না। ভাবছি, এতটা পথ আপনিই আবার ড্রাইভ করে হোটেলে ছেড়ে দিয়ে আসবেন তো?
অসুবিধে নেই। রাত জাগার অভ্যেস আছে আমার।
আমার নেই।
একরাশ কাঁচের বাসন ভেঙে গেল যেন। বাব্বা। কি হাসি। বুক ছলাৎ করে ওঠে।
গাড়িটাও ব্রেক কষল সঙ্গে-সঙ্গে–আসুন মিঃ ওয়ান্ডারম্যান, এই আমার কুটির।
গাড়ি থেকে নেমে তাকিয়ে দেখল গজানন। চারপাশে বড়-বড় গাছ। মাঝে একটু ফাঁকা জায়গা। তার মাঝে একতলা বাড়ি। একদম সাদা। ঠিক যেন ফ্রেমে বাঁধানো একটা ছবি।
অন্ধকার যে, মৃদুস্বরে বলে গজানন ইলেকট্রিসিটি নেই?
জেনারেটর আছে। চলুন।
নুড়ি মাড়িয়ে গেট খুলে মমতাজ সুন্দরী গেল আগে-আগে-পেছনে অতি হুঁশিয়ার গজানন। চোখ ঘুরছে ডাইনে-বাঁয়ে সামনে-পেছনে। যে-কোনও মুহূর্তে একটা বুলেট উড়ে আসতে পারে– গজাননের ভবলীলা সাঙ্গ হতে পারে। বনেবাদাড়ে কে আসছে খোঁজ করতে?
গজানন না জানলেও যে আসবার সে ঠিক এসে গেছিল।
পুঁতিবালা। দূরে গাড়ি রেখে বনের মধ্যে দিয়ে নিঃশব্দ সঞ্চারে ছুটেও এসেছিল। আর…
সতর্ক চাহনি মেলেও গ্রেট গজানন যাকে দেখতে পায়নি তাকে ও দেখেছিল।
আমিনুল হক। সেই ব্রোঞ্জ মূর্তি। অন্ধকারেই চিনেছে পুঁতিবালা। অন্ধকারেই তো চিনবে। অন্ধকারেই তো মানুষ চেনা যায়। অন্তত পুঁতিবালারা চিনতে পারে।
তাই আমিনুল হকের পেটাই মুখাবয়ব দেখেই গা শিরশির করে উঠেছিল পুঁতিবালার। ভয়ে নয়,–রোমাঞ্চে। সুখকর স্মৃতির রোমাঞ্চে!
দূর থেকে চোখ রাখল দুই পুরুষের ওপর। গজানন আর আমিনুল। কালো কষ্টিপাথরটাকে অত না দেখলেও চলবে। হারামজাদী ভুলিয়ে ভালিয়ে ঠিক নিয়ে এসেছে জিরো জিরোকে। শয়তানি ঢলানি! ফুলে-ফুলে মধু খাও বলে গজাননদাকে ধরে পার পেয়ে যাবে ভেবেছ?
আর গজাননদা, তোমাকেও বলিহারি যাই। হেরোইন অন্বেষণে এসে মানবী-হেরোইনের ফাঁদে ধরা পড়লে। ও রাক্ষসী তোমাকে যে গিলে ফেলবে।
তবে হ্যাঁ, পুঁতিবালা যখন এসে গেছে–
আলো জ্বলে উঠেছে বাংলোবাড়িটায়। জেনারেটরের আওয়াজ হচ্ছে। আলো জ্বলছে শুধু একতলার ঘরটায়। আমিনুল হক গুঁড়ি মেরে এগোচ্ছে আলোকিত জানলার দিকে।
মরণ আর কী! উঁকি মেরে দেখার শখ হয়েছে। কাল রাতেও কি শখ মেটেনি। মুখে ঝাড় তোমার…
গজানন আর মমতাজ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। হেরোইনের নেশা বেশ চেপে বসেছে সুন্দরীর মগজে। চোখের আবেশ অতন্দ্র সমুদ্রের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কালো সমুদ্র।
হুঁশিয়ার হয়েছে গজানন। এ মেয়ে এই মুহূর্তে সব করতে পারে।
স্খলিত শাড়ির দিকে নজর নেই মমতাজের। কাঁধের ওপর থেকে কোনওকালে আঁচল খসে পড়ে লুটোচ্ছে পায়ের কাছে। পীবর বুক মিশিয়ে দিয়েছে গজাননের কপাট বুকে। দুই হাত তার গজাননের দুই কাঁধে। ঠোঁট উঁচিয়ে ধরেছে গজাননের ঠোঁটের কাছে। চোখের তারায় আকুল আমন্ত্রণ।
কিস মি, ওয়ান্ডারম্যান, কিস মি। গলার মধ্যে ঝোড়ো হাওয়ার চাপা হাহাকার।
গজাননকে এখন একটু অ্যাকটিং করতে হবে। উপায় নেই। এই একটি সূত্র ধরেই তাকে এগোতে হচ্ছে। এখানে না হলে অন্যত্র চেষ্টা চালাবে।
মমতাজ, উত্তমকুমার ঢঙে বললে গজানন। কণ্ঠস্বরটা বেশ গুরুগম্ভীর শোনাচ্ছে। বটে।
হোসেন সাব।
জানি। সাদা গুঁড়ো চাখবে।
আছে–সামান্য।
সামান্য কেন?
আমার কাছে তো থাকে না।
তবে কার কাছে থাকে?
সোজা জবাব দিতে গিয়েও কথা ঘুরিয়ে নিল মমতাজ–
তার কাছ থেকে নিয়ে আসতে হয়। না গিয়েও পারি না। নেশা ধরিয়েছে সে–চালান দেবেও সে–বিনিময়ে নেবে আমার সর্বস্ব।
সে কে?
সে কে? অদ্ভুত হাসি ফুটে ওঠে–সে আমার সব।
নাটক রাখো মমতাজ, সামান্য কড়া হয় গজানন–আমি যদি নেশায় পড়ি–পড়তেই তো চাই-ব্যাচেলারের একটা নেশা তো চাই। তখন কে জোগান দেবে আমাকে?
আমি, নিবিড় হয় মমতাজের বাহুবন্ধন। আমি তো জানি। আমার মধ্যে থেকেই তুমি পাবে সব সুখ, সব শান্তি, সব নেশা।
যদি সে চালান বন্ধ করে দেয়?
তোমাকে দিলেও আমাকে না দিয়ে পারবে না। মমতাজের গলার স্বর ক্রমশ আরও মথিত হচ্ছে। চোখের তারায় অমানিশা গাঢ়তর হচ্ছে!
স্বর তীব্র করে গজানন–কেন, তুমি কি তার হাতের পুতুল?
একরকম তাই। নাও, স্টার্ট।…
হাত দিয়ে মমতাজের চিবুক ঠেলে সরিয়ে দিল গজানন–তোমার মতো ব্ল্যাক বিউটিকে হাতের পুতুল করতে পারে–সে কে?
সে যে আমার গড, এক হাত গজাননের কাঁধ থেকে নামিয়ে নিজের শাড়ি ধরে মমতাজ। শক্ত মুঠিতে হাতের কবজি চেপে ধরে গ্রেট গজানন।
তোমার গড তো একজনই–তোমার স্বামী।
গডফাদার…গডফাদার–
ঠিক এই সময়ে ঝপ করে নিভে গেল ঘরের আলো। স্তব্ধ হল জেনারেটরের শব্দ। সবলে গজাননকে জাপটে ধরে জড়িত ভয়ার্ত স্বরে মমতাজ বলে উঠল–নুরুল হাসান এসে গেছে। ও গড।…
সে কী আলিঙ্গন। অন্ধকারে ঝটাপটি। নাগিনীর বাহুপাশ থেকে মুক্তি পাওয়ার আপ্রাণ প্রয়াস। এরই মাঝে ঘটে গেল অঘটন।
মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল গজাননের। জ্ঞান হারাল সঙ্গে-সঙ্গে।
জ্ঞান ফিরে পেয়ে গজানন দেখল, আমিনুল হকের ব্রোঞ্জ মূর্তি ঝুঁকে রয়েছে তার ওপর। গজানন চোখ মেলতেই সরে গিয়ে বসল একটা চেয়ারে। হাতে রিভলভার।
গজানন পড়ে মেঝেতে। মাথার ওপর জ্বলছে আলো, আওয়াজ শোনা যাচ্ছে জেনারেটরের।
গজানন বললে, কী ইয়ার্কি হচ্ছে? মাথায় মারল কে? আপনি?
হাতের রিভলভারের কুঁদো দেখাল আমিনুল-মুখে কিছু বলল না।
