেখতে পেল। গাছের নিচে এল। খাবার নিয়ে তিনজনকে আসতে দেখে বন্ধুরা মৃদুস্বরে আনন্দধ্বনি তুলল–ও–হো–হো।
সবাই ক্ষুধার্ত খাবারের ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। রাজা পাকোর্দোও গেলেন। হেসে ফ্রান্সিস বললেন–তোমরা যে অক্ষত দেহেফিরে আসতে পেরেছো এতেই আমি খুশি।
খাওয়া-দাওয়া শেষ। সন্ধ্যা হয়ে এল।
ফ্রান্সিস ঘাসের ওপর শুয়ে ছিল। হ্যারি ওর কাছে এল। বলল ফ্রান্সিস কী করবে এখন? এখানে আত্মগোপন করে কতদিন থাকবে? প্রত্যেকদিন দু’বেলা খাবার জোগাড় করতে পারবেনা।
উঁহু। এভাবে থাকা চলবে না। আশ্রয় চাই, খাদ্য চাই। ভুলে গেলে চলবে না। মারিয়া বন্দিনীজীবন কাটাচ্ছে। তাকেও মুক্ত করতে হবে।
–সেই জন্যেই বলছিলাম যা করার তাড়াতাড়ি কর। হ্যারি বলল।
–শোন–রাজা আনোতারের এই রাজত্বে এখন বেশ কিছু সৈন্য আছে। রাজা পাকোর্দোর রাজত্ব থেকে ওরা এখানে ফিরে এসেছে। লড়াই করে এই সৈন্যদের হারিয়ে এই ভিঙ্গার রাজত্ব দখল করতে হবে।
–কিন্তু আমাদের তো একটা তরোয়ালও নেই। হ্যারি বলল।
যারা ফিরে এসেছে তারা তো তরোয়াল নিয়েই ফিরেছে। তরোয়ালি বর্শায় এখানকার অস্ত্রাগারে জমা রেখেছে। ফ্রান্সিস বলল।
-হ্যাঁ। তা রেখেছে। হ্যারি বলল।
–আমরা সেইঅস্ত্রাগার লুঠকরবো। অস্ত্র নিয়ে ওদের আক্রমণ করবো। ফ্রান্সিস বলল।
–অস্ত্রাগার লুঠ করতে পারবো? হ্যারি সংশয় প্রকাশ করলে।
–পারতেই হবে। আমার ছক ভাবা হয়ে গেছে। আজ রাতেই কাজে নামবো। নিরস্ত্র অবস্থায় এভাবে আত্মগোপন করে উপবাস করে পড়ে থাকা চলবে না। এই বনভূমি তো বিরাট এলাকা নিয়ে নয়। আজ হোক কাল হোক ওরা আমাদের ঠিক এই বনে খুঁজে বের করতে পারবে। তখন নিরস্ত্র অসহায় আমরা কেউ ওদের হাত থেকে বাঁচবো না। কাজেই আমাদেরই অস্ত্র জোগাড় করে আগে আক্রমণ করতে হবে ফ্রান্সিস বলল।
