–ঠিক আছে। আমি চিবিয়ে ছিবড়ে করে দিচ্ছি। ফ্রান্সিস হাত বাড়াল
–কিন্তু এর রস পেটে গেলে মৃত্যু হতে পারে। ভেন বলল।
কিচ্ছু ভেবো না। আমি সাবধান থাকবো। ফ্রান্সিস বলল। মারিয়া পাশেই ছিল। ও ভয়ার্ত স্বরে বলে উঠলনা-না। তুমি এটা করতে পারবে না।
–কাউকে তো চিবোতেই হবে–ফ্রান্সিস বলল–কিছু ভেবো না। এ এমন একটা কঠিন কাজ নয়।
–চিবিয়ে ছিবড়েটা বেরকরেদাও। তারপর ভালো করে মুখটা ধুয়ে ফেলো। ভেন বলল।
ফ্রান্সিস শেকড়টা মুখে ঢোকাল। চিবোতে লাগল। বেশ তেতো স্বাদ। মুখ কুঁচড়ে চিবোতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই ছিবড়ে মত হল। ফ্রান্সিস সেটা বের করে ভেন-এর হাতে দিল। ভেন ছিবড়েটা আমার পিঠে চেপে চেপে দিতে লাগল। রাজা একবার ঝাঁকিয়ে উঠলেন। তারপর চুপ করে রইলেন। ফ্রান্সিস কাঠের গ্লাসে জল নিয়ে বারকয়েক কুলকুচি করে মুখ ধুয়ে ফেলল। কোন বিপদ হল না।
–মোক্ষম ওষুধটা পেয়েছি। রাজা দু’তিন দিনের মধ্যে সুস্থ হবেন। ভেন বলল। উদ্বিগ্ন মারিয়া এতক্ষণে স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল। বলল–ভেন ফ্রান্সিস এখন সব খেতে পারবে তো?
–হ্যাঁ রাজকুমারী। আর কোন বিপদ নেই। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। ভেন বলল।
–তোমার শরীর ভালো আছে তো? মারিয়া ফ্রান্সিসকে জিজ্ঞেস করেন।
–হ্যাঁ হ্যাঁ। শুধু মাথাটা একটু ঘুরছে। ফ্রান্সিস বলল।
–ওটা কিছুক্ষণের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে। ভেন বলল। এতক্ষণে রাজা ফ্রান্সিদের দিকে তাকালেন। আস্তে আস্তে বললেন–আমি তোমার নাম জানি না। কী বলে তোমাকে ধন্যবাদ জানাবো তাও বুঝে উঠতে পারছি না। আমাকে সুস্থ করবার জন্যে জীবনের ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করলে না। তুমি সত্যিই মহৎ।
–এটা মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি আমার কর্তব্য। আপনি দ্রুত সুস্থ হোন এটাই এখন চাই। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা আর কিছু বললেন না। চুপ করে কাত হয়ে শুয়ে পড়লেন।
কয়েকদিনের মধ্যেই রাজা পাকোর্দো সুস্থ হলেন। পিঠের ঘা শুকিয়ে গেল।
এর মধ্যে রাজা আনাতোর রাজা পাকোর্দোকে রাজসভায় ডেকে পাঠিয়েছিল। বলেছিল–এখন কেমন আছেন?
ভালো–রাজা পাকোর্দো বলেছিলেন।
–আবার যদি চাবুকের ঘা খেতে না চান তো এখনও বলুন সেই ধনভাণ্ডার কোথায় রেখেছেন। রাজা আনোতার বলেছিল। না।
–আমি তো বলেছি এই ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। যিনি জানতেন সেই মন্ত্রী মশাই তো মৃত। এই বাতোরিয়া দেশ তো এখন আপনার দখলে। বিনা বাধায় তল্লাশী চালান। রাজা পাকোর্দো বলেছিলেন।
-কিন্তু কিছু একটা সূত্র তো চাই। রাজা আনোতার বলেছিল।
–আমি আপনাকে কোন সূত্র দিতে পারবো না। রাজা পাকোর্দো বলেছিলেন।
–আচ্ছা মন্ত্রীমশাই কেমন মানুষ ছিলেন? রাজা আনোতার জানতে চাইল।
–সৎ পরিশ্রমী অত্যন্ত বুদ্ধিমান। আবার একই সঙ্গে সরল স্নেহশীল। প্রজাদের নিজের সন্তানের মত ভালোবাসতেন। তাকে কখনও ক্রুদ্ধ হতে দেখি নি। নিজে সংসারটংসার করেন নি। তার একমাত্র চিন্তাই ছিল প্রজাদের মঙ্গল সাধন। আমি সবসময় তার পরামর্শ নিয়েই রাজকার্য করেছি। রাজা পাকোর্দো বলেছিলেন।
–আচ্ছা রাজকার্যে সাহায্য করা ছাড়া তিনি আর কী করতেন? রাজা পাকোর্দো একটু থেমে বললেন–শুনলে আশ্চর্য হবেন–অবসর সময়ে তিনি ছবি আঁকতেন।
–আঁ? অবাক কাণ্ড। রাজা আনোতার বলেছিলেন।
–হুঁ। অবাক হবারই কথা। রাজা পাকোর্দো বলেছিলেন।
–কীসের ছবি আঁকতেন? মানুষ জীবজন্তু? রাজা আনোতার বলেছিলেন।
না প্রকৃতির ছবি। ফুয়েন্তসরোবরআর তার চারপাশের বনজঙ্গল, পাহাড়, আকাশ এই সময়ের ছবি। রাজা পাকোর্দো বলল।
দুই রাজার এই কথোপকথনের দিন ফ্রান্সিস রাজসভায় উপস্থিত ছিল। মন্ত্রীমশাই ছবি আঁকেন একথা শুনে ও নিজেও কম অবাক হয় নি। মৃতমন্ত্রী মশাইয়ের প্রতি ওর শ্রদ্ধা বেড়ে গেল।
সেদিন দুই রাজার এই পর্যন্তই কথাবার্তা হয়েছিল। ফ্রান্সিসের একটা লাভ হয়েছিল সেদিন। রাজা আনোতার মারিয়াকে অন্তঃপুরে থাকার অনুমতি দিয়েছিল। মারিয়া অবশ্য যেতে চাইছিল না। ফ্রান্সিস হ্যারি দুজনে মিলে অনেক বুঝিয়ে টুঝিয়ে ওকে যেতে বাধ্য করেছিল। আসলে ফ্রান্সিসরা এত কষ্ট করে এই কয়েদঘরে পড়ে থাকবে আর ও রাজ অন্তঃপুরের সুখ স্বাচ্ছন্দের মধ্যে থাকবে এটাও মেনে নিতে পারছিল না। কিন্তু ফ্রান্সিসদের পেড়াপেড়িতে শেষ পর্যন্ত মানতে বাধ্য হল। ফ্রান্সিসরা নিশ্চিন্ত হল।
দিন যায় রাত যায়। ফ্রান্সিস রাতে ভালো করে ঘুমোতে পারে না। একমাত্র চিন্তা কী করে এই কয়েদঘর থেকে পালানো যায়। এই নিয়ে হ্যারির কথা হয়।
ওদিকে রাজা আনোতার রাজা পাকোর্দোর পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ধনভাণ্ডারের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছে। চারপাশের বনজঙ্গলপাহাড়। ফুটন্ত সরোবরের আশেপাশে অন্বেষণকারী দল পাঠাচ্ছে। নিজের অন্তঃপুর অস্ত্রাগার সৈন্যাবাস সর্বত্র খোঁজ করে বেড়াচ্ছে তার বাছাই করা আট দশ জন সৈন্য। কিন্তু গুপ্তধনভাণ্ডার কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
মাঝে মাঝেই রাজা পাকোর্দোকে রাজসভায় ডেকে পাঠায়। তর্জন গর্জন করে। চাবুকের মারের ভয় দেখায়। রাজা পাকোর্দো নির্বিকার। এককথাইবিরক্তির সঙ্গে বারবার বলেন– আমি কিছুই জানি না। যিনি জানতেন তিনি মৃত।
রাজঅন্তঃপুরে রাজার শয়নকক্ষে মন্ত্রী মশাইয়ের আঁকা তিনটে ছবি আছে। তিনটে ছবিতেই শুধু গাছপালা পাহাড় আকাশের ছবি। সন্দেহ নেই ছবিগুলো সুন্দর। রাজা আনোতার সময় পেলে ছবিগুলো দেখে। ছবি দেখে মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারে না। সে রেগে গিয়ে ছবি তিনটে নামিয়ে বস্তাবন্দী করে মালখানা ঘরে রেখে দিয়েছে।
