কিন্তু এখানেই হয়েছে সমস্যা। আপনি জানেন না যে আপনার মন্ত্রী মশাই গতরাতে ফুয়েন্ত সরোবরে জলে ডুবে মারা গেছেন। রাজা আনোতার বলল।
রাজা পাকোর্দো চমকে উঠলেন। তারপর বললেন–যুদ্ধের পরাজয়ের গ্লানি বোধহয় তিনি সহ্য করতে পারেন নি। রাজা পাকোর্দো বললেন।
–যে কারণেই হোক। আর কেউ কি সেই ধনভাণ্ডারের খোঁজ রাখে?
জানি না। রাজা পাকোর্দো বললেন।
মিথ্যে কথা। রাজা আনোতার চিৎকার করে বলল। তারপর ক্রুদ্ধ স্বরে বলল চাবুকের মার পড়লে বলতে বাধ্য হবেন।
–চেষ্টা করে দেখতে পারেন। রাজা পাকোর্দো বললেন।
–ঠিক আছে। আমি নিজে কয়েকদিন চেষ্টা করে দেখি। রাখা আনোতার বলল—
দেখুন চেষ্টা করে। রাজা পাকোর্দো বললেন।
রাজা আনোতার এবার ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। বলল–তোমরা এসেছো কেন?
–একটা অনুরোধ জানাতে। ফ্রান্সিস বল।
বলো। রাজা বলল।
আমাদের সঙ্গে আমাদের দেশের রাজকুমারী রয়েছে। কয়েদঘরের ঐ পরিবেশ তার পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর। তাকে অন্য কোথাও বন্দী করে রাখুন। রাজ অন্তঃপুরে হলে ভালো হয়। ফ্রান্সিস বলল।
–এটা পরে ভেবে দেখছি। এখন আমি গুপ্ত ধনভাণ্ডার উদ্ধারে ব্যস্ত থাকবো। রাজা আনোতার বলল।
–বেশ পরেই দেখবেন। রাজা আনোতার প্রহরীদের ইঙ্গিত করল। প্রহরীরা এগিয়ে এল। বলল–চলো সব।
রাজা পাকোর্দোর সঙ্গে ফ্রান্সিসরা কয়েদঘরে ফিরে এল। ঘরে ঢুকে রাজা পাকোর্দো বসলেন। তারপর আস্তে কাত হয়ে শুয়ে পড়লেন। পিঠে চাবুকের ক্ষত। চিৎ হয়ে শুতে পারলেন না। পাথরের দেয়ালে পিঠ দিয়েও বসতে পারলেন না।
ফ্রান্সিস ভেন-এর কাছে এল। বলল ভেন-রাজা মশাইয়ের পিঠে চাবুক মারা হয়েছে। কী করা যায়?
কী করবো বলো। সঙ্গে তো ওষুধ নেই। কোমরের ফেট্টি থেকে কিছুটা কাপড় ছিঁড়ে নিয়ে রাজকুমারীকে দাও। জলে ভিজিয়ে সেই কাপড়ের টুকরো যেন রাজার পিঠে বুলিয়েদেনাকষ্ট কমবে।
মারিয়া ফ্রান্সিসের পাশেই বসেছিল। সব শুনে বলল–আমি–সব করছি। মারিয়া নিজের ঝুল পোশাক থেকে কাপড় ছিঁড়ে নিল। তারপর জলে ভিজিয়ে নিয়ে রাজার কাছে এসে বলল–মান্যবর রাজা–আপনার পিঠে জল ঝুলিয়ে দিচ্ছি। আমাদের বৈদ্যি বলছে এতে আপনার যন্ত্রণা একটু কমবে।
–বেশ। রাজা উঠে বসলেন। মারিয়া রাজার পোশাকটা পেছন দিকে তুলল। চাবুকের স্পষ্ট দাগ। রাজা নিঃশব্দের কী কষ্ট সহ্য করছেন সেটা মারিয়া বুঝতে পারল। ও রাজার জন্যে গভীর সহানুভূতি বোধ করল। আস্তে আস্তে ভেজা কাপড়ের টুকরোটা পিঠে বুলিয়ে দিতে লাগল। রাজার মুখ থেকে মৃদু গোঙানির শব্দ বেরিয়ে এল। সেই শব্দ শুনে ফ্রান্সিস স্থির থাকতে পারল না। কয়েদঘরের দরজার কাছে গেল। একজন প্রহরীকে ডাকল। প্রহরী কাছে এলে বলল–রাজা পাকোর্দো খুব অসুস্থ। একজন বৈদ্যকে আসতে বলো।
–আমাদের রাজার হুকুম না হলে বৈদ্যকে ডাকা চলবে না। প্রহরী বলল।
–ঠিক আছে। তোমাদের সেনাপতির সঙ্গে কথা বলতে চাই তাকে ডাকো।
–তিনি কি আসবেন? প্রহরী বলল।
–একবার বলে তো দেখো৷ বলবে যে একজন বিদেশি ডাকছে।
–হুঁ। প্রহরীটি চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরে সেনাপতি এল। দরজায় মুখ রেখে বলল–কে ডাকছিলে?
আমি। ফ্রান্সিস এগিয়ে গেল। বলল–চাবুকের মারে রাজা আনোতার খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার চিকিৎসা প্রয়োজন।
–দেখি রাজাকে বলে। তবে রাজা চিকিৎসার অনুমতি দেবেন বলে মনে হয় না। সেনাপতি চলে গেল।
বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। কিন্তু সেনাপতি ফিরে এল না। ফ্রান্সিস বুঝল রাজা চিকিৎসার কোন ব্যবস্থাই করবেনা। ফ্রান্সিস ভেন-এর কাছে এল। বলল–ভেন রাজার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায় না?
দাঁড়াও। এখানে তো গাছগাছালি আছে। আমি দেখছি। ভেন লোহার দরজায় মুখ চেয়ে বাইরের জঙ্গলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস ওর পাশে এসে দাঁড়াল। হঠাৎ কী দেখে ভেন বলে উঠল–পেয়েছি। ফ্রান্সিস বলল কী পেয়েছো?
–ওষুধ। ভেন বলল। তারপর আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলল
–ঐ যে চেস্টনাট গাছটা দেখছ তার পেছনে দেখ একটা ছোট গাছ। হাত চারপাঁচ লম্বা। ঐ গাছের শেকড়টা চাই। দেখ প্রহরীদের দিয়ে গাছটা আনতে পারো কিনা।
ফ্রান্সিস একজন প্রহরীকে ইশারায় ডাকল। বলল–একটা উপকার করবে ভাই?
–সেনাপতিকে ডাকতে যেতে পারবো না। প্রহরী বলল।
না না। অন্য ব্যাপার বলছি। ফ্রান্সিস এবার আঙ্গুল তুলে সেই ছোট গাছটা দেখালো। বলল ঐ গাছটার শেকড় সুদ্ধ তুলে এনে দাও।
প্রহরী অবাক। বলল–ঐ গাছটা দিয়ে কী করবে?
দাঁত মাজবো। নিয়ে এসো। ফ্রান্সিস বলল।
–না না। পারবো না। প্রহরী মাথা নেড়ে বলল।
ফ্রান্সিস ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল–একটা সোনার চাকতি দাও তো। শাঙ্কো কোমরের ফেট্টি থেকে একটা সোনার চাকতি বের করে দিল। ফ্রান্সিস সোনার চাকতিটা প্রহরীকে দেখিয়ে বলল–এবার পারবে? সোনার চাকতিটা প্রায় কেড়ে নিয়ে প্রহরী একগাল হাসল। বলল– এটা এমন কী কাজ? ও চলে গেল। একটু পরেই গাছটা শেকড় সুদ্ধ উপড়ে নিয়ে এল। দেখে ভেন বলল–ভাই শুধু শেকড়টা কেটে দাও।
বেশ। প্রহরী তরোয়াল বের করল। গাছের গোড়ার কাছে কেটে শেকড়টা দিল। ভেন শেকড়টা নিয়ে ঘরের ভেতরে এসে বসল। শেকড়ে আটকে থাকা মাটি ঝেড়ে ঝুড়ে ফেলে ফ্রান্সিসকে বলল–এই শেকড় চিবিয়ে ছিবড়েটা রাজার পিঠে মারের জায়গা গুলোয় চেপে লাগিয়ে দিতে হবে। কিন্তু আমার দাঁত তো অত শক্ত নয়।
