এবার পাহাড় থেকে নামা শুরু হল। যতটা সম্ভব দ্রুত সবাই নামতে লাগল। রাজা পাকোর্দো বয়স্ক মানুষ। আহত তিনি বেশহাঁপাতে লাগলেন। ফ্রান্সিস তাকে মাঝে মাঝেই ধরছিল। সাহায্য করছিল তাকে নামতে।
পাহাড় থেকে নামল সবাই। কম বেশি সবাই হাঁপাচ্ছে তখন।
নিচে গভীর বনভূমি ফ্রান্সিস সবাইকে ডানদিকে গভীর বনের দিকে নিয়ে গেল। একটা বিরাট উঁচু গাছের নিচে সবাইকে দাঁড় করাল। বলল–এখানেই আশ্রয় নেব আমরা। এটাই হবে আমাদের গোপন আস্তানা। একটু ফাঁকা জায়গাটা। একটু ঘাসে ঢাকা জমি। কেউ কেউ ঘাসের ওপর বসে হাঁপাতে লাগল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল। রাজা পাকোর্দো ঘাসের ওপর শুয়ে পড়লেন। খুব পরিশ্রান্ত। ফ্রান্সিস বলল–সবাইবিশ্রাম নাও। কেউ কোন শব্দ করো না। রাজা আনোতারের সৈন্যরা আমাদের খুঁজবে। তবে খুঁজে পাবে না। তখন নিশ্চিন্ত হয়ে যা করবার করবো।
সবাই চুপ করে শুয়ে বসে। চারদিক নিস্তব্ধ শুধু গাছের ডালে পাতায় বাতাসের শো শোঁ শব্দ।
হঠাৎ কিছু দূরে রাজা আনোতারের সৈন্যদের হাঁক ডাক শোনা গেল। তারপরই চারদিকে স্তব্ধতা।
বেশ কিছুক্ষণ পরে সৈন্যদের হাঁকডাকআরো দূরে শোনা গেল। বোঝা গেল হতাশ সৈন্যরা ফিরে যাচ্ছে।
ভোর হল। ফ্রান্সিসরা শুয়ে বসে আছো। তখনও বনতলের অন্ধকার কাটেনি।
কিছুক্ষণ পরে আবছা আলো ছড়াল বনতলে।
তখন কম বেশি সবাই ক্ষুধার্ত। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস খাবারের ব্যবস্থা তো করতে হয়।
–হ্যাঁ। কিন্তু এখন নয়। দুপুরের খাবার জোগাড় করে যেতে হবে। এখন এই বনেই ফলমূল খুঁজতে হবে। সবাইকে বলে সেটা। হ্যারি উঠে দাঁড়াল। চাপা গলায় বলল ভাইসব কাছাকাছি ফলমূল খুঁজে পাও কিনা দেখো। তবে বেশিদূর যাবেনা। গাছের ডাল ঝোঁপের গাছ ভেঙে ভেঙে যাবে, যাতে এখানে পথ চিনে ফিরে আসতে পারো। ভাইকিং বন্ধুরা উঠে দাঁড়াল। বনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা ফলমূল নিয়ে ফিরে এল। সবাইকে ফলমূল ভাগ করে দেওয়া হল। ফলমূল খেয়েই খিদে মেটাতে হল।
–ফ্রান্সিস দুপুরের খাবারের কী হবে? শাঙ্কো বলল।
-বনের ওপারেই তো রাজা আনোতারের ছেড়ে আসা রাজত্ব ভিঙ্গার। ওখানকার রাজবাড়িতে ঢু দিতে হবে। বেশির ভাগ সৈন্যই এখন রাজা পাকার্তোর রাজত্বে। এখানে রাজবাড়িতে প্রহরীর সংখ্যাও বেশি থাকবে না। বিনা রক্তপাতে রাজবাড়ি থেকে খাবার চুরি করে আনতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–পারবে? প্রহরীদের নজর এড়িয়ে? শাঙ্কো বলল।
-পারতে হবে। বুদ্ধিকরে। খাবার জোগাড় করতেই হবে যে ভাবে হোক। না খেলে দুর্বল হয়ে পড়বো। ফ্রান্সিস বলল।
দেখ চেষ্টা করে। হ্যারি বলল।
দুপুর হল। ফ্রান্সিস ঘাসের ওপর শুয়ে খাবার চুরির উপায় ভাবছিল। এবার উঠে দাঁড়াল। ডাকল শাঙ্কো বিনেলো এসো। শাঙ্কো বিনোলা উঠে এল।
–চলো রাজবাড়ি থেকে খাবার চুরি করতে হবে। এছাড়া খাবার জোগাড় করার অন্য কোন উপায় নেই। ফ্রান্সিস বলল।
বেশ চলো। শাঙ্কো বলল।
শাঙ্কো বিনোলোক নিয়ে ফ্রান্সিস চলল। গাছগাছালির নিচে দিয়ে ঝোঁপঝাড় ঠেলে ভেঙে বনের মধ্যে দিয়ে তিনজনে চলল।
একসময় বনভূমি শেষ হল। বনের গাছের আড়াল থেকে দেখল বনভূমির খুব কাছেই বড়বাড়িটা। বোঝা গেল ওটা রাজাবাড়ি। রাজবাড়ি ছাড়িয়ে পাথরের বাড়িঘরদোর। রাজা আনোতারের প্রজাদের বসতি এলাকা। সামনে একটা ঘাসে ঢাকা মাঠমত। তারপরেই সৈন্যাবাস। লম্বাটানা বাড়ি। এদিকটা সৈন্যবাসের পেছন দিক। পেছনের জানালাগুলো খোলা। সব দেখে ফ্রান্সিস বলল–একটা লম্বা গাছের ডাল ভেঙে আনো। বিনেলো বাঁ পাশে তাকাতেই একটা লম্বা গাছ পেল। ছোট ছোট ডালওয়ালা। ও ছুটে গিয়ে গাছটা টানতে লাগল। কিন্তু গাছটা টেনে তুলতে পারল না। আস্তে ডাকল শাঙ্কো। শাঙ্কো ওকে সাহায্য করতে এগিয়ে এল। দুজনে মিলে কয়েকটা হ্যাঁচকা টান দিতেই গাছটা উঠে এল। গাছটা ফ্রান্সিসের কাছে নিয়ে এল। ফ্রান্সিস গাছের শেকড় থেকে মাটি ঝেড়ে ফেলল। মাথার কাছে ছোট ডালটা ভাঙল। একটা আঁকশির মত হল। শাঙ্কো বলল
–এই আঁকশি দিয়ে কি করবে?
সৈন্যবাসের জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরটা দেখ। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখছি তো ফ্রান্সিস বলল।
–দেয়ালে আনোতারের সৈন্যদের পোশাক ঝুলছে। ফ্রান্সিস বলল।
–হা হা। কালোরঙের পোশাক বুকে হলুদ রঙ।
–আঁকশে দিয়ে তিনটে পোশাক টেনে আনবো। সেসব পোশাক পরে রাজবাড়ির রসুইঘরে থাকো। তারপর–হ্যাঁ শাঙ্কো সোৎসাহে বলে উঠল-সাবাস ফ্রান্সিস।
–খুব সহজে কাঠের ডেকচিতে বড় থালায় খাবার নিয়ে চম্পট। ফ্রান্সিস বলল।
এখন কী করবে? শাঙ্কো জানতে চাইল।
লক্ষ্য কর–সৈন্যাবাসের জানালার কাছে পৌঁছতে হলে একটা ছোট মাঠমত পার হতে হবে। এই মাঠটা আমাকে হামাগুড়ি দিয়ে পার হতে হবে। নইলে জানালা দিয়েই সৈন্যরা আমাদের দেখতে পাবে।
ফ্রান্সিস মাঠের লম্বা লম্বা ঘাসের ওপর হামা দিয়ে বসল। তারপর দ্রুত হামাগুড়ি দিয়ে একটা জানালার দিকে লক্ষ্য রেখে চলল ঐ জানালা দিয়েই দেয়ালে ঝোলানো পোশাক দেখা যাচ্ছিল।
অল্পক্ষণের মধ্যেইফ্রান্সিস জানালাটার কাছে পৌঁছল। কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ঘরটায় কারো সাড়াশব্দ নেই। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। তারপর জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে আঁকশিটা ঢুকিয়ে দিল। সন্তর্পণে একটা ঝোলানো পোশক টান দিয়ে নামল। সাবধানে পোশাকটা টেনে বাইরে নিয়ে এল। একইভাবে তিনটে পোশাক সাবধানে নিয়ে এল। পোশাক ফকে নিচে মেঝেয় পড়ে গেলে শব্দ হবে তাই খুব সাবধানে পোশাক তিনটে নিয়ে এল। তারপর পোশাকগুলো পিঠে রেখে হামাগুড়ি দিয়ে চলে এল মাঠেরঘাসগুলো লম্বা ও হওয়ায় ফ্রান্সিসেরশরীরেরঅনেকটাই ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। এতে ফ্রান্সিসেরসুবিধেই হল।
