গজানন ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুমান করেছে, অভিযান পৌঁছেছে সম্ভবত অন্তিম পর্বে। আমিনুল হক নামধারী পুলিশ অফিসার যখন হিরোইন কারবারে লিপ্ত এবং কিঙয়ের হদিশ জানতে আগ্রহী–তখন হোটেল মালিকের ব্যাভিচারিণী বউকে নিয়ে তার নিরালা আলয়ে গেলে প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়তে পারে।
প্রাণ দিতে প্রস্তুত গজানন। মেন্টাল ক্লিনিকের ডাক্তারবাবু শাঁখের আওয়াজের মতো গলাবাজি করে তাকে বলেছিলেন–গজানন, দেশের জন্যে তোমার ট্যালেন্টকে কাজে লাগিও নিজের জন্যে নয়।
গজানন আজ তাই এক্কেবারে বেপরোয়া। যে নরাধমরা হেরোইন প্রবেশ করাচ্ছে, ইন্ডিয়ার রন্ধ্রে রন্ধ্রে, যুবসমাজকে মেরুদণ্ডহীন করে ছাড়ছে তাদের পালের গোদাকে সে জবাই করবে নিজের হাতে। একটার পর একটা খুন করে যাবে। সে যে রেগেছে, তার প্রমাণ রেখে দেবে রক্তগঙ্গার মধ্যে। যদি নিজের রক্তও মিশে যায় তার মধ্যে মিশুক। কেউ তো কাঁদবে না। এক-আধফোঁটা চোখের জল হয়তো ফেলত পুঁতিবালা, সে ছুঁড়িও তো নিপাত্তা। কেনই বা এসেছিল পেছন-পেছন। আমিনুল যদি তাকে কবজা করে থাকে তাহলে সর্বনাশ।
গজানন সে চেষ্টাও করবে বলে ঠিক করেছিল, আমিনুলের কাছ থেকে ঠিকানা বের করবেই পুঁতিবালার।
কিন্তু তার আর দরকার হয়নি।
পুলিশ অফিস থেকে ফিরে হোটেলে ঢুকতে যাচ্ছিল গজানন–আজই সকালবেলা। গাড়ি পার্ক করার জায়গায় ঝাড়ন হাতে দাঁড়িয়েছিল একটা ছেলে। ময়লা গাড়ি ঘষে সাফ করে দেয়। বিনিময়ে নেয় সামান্য দক্ষিণা।
গজানন গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতেই ছেলেটা একগাল হেসে দাঁড়াল সামনে।
হাসি দেখে পিত্তি জ্বলে গেছিল গজাননের কী চাই? গাড়ি মুছতে হবে না।
নীরবে একটা চিরকুট এগিয়ে দিয়েছিল ছোকরা। তাতে মেয়েলি হাতে লেখা–দাদা গো দাদা মমতাজকে নিয়ে কাদা! আমিনুলকে সাবধান–সে জানে তোমার নামধাম!
ছড়া পড়েই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিল গ্রেট গজানন। ছড়া লেখা হচ্ছে! ছড়া লেখবার সময় এটা! ফাজিল ভেঁপো মেয়ে কোথাকার! কোথায় একটু পাশে এসে দাঁড়াবে, তা না আড়ালে টিটকিরি দিচ্ছে মমতাজকে নিয়ে ফষ্টিনষ্টি করা হচ্ছে বলে। বেশ করছে গজানন, আলবত করবে, একশোবার করবে। তুই পুঁতিবালা, তুই কি কম যাস? কাজের ফিকিরে যত অকাজ আছে–সবই তো করিস। গজানন না হয় দেশের জন্যে, দশের জন্যে মমতাজকে নিয়ে একটু খেলবে।
কিন্তু কোথায় গেল ফচকে মেয়েটা? চোখ পাকিয়ে ছোকরাকে শুধোয় গজানন–চিঠি কার কাছে পেলি?
ওই তো ওখানে দাঁড়িয়ে…যাঃ! চলে গেছে। আপনাকে তো চিনিয়ে দিল।
ননসেন্স! বলে হনহন করে হোটেলে ঢুকে গেছিল গজানন। নিশ্চিন্ত হয়েছিল অবশ্য পুঁতিবালার ব্যাপারে। আমিনুল তার টিকি ধরতে পারেনি নিশ্চয়। স্রেফ হুমকি দিয়েছিল গজাননকে।
পুঁতিবালা এই মুহূর্তে স্বাধীন। ও মেয়ে সব করতে পারে। ওর কাছে বিদেশের মাটি আর স্বদেশের মাটির মধ্যে কোনও তফাত নেই। ও জানে শুধু পুরুষ মানুষ আর নিজের বডির যাদুশক্তি। ভক্তি-শ্রদ্ধা, এমনকী একটু ভয়ও করে বটে–এই দাদাটিকে। গজাননদার অকল্যাণ হবে জানবে তা রুখতে দুনিয়ার হেন অপকর্ম নেই–যা ওর অসাধ্য।
মমতাজ চালিত টয়োটায় বসে এইসব কথাগুলোই আর একবার ভেবে নিল গজানন। অ্যাসিস্ট্যান্ট একটা বানিয়েছিল বটে। গুরুকেও বোকা বানায়। বেপারীটোলা লেনে যদি জান নিয়ে ফিরতে পারে, কান ধরে এমন একটা চড় লাগাবে…।
ব্যাকভিউ আয়নায় দেখা গেল একটি গাড়ির সাইডলাইট। বেশ দূরত্ব বজায় রেখে আসছে গাড়িটা। ফলো করছে কে? আমিনুল না পুঁতিবালা? গেমরুমে আজকে ব্রোঞ্জমূর্তিটাকে দেখা যায়নি। তাই বলে গজাননকেও নিশ্চয় নজর ছাড়া করেনি। হেরোইন কিঙের ঠিকানার লোভে হয়তো আসছে। পেছন-পেছন।
গজানন যদি দুরদর্শনের শক্তি লাভ করত সেই মুহূর্তে, তাহলে অবশ্য দেখতে পেত অন্য দৃশ্য।
চুপি-চুপি গাড়ি চালিয়ে আসছে তারই সাকরেদ পুঁতিবালা!
আমিনুল হক ওঁৎ পেতে আছে বনানীর মধ্যে সেই নিভৃত আলয়ে–যেখানে বৃন্দাবনলীলা চলেছে প্রতি রাতে। মমতাজ সুন্দরী যেখানকার অকথ্য নায়িকা।
গাড়ি চালাচ্ছে এই অতৃপ্ত কামনাময়ী। শ্যাম্পু করা ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা চুল উড়ছে হাওয়ায়। সারি-সারি মিটার থেকে বিচ্ছুরিত আলো পড়েছে তার চিবুকের নিচ থেকে ওপরের দিকে। আলো আর ছায়ায় নিখুঁত কালো মুখটা অপরূপ শুধু নয়, আশ্চর্য লাবণ্যে ভরা বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু পাতলা কাজল ছাওয়া চোখে সে যখন মদির কটাক্ষ হানছে, ঈষৎ স্ফীত নাসারন্ধ্র আর উত্তাল বুকে অবদমিত বাসনাকে জাগ্রত করছে–তখন আর শুধু তাকিয়ে দেখা যায় না তাকে…ইচ্ছে যায়…
ইচ্ছে যায়…
এই প্রবল ইচ্ছেটাকেই প্রবলতম সংযম দিয়ে রুখতে রুখতে চলেছে বেচারা গজানন। খাই খাই মেয়েমানুষদের সামাল দেওয়া যে কঠিন হাড়ে হাড়ে তা মালুম হচ্ছে। একে তো ব্যাচেলার তার ওপর লেডি কিলারদের পাঠশালাতেই পড়েনি। সুতরাং নিজেকে সামলে রাখতে গিয়ে মাথা গরম করে ফেলছে। মাথা গরম হয়ে গেলেই ভায়োলেন্ট হতে ইচ্ছে যাচ্ছে। তাতেও তো সুস্থ বোধ করে গজানন। ভগবান কেন যে মেয়েমানুষ জাতটাকে সৃষ্টি করেছিল। দূর। দূর!
বনের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে গাড়িটা চলেছে কোথায়? সতর্ক হয় গজানন।
ভুজঙ্গিনী ভঙ্গিমায় ঘাড় বেঁকায় মমতাজভয় করছে, মিঃ ওয়ান্ডারম্যান?
