গজানন বললে, ভারি চোয়াড়ে লোক তো আপনি। অমনি করে মাথায় মারে? ভাগ্যিস একেবারে অজ্ঞান হয়ে গেছিলামনইলে দেখতেন খেলাটা।
মাথায় চোট পড়লেই বুঝি আপনি খেলেন ভালো? ত্রুর হেসে বলল ব্রোঞ্জ মূর্তি।
লোকে তাই বলে। তখন আমার আর কিছু মনেই থাকে না।
বটে! বটে! মাথায় চোট পড়লে আর কিছু মনে থাকে না। তাই না?
তাই তো বললাম, মিঃ ফোর টোয়েন্টি।
ফোর টোয়েন্টি। আমি?
তা ছাড়া আর কে?
মমতাজ মাথায় চোট মেরেছিল নাকি?
না তো…।
নিশ্চয় মেরেছিল। তারপর আর কী করেছেন, মনে নেই।
কী করেছি? কী মনে নেই? শঙ্কিত হয় গজানন। মেন্টাল ক্লিনিক থেকে বেরোনোর পর ইস্তক এমন অঘটন তো আকছার ঘটছে। না জানি কী করে ফেলল এখানে। অন্ধকারে ঝটাপটির সময়ে অবশ্য হাত চালিয়েছিল গজানন–মমতাজও কী হাত চালিয়েছিল? মাথায় কি মেরেছিল?
গুলগুল চোখে তাকায় গজানন–কী হয়েছে বলুন তো?
জানেন না?
এক্কেবারে না?
লায়ার! মিথ্যুক! উঠে পড়ুন। বেচাল দেখলেই গুলি চালাব। ক্র্যাকশট আমিনুল হক নটা মেডেল পেয়েছে গুলি চালানোয়–খেয়াল থাকে যেন।
থাকবে, থাকবে, ভূমিশয্যা ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে-দাঁড়াতে বললে গজানন কী করে ফেলেছি, আগে দেখান।
পাশের ঘরের দরজা খোলা আছে। চৌকাঠ থেকে দেখুন, ভেতরে ঢুকবেন না।
তিন পা যেতেই পাশের ঘরের দরজা। উঁকি মারবারও দরকার হল না। বীভৎস দৃশ্যটা অতিশয় প্রকট দরজার বাইরে থেকেই।
মেঝে থেকে ইঞ্চি ছয়েক উঁচু একটা লাল রঙের ডিভান জাতীয় মখমল শয্যা। তার ওপর চিৎপাত হয়ে শুয়ে মমতাজ। দু-পা দু-পাশে ছড়ানো। চোখের তারা ভোলা।
ডিপ ব্লু শাড়িটা দিয়ে তার দেহটাকে ঢাকা দেওয়া হয়েছে। স্পষ্টত ওই আবরণ ছাড়া তার দেহে আর কোনও আবরণ নেই।
শিউরে ওঠে গজাননের মতো মানুষও। এই তো কিছুক্ষণ আগে প্রাণস্পন্দনে স্পন্দিত ছিল ছন্দমাধুরীতে ভরা ওই দেহটা।
এইটুকু সময়ের মধ্যে প্রাণপাখি উড়ে গেল দেহপিঞ্জর ছেড়ে। কীভাবে? কেন?
অনুক্ত প্রশ্নের জবাবটা এল পেছন থেকে ধর্ষণ এবং মৃত্যু। জিরো জিরো গজানন, এই একটা চার্জেই আপনাকে আমি ফাসাব।
আস্তে-আস্তে ঘুরে দাঁড়াল গজানন। চোখমুখ হাত-পা সব প্রশান্ত।
আমি করেছি?
প্রত্যক্ষ প্রমাণ আদালতে হাজির করব।
তেত্রিশ পাউন্ড পেলেও?
পথে আসুন। কিঙ-এর ঠিকানা?
জানি না।
নির্নিমেষে চেয়ে রইল ব্রোঞ্জ মূর্তি ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখেছি মানিব্যাগের মধ্যে।
মানিব্যাগ পেয়েছেন?
কথার জবাব দিল না ব্রোঞ্জ মূর্তি–গাড়িটা চালিয়ে নিয়ে চলুন।
টয়োটা?
হ্যাঁ।
চলুন।
জেনারেটর নিভিয়ে দিয়ে গজাননের পেছন-পেছন বেরিয়ে এল আমিনুল হক। জিরো জিরো বোকা নয়। ক্র্যাকশট এবং নটা মেডেল পাওয়া বন্দুকবাজের সঙ্গে চ্যাংড়ামি করতে যাওয়া হঠকারিতা, তা কি সে জানে না!
তা ছাড়া, টয়োটার সিটের তলায় আছে তার পয়েন্ট থ্রি এইট। সিটটায় আগে বসতে হবে, তারপর…
বাড়ি এখন অন্ধকার। টয়োটার পেছনের সিটে আগে উঠে বসল আমিনুল হক। তারপর রিভলভার নির্দেশে সামনের সিটে ওঠাল গজাননকে। দুহাত মাথার ওপর তুলে বসল স্টিয়ারিং হুইলের সামনে। কলের পুতুলের মতো আমিনুলের হুকুম তামিল করে গাড়ি বের করে আনল বনের মধ্যে থেকে। হাইওয়েতে উঠে গাড়ি যখন স্পিড় নিয়েছে, তখন পেছন থেকে বললে আমিনুল-মমতাজের লাশের কাছাকাছি আপনার লাশ ফেলাটা ঠিক হত না। ঘরের মধ্যে রক্ত ছড়াতেও চাইনি। এবার তৈরি হতে পারেন।
আমার অপরাধ। তৈরি হয়েই বললে গজানন। তবে সে তৈরিটা কী ধরনের, আমিনুল যদি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারত…
কুকর্মের সঙ্গী রাখতে নেই, জানেন তো?
ভালো করেই জানি। আমিও একা অপারেট করি।
এবার একাই বেহেস্তে যান। জাহান্নমেও যেতে পারেন।
আমার অপরাধ?
মমতাজকে ধর্ষণ এবং হত্যা।
মিথ্যে কথা।
হেরোইন স্মাগলিংয়ে আপনিও অংশীদার। কিংয়ের ঠিকানা জেনেই আপনি এসেছেন—
মিথ্যে কথা।
মমতাজও সে ঠিকানা জানত বলে আপনি তাকে খুন করেছেন।
এবার এক সেকেন্ড বিরতি দিয়ে প্রশ্ন করল গজানন–মমতাজ জানত ঠিকানাটা?
আলবত জানত।
আপনিই তাকে ধর্ষণ করেছেন এবং খুন করেছেন–পেট থেকে ঠিকানাটা জেনে নিয়েই–
এতগুলো কথা লিখতে যতটা সময় গেল, তার চাইতে অনেক কম সময়ে ঘটে গেল অনেকগুলো ঘটনা।
আচমকা ছোট্ট ব্রেক কষল গজানন। আমিনুলের রিভলভারের নলচে ঠেকানো ছিল তার মাথার পেছনে। সামান্য হুমড়ি খেল আমিনুল। নলচে সরে গেল লক্ষ্য থেকে। গজানন এক হাত দিয়ে রিভলভারসুদ্ধ কবজি চেপে ধরল অমানুষিক শক্তি দিয়ে (মাথায় চোট বৃথা যায়নি)–আর এক হাত দিয়ে সিটের তলা থেকে পয়েন্ট থ্রি এইট বের করে সটান গুলি করল আমিনুলের রগ লক্ষ্য করে।
স্টিয়ারিং হুইল ছাড়া গাড়ি তখন এলোমেলোভাবে ছুটছে, পথ থেকে নেমে পড়ছে। একটা গাছের গুঁড়িতে ধাক্কা মেরে উলটে গেছে।
হাঁচোড়-পাঁচোড় করে জিরো জিরো বেরিয়ে এল ভাঙা দরজার প্রচণ্ড লাথি কষিয়ে। ভাঙা কাঁচে কপাল কেটে রক্ত পড়ছে। স্টিয়ারিং হুইল বুকে চেপে বসে পাঁজরা গুঁড়িয়ে দেয়নি, এই রক্ষে।
কাঁচ করে একটা গাড়ি ব্রেক কষল পাশে।
থাক, থাক, রিভলভার আর লুকোতে হবে না! এই তো মুরোদ! আমি না থাকলে এতটা পথ যেতে কী করে! নাও, উঠে বসো।
পুঁতিবালা! ডিসিপ্লিন ব্রেক করেছিস। কে তোকে এখানে আসতে বলেছে? তোর চাকরি আর নেই।
