মন্ত্রীর বাড়িতেও তার আঁকা কয়েকটা ছবি ছিল। সেগুলোকেও রাজা আনোতার আনাল। দেখল ছবিগুলি সেই পাহাড় ঝর্ণা নীল আকাশে আকাশে সাদা মেঘ ভেসে চলেছে পাখি উড়ছে। ক্রুব্ধ রাজা সেই ছবিগুলোও মালখানাঘরে পাঠিয়ে দিল।
মন্ত্রীমশাইয়ের ছবি আঁকার ব্যাখ্যাটা ফ্রান্সিসকে খুব কৌতূহলী করল। রাজকার্যে সাহায্যের ফাঁকে ফাঁকে একজন ব্যস্ত মন্ত্রী ছবি আঁকে এ তো অদ্ভুত ব্যাপার। এই সম্পর্কে ভালোভাবে জানার জন্য সেদিন রাতে খাওয়াদাওয়ার পর শাঙ্কোকে বলল–বিন্তানোকে আমার কাছে আসতে বললো।
–কেন বলো তো? হ্যারি জানতে চাইল।
দরকার আছে। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো গলা চড়িয়ে ডাকল। বিন্তানো একবার এখানে এসতো। বিন্তানো ওদের কাছে এল। ফ্রান্সিস বলল বিন্তানো–একটা ব্যাপারে তোমার কাছে কিছু জানতে চাইছি।
–বেশ বলো। বিন্তানো বলল।
বংশানুক্রমে রাজা পাকোর্দো যে ধনসম্পদ পেয়েছিল যে সম্পর্কে তুমি কিছু জানো। ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–কী যে বলো। সেই ধনসম্পদ সম্বন্ধেরাজা পোতার্দোর নিজেরই কোন আগ্রহ ছিল না আর আমি কী জানবো। বিন্তানো বলল।
–আমার কেমন মনে হচ্ছে মন্ত্রীমশাই যেভাবেই হোক কোন সূত্র নিশ্চই রেখে গেছেন। ফ্রান্সিস বলল।
–হয়তো। তবে তার হদিশ করবোকে? সেই ধনসম্পদের উত্তরাধিকারী সেই রাজা আনোতারেরই তো কোন হুঁশ নেই। তুমি আমি ভেবে কী করবোর বিন্তানো বলল।
–আচ্ছা মন্ত্রীমশাই কীসের ছবি আঁকতেন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
সাদা চামড়ার ওপর বিন্তানো বলল।
–রং দেবেন কোথায়? ফ্রান্সিস বলল।
–গাছের ফল, ছাল, গাছের শেকড়টেকগুঁড়ো করে। বেশ কিছু রং আমিই তৈরি করে দিয়েছিলাম। আসলেমন্ত্রীমশাইকেআমি খুব শ্রদ্ধাকরতাম। উনি আমাকেও খুব ভালোবাসতেন। ছবি আঁকারসময় বেশকয়েকবারতঁরসঙ্গী হয়েছিআমি। পাখি, প্রাণি বা মানুষ এসব আঁকতেন না। শুধু চোখ মেলে দেখা প্রকৃতি-পাহাড় সরোবর বনজঙ্গল আকাশ।
-হ্যাঁ শিল্পীর মেজাজ বোঝা দায়। আচ্ছা আঁকা ছবি গুলো তিনি কী করতেন? ফ্রান্সিস প্রশ্ন করল।
রাজা পাকোর্দোকে তিনটি ছবি দিয়েছিলেন। রাজা যত্ন করে তার শয়নকক্ষে টাঙিয়ে রেখেছেন। কয়েকটা ছবি তার বাড়িতে টাঙিয়ে ছিলেন। খুব বেশি ছবি আঁকেন নি। একটা ছবিই অনেকদিন ধরে আঁকতেন। বিন্তানো বলল।
–মন্ত্রীমশাইয়ের আঁকা ছবিগুলো দেখতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–বোধ হয় দেখতে পাবেন না। বিন্তানো বলল।
–কেন? ফ্রান্সিস বলল।
–রাজা আনোতার সব ছবি মালখানা ঘরে বস্তাবন্দী করে রেখে দিয়েছে। বিন্তানো বলল।
–তার উপযুক্ত কাজই করেছে। ছবির কদর বোঝার মত মানুষ সে নয়। কথায় কথায় চাবুক চালায় এ কেমন রাজা? ফ্রান্সিস বলল।
–তা তো বটেই। বিন্তানো বলল।
যাক গে–রাত হল। শুয়ে পড়ো। ফ্রান্সিস বলল।
বিন্তানো চলে গেল।
শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস তুমি মন্ত্রীমশাই তাঁর আঁকা ছবি এসব নিয়ে ভাবছো কেন?
–মনটা কখনও শূন্য রাখতে নেই। কিছু না কিছু নিয়ে ভাবতে হয়। হ্যারি পাশেই শুয়ে ছিল। হেসে বলল–ফ্রান্সিস গুপ্তধনের সংবাদ পেয়েছ। ওর এত আগ্রহের কারণ ওটাই এখন ঐ নিয়ে ভাববে।
না না হ্যারি। আমি এখন পালানোর উপায় ভাবছি। মন্ত্রীমশাইছবি গুপ্ত ধনভাণ্ডার এসব পরে ভাববো। ফ্রান্সিস বলল।
–একটা কাজ তো করতে পারো ফ্রান্সিস শাঙ্কো বলল–রাজা আনোতারকে বলো তুমি গুপ্তধন খুঁজে উদ্ধার করে দেবে এবং একটা স্বর্ণমুদ্রাও নেবেনা। তুমি বললেই রাজা আনোতার রাজি হবে। আমরাও মুক্তি পাবো।
-অসম্ভব। রাজা আনোতার অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ। একজন মানুষ গুপ্তধন উদ্ধার করে দেবে কিন্তু বদলে কিছুই নেবে না–এমন মানুষও আছে রাজা আনোতার সেটা বিশ্বাসই করবে না।
তুমি বিশ্বাস করাতেই পারবেনা। ভাববে অন্য বদমতলব আছে। ফ্রান্সিস বলল।
তুমি ঠিকই অনুমান করেছে। হ্যারি বলল।
নাও শুয়ে পড়ো সব। রাত জাগা চলবে না। ফ্রান্সিস কথাটা বলে শুয়ে পড়ল।
–বলছো বটে কিন্তু তুমি অনেক রাত অব্দি জেগে জেগে থাকো। হ্যারি বলল।
–তুমি টের পাও? ফ্রান্সিস হেসে বলল।
–তুমি আমার বাল্যবন্ধু। তোমাকে আমি ভালো করেই চিনি। মাথায় চিন্তা নিয়ে তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারো না। হ্যারি বলল।
–তা যা বলেছে। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
ফ্রান্সিসদের বন্দীজীবন কাটতে লাগল। ফ্রান্সিস মাঝে মাঝেই কয়েদঘরটা ঘুরে দেখে যদি কোনভাবে পালানো যায়। কিন্তু পাথর চাপিয়ে চাপিয়ে তৈরি ঘর বেশ মজবুজ। পাথরের দেয়াল ভাঙার বা সরাবার কোন উপায় নেই। ওপরের ছাউনিও পাথর চাপা দিয়ে মজবুত করা।
সেদিন রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর শাঙ্কো ফ্রান্সিসদের কাছে এল। ফিসফিস্ করে বলল–পালাবার উপায় বের করেছি। ফ্রান্সিস বলল কী উপায়?
–ঐ যে জানালার মত ফোকরটা ঐ পর্যন্ত ওঠার ব্যবস্থা করেছি। ওটাতে পা রেখে ছাউনি সরিয়ে ঘরের ওপরে উঠতে পারবো। তারপর বুদ্ধি করে পালানো। শাঙ্কো বলল।
ফ্রান্সিস চোখ বুজে একটু ক্ষণ ভাবল। তারপ রবলল—আমার ছক ভাবা হয়ে গেছে। তোমাকে ছাউনি দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে প্রহরীদের কোমর থেকে চাবি বের করে নিয়ে দরজা খুলবে। আমরা পালাবো। তবে তুমি একা এতসবপারবেনা। বিনেলোকেসঙ্গে নেবে। মোট কথা নিঃশব্দে সব কাজ সারতে হবে। আজ রাতেই লেগে পড়ো। তার আগে দেখে এসো ক’জন প্রহরী রয়েছে। শাঙ্কো উঠে গেল। দরজার কাছে গিয়ে দেখে এসে বলল–মাত্র দু’জন।
