–হাতে কী? ফ্রান্সিস প্রশ্ন করল।
বর্শা। শাঙ্কো বলল।
–এতে তোমাদের সুবিধেই হবে। দু’জনকে কবজা করা সহজ। কিছুক্ষণ বিশ্রাম কর। রাত বাড়লে কাজে লাগা। ফ্রান্সিস বলল। শাঙ্কো বিনেলোর কাছে গেল। কী করতে হবে ফিস্ ফিস্ করে বলল। দু’জন শুয়ে পড়ল। বিশ্রাম চাই।
রাত বাড়ল। শাঙ্কো উঠে পড়ল। বিনেলোও সজাগ ছিল। উঠে দাঁড়াল। শাঙ্কো দরজার কাছে গেল। লোহার গরাদের ফাঁকদিয়ে দেখল–একজন প্রহরী একটা কাঠের পাটাতনের ওপর বসে আছে। বোঝাই যাচ্ছে ঝিমোচ্ছে। অন্যজন দাঁড়িয়ে আছে।
শাঙ্কো সরে এলো। জানালার মত ফোকরটার একেবারে নিচেদাঁড়াল। তারপর পাথরের অল্প খাজে পা রাখল। তারপর উঁচু দিকে ছোট হাতলটায় একটা পা রেখেই এক ঝটকায় ফোকরটা ধরে ফেলল। নিচের দিকে তাকিয়ে ফিফিরে বলল-বিনেলো–এইভাবে ওপরে উঠে আসবে। এবার শাঙ্কো শরীরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে জানালামত ফোকরটায় উঠে বসল। হাতের কাছেই ঘরের ছাউনি। ও ছাউনি ঠেলল। বেশ ভারি। বোঝা গেল ওখানে পাথরের চাপা দেওয়া। তিনচারবার জোরে ঠেলে ঠেলে পাথর চাপা সরাল। মাথা ঢুকিয়ে দিল ঘাসপাতার ছাউনি দিয়ে। ছাউনি থেকে ওর মাথা বেরিয়ে এল। গাছের কাটা ডালের বুনানীতে হাত রাখল। পরে ওটা ধরে ছাউনির ওপর উঠে এল।
ওদিকে বিনোলো শাঙ্কোর দেখাদেখি নিজেও ছাউনির ওপর উঠে এল। সাবধানে কোন শব্দ না করে দু’জনে ছাউনির ওপরে উঠে এল। শাঙ্কো ফিফিস্ করে বলল দাঁড়ানাটাকে আমি ধরব। বসে ঝিমোচ্ছে ওটাকে তুমি ধরবে। নিজের কোমরের ফেট্টি খুলতে খুলতে বলল–কোমরের ফেট্টি খুলে ওটা দিয়ে মুখ চেপে দরজার গরাদের সঙ্গে বেঁধে ফেলবে। মুখে যেন কোনরকম শব্দ না করতে পারে।
ফেট্টি খুলে হাতে নিয়ে দু’জনে নিচে তাকাল। ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় সবই দেখা যাচ্ছিল। শাঙ্কো চাপাস্বরে বলল ঝপাও। দুজনেই দু’জন প্রহরীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দু’জন প্রহরীর হাত থেকেই বর্শা ছিটকে গেল। দুজনেই মাটিতে পড়ে গেল। শাঙ্কো এক প্রহরীর মুখে ফেট্টির কাপড় চেপে ধরল। দেখাদেখি বিনোলাও তাই করল। ওরা চেঁচিয়ে উঠতে পারল না। শাঙ্কো ঐ প্রহরীকে ধরে এক হ্যাঁচকা টানে ঘরের দরজার কাছে নিয়ে এল। তার মুখ চেপে ফেট্টির কাপড়টা দরজার লোহার গরাদের সঙ্গে বেঁধে ফেলল। প্রহরীটির গলা দিয়ে কোন শব্দ বেরুলোনা। শাঙ্কোর দেখাদেখি বিনোলাও অন্য প্রহরীটিকে একইভাবে এ বাঁধল। প্রহরীটির মুখ থেকে গোঙানির শব্দ বেরুতে লাগল। শাঙ্কো তার গালে বিরাশি # সিক্কা ওজনের এক চড় কষাল। গোঙানি বন্ধ হল।
শাঙ্কো দ্রুত প্রহরীটির কোমরে ঝোলানো চাবির গোছাটা খুলে নিল। চাপাস্বরে বলল– চাবিটা দেখাও। প্রহরীটি চাবিটি দেখিয়ে দিল। মুখে উ-উ শব্দ করল। শাঙ্কো চাপাস্বরে ধমক দিল–চোপ। শব্দ বন্ধ হলেও বুঝল শব্দ বন্ধনা করলে আবার চড় খেতে হবে।
শাঙ্কো ছুটে গিয়ে দরজার তালা খুলে ফেলল। চাপা স্বরে বলল–বেরিয়ে এসো সবাই। বন্ধুরা ছুটে এসে খোলা দরজার বাইরে চলে এল। রাজা পাকোর্দো শুয়ে ছিল। ফ্রান্সিস তার কাছে গিয়ে ফিসফিস্ করে বলল–উঠে আসুন। দরজা খোলা। রাজা উঠে বসলেন। তখনও ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না। ততক্ষণে সবাই বাইরে চলে এসেছে। এখন রাজা আর ফ্রান্সিস বেরিয়ে এলেই হয়।
ফ্রান্সিস রাজাকে হাত ধরে বাইরে নিয়ে এল।
সময় নেই। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। ফ্রান্সিস চাপা স্বরে বলে উঠল– পাহাড়ের দিকে সবাই ছোটো–জলদি।
উজ্জ্বল চাঁদের আলোয় চারদিকে দেখা যাচ্ছে। সবাই ছুটল। রাজা পাকোর্দোও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছুটলেন।
অল্পক্ষণের মধ্যেই সবাই বনভূমির কাছে চলে এল। বনভূমিতে ঢুকে পড়ল। পাহাড়ের ওপারেই রাজা আনোতারের ভিঙ্গার রাজত্ব। এখন রাজা আনোতার তো এখানকার রাজত্ব দখল করে এখানেই সৈন্যদের নিয়ে আছে। এখন তার রাজত্বে বোধহয় অল্প যোদ্ধাই আছে। কাজেই বিপদের সম্ভাবনা কম। ফ্রান্সিস বনের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে এসব ভাবছিল। আরো ভাবছিল ওরা পালিয়েছে এটা রাজা আনোতার কিছুক্ষণের মধ্যে জানতে পারবে। ওরা এই বনের দিকেই পালিয়েছে। তাও জানতে পারবে। নিশ্চয়ই ফ্রান্সিসদের খুঁজে বের করতে বনের মধ্যে তার যোদ্ধাদের পাঠাবে। ফ্রান্সিসদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ওরা নিরস্ত্র। ঐ যোদ্ধাদের মুখোমুখি হওয়া চলবে না। নিরস্ত্র অবস্থায় সবাইকে মরতে হবে। একমাত্র উপায়–আত্মগোপন করে থাকা। কিন্তু ও জানেনা পাহাড়ের ওপারে। বনাঞ্চল আছে কিনা।
বনের মধ্যে দিয়ে ছুটতে ছুটতে সবাই হাঁপাচ্ছে তখন। কেউ বেশি হাঁপাচ্ছে কেউ কম। ছুটতে ছুটতে ফ্রান্সিস বিন্তানোকে জিজ্ঞেস করল–পাহাড়ের ওপারে তো রাজা আনোতারের রাজত্ব।
-হ্যাঁ। বিন্তানো ছুটতে ছুটতে বলল।
–ওপারে পাহাড়ের নিচে বনাঞ্চল আছে? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। বিন্তানো বলল।
–পাহাড় পার হয়ে ওখানেই আমরা গা ঢাকা দেব। ফ্রান্সিস বলল।
পাহাড়ের নিচে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–পাহাড় পেরিয়ে ওপারে যাবো। ছোটো সবাই।
পাহাড়ের চড়াইয়ে উঠতে লাগল সবাই। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–যতটা সম্ভব গাছগাছালি ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে থেকে ওঠো সবাই।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পাহাড়ের ওপর উঠল সবাই। ফ্রান্সিস পেছন ফিরে তাকাল। দেখল দূরে হাতে জ্বলন্ত মশাল নিয়ে রাজা আনোতারের সৈন্যরা এই পাহাড়ের দিকেই আসছে।
