নেশা জড়ানো চোখ নয়। বেশ হুঁশিয়ার। কর্তব্যেনিরত নিঃসন্দেহে।
গেলাসটা চোখের সামনে তুলে ধরে মদিরার ফিকে হলুদ রংটা দেখতে-দেখতে যেন আপনমনেই বলে পুঁতিবালা–আমার নাম রাজিয়া সুলতানা। আজ এসেছি। তিনশো দু-নম্বর ঘর। একা। সঙ্গ পেলে বাঁচি।
যাচ্ছি, বলে গেলাসটা এক চুমুকে শেষ করে দিল পুলিশ অফিসার। খর নজর কিন্তু পুঁতিবালার ওপর।–আমার নাম আমিনুল হক। ডি আই জি। চলুন।
এক চুমুকে গেলাস শেষ করে দিয়ে কাউন্টারে রুম নাম্বারটা বলে দিল পুঁতিবালা। পেমেন্ট হবে বিলে। বডি খেলানোর সুযোগটাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর উদগ্র অভিপ্রায় নিয়ে অগ্রসর হল দরজার দিকে।
ছোট্ট কোর্টশিপ। পাঠক-পাঠিকারা ক্ষমা করবেন। পুঁতিবালার মতো মেয়েরা এসব মামুলি ব্যাপারে নাহক সময় খরচ করতে রাজি নয়।
.
পরের দিন ডি আই জি আমিনুল হকের সামনে এসে বসল গ্রেট গজানন।
বলল–আমিই ফোন করেছিলাম আপনাকে। আমার মানিব্যাগ চুরি গেছে কাল রাতে।
গম্ভীর গলায় বললে, ব্রোঞ্জ মূর্তি–হোটেল অফিস থেকেও কমপ্লেন এসেছে। কিন্তু আপনি হোটেলের পেছনে গেছিলেন কেন?
ব্যক্তিগত ব্যাপার।
মৃদু কঠিন হাসল, ব্রোঞ্জ মূর্তি–তাহলে আপনার মানিব্যাগ খোয়া যাওয়ার ব্যাপারটাকেও ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে ধরতে পারেন। সরি, আপনি আসতে পারেন।
গ্রেট গজাননের মাথায় চড়াত করে রক্ত উঠে গেল কথাটা শুনেই। তারপরের কথাটা শুনেই কিন্তু রক্ত নেমে গেল মুখ থেকে।
কেটে-কেটে বললে, ব্রোঞ্জ মূর্তি–জিরো জিরো গজানন, ছেষট্টি পাউন্ডের অর্ধেক যদি আমাকে দিয়ে যান, তাহলে আপনাকে হেল্প করতে পারি।
কিছুক্ষণ সব চুপ। চোখে-চোখে চেয়ে দুই বড় খেলোয়াড়।
তারপর আশ্চর্য শান্তগলায় বললে গজানন—
সব জানেন?
জানাটাই আমার কাজ।
কিঙয়ের ঠিকানা?
এখনও জানি না। তবে জানতে পারব। আপনার পেছনে লেগে থাকলেই জানতে পারব। কেননা, কিঙ আপনার পেছনে লেগেছে।
এত তাড়াতাড়ি?
তাই তার নাম কিঙ। আপনার নিস্তার নেই, গ্রেট গজানন। মরবেনই। হয় তার হাতে, আর না হয়–একটু থেমে খুব আলতোভাবে–আমার হাতে।
চেয়ে রইল গজানন। সর্ষের মধ্যেই ভূত থাকে–সুতরাং তার চোখের পাতা কাঁপল না।
বললে, ছেষট্টি পাউন্ডের অর্ধেক দেব না। দশ পাউন্ড বড় জোর।
তেত্রিশ পাউন্ড।
না। তাহলে আগে পুঁতিবালার নাচ দেখবার জন্যে তৈরি হোন।
পুঁতিবালা। এবার কিন্তু আর চমকানি আটকাতে পারে না গজানন–সে কোথায়?
এখন বলা যাবে না। তেত্রিশ পাউন্ড।
বিশ পাউন্ড।
তেত্রিশ পাউন্ড।
ও-কে, ও-কে। রাজি। পুঁতিবালা কোথায়?
এখন বলা যাবে না।
কিঙ কোথায়?
আগে বলুন হোটেলের পেছনে কেন গেছিলেন?
এক মহিলার আমন্ত্রণে।
কী নাম তার? কীরকম দেখতে?
খুব কালো। দারুণ স্মার্ট। বিউটিফুল ফিগার। হেরোইনের নেশা আছে। তাই তার সঙ্গ ধরেছিলাম।
খুব কালো! দারুণ স্মার্ট। বিউটিফুল ফিগার! হেরোইনের নেশা আছে! নাম কী বলেছিল?
মমতাজ সিরাজ!
বিসমিল্লা।
চেনেন?
আপনি যে হোটেলে উঠেছেন, তার মালিকের বেগম।
জয় মা কালী!
গ্রেট গজানন।
জিরো জিরো গজানন।
ইয়েস, ইয়েস, আপনি আজ রাতে আবার গেমরুমে যাবেন?
সে কি আর আসবে?
দেখা যাক।
তা এল বইকী মমতাজ। স্বপ্নিল চোখে হেরোইনের আভাস ফুটিয়ে সে আবার আমন্ত্রণ করল গজাননকে। গতরাতের ঘটনা প্রসঙ্গে শুধু বললে, ভয়ে পালিয়ে গেছিলাম, মিঃ ওয়ান্ডারম্যান!
অন্ধকারের উৎপাতদের আমার বড় ভয়।
কাজেই মমতাজের গাড়ি চেপে গজানন গেল শহর থেকে দূরে নিরালা একতলা বাড়িটায়।
পুঁতিবালা তখন কোথায়?
ফাইভ স্টার হোটেলে অন্তত নেই। ব্রোঞ্জ মূর্তি যখন একটু ঘুমিয়ে ছিল, তখন ঘুমের ঘোরে সে উচ্চারণ করেছিল শুধু একটি কথা–পুঁতিবালা, মার্ভেলাস!
ব্যস, ভোর হতেই বিদেয় হল পুলিশ অফিসার। তারপর হাওয়া হয়ে গেল পুঁতিবালা।
.
হে পাঠক! হে পাঠিকা! আসুন এবার গজাননের পেছনে। দেখুন তার আজব কীর্তি।
মমতাজ গাড়ি চালায় ভালো। বাংলাদেশে বিলিতি গাড়ির ছড়াছড়ি এখন। মমতাজের গাড়ি নির্মিত জাপান দেশে। টয়োটা।
দরজা খুলে প্রথমে গজানন উঠেছিল ভেতরে। উঠেই দেখে নিয়েছিল সিটের তলায় খাঁজের মধ্যে, পয়েন্ট থ্রি এইট স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন রিভলভারটা গোঁজা আছে কিনা।
আছে। নিশ্চিন্ত হয়েছিল গজানন। এ কাজটা তাকে করতে হয়েছে মমতাজের অজান্তে। গেমরুমে রিভলভার নিয়ে ঢোকা অনুচিত। ধরা পড়ে যেতে পারে। তাই টয়লেটে ঘুরে আসার নাম করে সটান গেছিল নিজের ঘরে। রিভলভারটা নিয়েই দৌড়ে গেছিল হোটেলের পেছন দিকে– যেখানে আছে মমতাজের গাড়ি। গাড়িটা কী ধরনের গত রাতেই তা দেখে রেখেছিল গ্রেট গজানন। দরজায় চাবি লাগানোর অভ্যেস নেই মমতাজের, তাও লক্ষ করেছিল চকিতে। দুই আততায়ী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সঙ্গে-সঙ্গে মমতাজ ছুটে গিয়ে এক ঝটকায় দরজা খুলে উঠে বসেছিল সিটে–সবই দেখেছে জিরো জিরো। তাই রিভলভার লুকিয়ে রাখার প্ল্যানটা আগে থেকেই রেখেছিল মগজের মধ্যে।
নিজে যে সিটে বসবে এখুনি, সেই সিটের তলায় রিভলভার আর কিছু বাড়তি বুলেট রেখে অন্ধকারেই ফের মিশে গেছিল গজানন। ফিরে এসেছিল গেমরুমে।
তারপর সেই একই কথার চর্বিতচর্বণ। একই কথার ছেনালিপনা। একই কথা নিয়ে ঢলাঢলি। উস্কে দিয়েছে গজানন এবারে। মমতাজ সে রাতে ডিপ ব্লু শাড়ি পরেছে। খুবই মিহি শাড়ি। অত্যন্ত হালকা। তার আশ্চর্য কালো তনু ঘিরে গাঢ় নীল বসন আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে যৌনতাকে। হেরোইন সেবন কি আজ মাত্রা ছাড়িয়েছে? যেন একটু বেশি বকছে মমতাজ। একটু যেন বেশি প্রগলভা। ক্ষণে-ক্ষণে গজাননের গায়ে গা দিচ্ছে, গালে গাল ঠেকাচ্ছে, চোখের সঙ্কুচিত তারা কাম টু-দ্য-বেড় আমন্ত্রণ জানিয়ে চলেছে।
