কিন্তু এই রূপসিটির অধরে, ললাটে, নয়নে, গ্রীবায় এবং সেখান থেকে পদযুগল পর্যন্ত প্রদেশগুলিতে এমন-এমন সব পেলব সৌন্দর্য আছে যা অচল মনকেও সচল করে দিতে পারে!
একদা মানসিক ক্লিনিকবাসী গজাননেরও ব্রেনের কোষগুলো অদ্ভুতভাবে সচল হয়ে ওঠে।
দরজার সামনে টুলে বসেছিল হোটেলের লোক। সাধারণ কর্মচারী নয়। লড়াকু চেহারা। চুল এত ছোট করে কাটা যে মুঠো করে ধরা সম্ভব নয়। চোখ দুটি মার্বেলগুলির মতো গোল-গোল। গায়ে সিকি ছটাক চর্বিও নেই। জামাটা মোটা কাপড়ের অনেকটা ফতুয়ার মতো দেখতে, প্যান্টটা তো পাছা কামড়ে রয়েছে।
ঠোঁট ফাঁক করে অত্যন্ত অমায়িক হাসি হেসে-হেসে গজাননের পর্যবেক্ষণ পর্ব অবলোকন করছিল লোকটা। হাসিটাকে অনেক ট্রেনিং দিয়ে অমায়িক করবার চেষ্টা করেও পারছিল না। মনে হচ্ছিল যেন একটা হিংস্র হায়না দাঁত খিঁচিয়ে আছে।
গজাননের পর্যবেক্ষণ পর্ব প্রলম্বিত হচ্ছে দেখে সে টুল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
বললে, ভেতরে যাবেন?
চমকে ওঠাটাকে বিউটিফুলি ম্যানেজ করে নিল গজানন। আদি জেমস বন্ড মানে সীন কোনারির চার্মিং হাসি হাসল।
বললে–অফ কোর্স।
আমি সিকিউরিটি স্টাফ। আপনাকে নতুন দেখছি, সার্চ করব।
হোয়া-ট!
অবিচল কণ্ঠ সিকিউরিটি স্টাফের নিয়মিত এলে আর করব না। ঝুঁকি নিতে চাই না। অনেক ধরনের লোক তো এখানে আসে।
অনেক ধরনের লোক এখানে আসে! এবং এই জন্যেই তো গজাননের আবির্ভাব এই নির্বান্ধব পুরীতে। পাঁচতারা হোটেলের গেমরুমে লাখ টাকার খেলা দেখাতে যারা আসে, তাদের লাখ টাকা সাদাপথে আসে না কখনওই। কালোপথে পাথর পথিকদের পেট থেকেই তো খবর পাওয়া যাবে কিঙ মহাপ্রভুর।
বুক চিতিয়ে বললে বেলেঘাট্টাই মস্তান (প্রাক্তন)–ও ইয়েস। ভাগ্যিস, রিভলভার আনেনি। সঙ্গে!
দরজা খুলে ধরল গাঁট্টাগোট্টা লোকটা। ছোট্ট একটা চেম্বার। তার পরের দরজাটা খুললে গেমরুমে ঢোকা যায়। পৃথিবীর সবরকম কান ফাটানো শব্দ বোধহয় সেখানে মিশেছে। ছোট্ট চেম্বারে তার রেশ ভেসে আসছে গুমগুম করে।
কম্যান্ডোর চাকরি করত নাকি কদমছাঁট এই মর্কটটা? দ্রুত হাত বুলিয়ে গেল গজাননের সর্বাঙ্গে। বাহুমূল, ঊরুসন্ধি কিছু বাদ গেল না।
কপট অমায়িক হেসে বললে, যান। খুলে ধরল দরজা গেমরুমের।
কান ঝালাপালা আওয়াজে প্রথমটা মাথা ধাঁধিয়ে গেল গজাননের। কীরকম যেন সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে মনে হল। তারপরেই তেড়েমেড়ে ঢুকে পড়ল ভেতরে।
বোরখাপরা পুঁতিবালা দাঁড়িয়েছিল করিডরে। বোরখাটা খুলবে কিনা তাই নিয়ে ভাবছিল। গজাননদার সামনে খোলা মানেই কেলেঙ্কারি। অথচ মন চুলকোচ্ছে বডিখানা কাউকে দেখাতে স্বভাব যায় না মলে।
এসে গেল সেই সুযোগ। গজাননকে গেমরুমে চালান করে দিয়ে করিডরের দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল কদমছাঁট লোকটা।
বোরখার মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললে রুক্ষ কণ্ঠে–ফরমাইয়ে?
দরজাটা খুলুন, কাটকাট কথা পুঁতিবালার।
বোরখা পরে ভেতরে যাওয়া যায় না।
তাই নাকি? তাই নাকি? কেন যাওয়া যায় না শুনতে পারি?
সার্চ করিয়ে যেতে হয়।
তাই বলুন। সার্চ করিয়ে গেলেই হবে। তা করুন না।
বোরখা খুলতে হবে।
তাই নাকি? তাই নাকি? এই খুললাম, বলেই হ্যাঁচকা টানে মাথা গলিয়ে বোরখা খুলে যেন হাওয়ায় উড়িয়ে দিল পুঁতিবালা। দুই হাত দু-পাশে ছড়িয়ে সশব্দে তুড়ি দিয়ে কবজি ঘুরিয়ে বললে সে এক অপরূপ কায়দায়কী সার্চ করবেন, মিঃ সার্চম্যান? কী আছে আমার–এই বডিখানা ছাড়া। বলতে-বলতেই মোক্ষম মোচড় দিল বক্ষ শোভায় মাতাহারি-স্টাইলে।
চোখের মধ্যে আলপিন ফুটিয়ে দিলেও বোধহয় এত তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করত না দ্বাররক্ষক। আঁতকে উঠে দরজা খুলে দিয়ে বললে কী হচ্ছে কী খোলা জায়গায়! যান ভেতরে।
বিজয়িনী পুঁতিবালা এক পা দিল ছোট্ট চেম্বারে।
বললে ঘাড় ঘুরিয়ে–-মিঃ সার্চম্যান, সার্চ করবেন কি বন্ধ জায়গায়? আসুন, আসুন, কতক্ষণই বা আর লাগবে।
ভেতরের দরজা খোলার জন্যে বেগে ছোট্ট চেম্বারে প্রবেশ করতে যাচ্ছে কদমছাঁট–গায়ে গা ঘষটে যেতেই এককালের বাজারি মেয়ে পুঁতিবালা দেখিয়ে দিল তার ফর্মটা।
ঝাঁ করে জাপটে ধরল বেঁটে লোকটাকে। সশব্দে চুম্বন করল ঠিক ঠোঁটের ওপর। সাঁৎ করে বেরিয়ে গেল বাইরে। করিডর থেকে বোরখাটা তুলে নিয়েই পরে নিল চোখের পলক ফেলতে ফেলতে। ফিরে এল চেম্বারে। মূহ্যমান কদমছাঁটকে বললে দেবী চৌধুরানির গলায়–খুলুন দরজা।
ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি গোছের শুকনো হাসি হেসে দরজা খুলে ধরল কদমছাঁট। দৃপ্ত ভঙ্গিমায় পুঁতিবালা ঢুকে গেল ভেতরে।
বোরখার মধ্যে থেকে কিন্তু তার চোখ ঘুরছে মস্ত বড় ঘরটার এদিকে থেকে সেদিকে। জগঝম্প আওয়াজে কানের পরদা ফুটিফাটা হলেও আশ্চর্য হবে না পুঁতিবালা। এ কী পাগলের কারখানা রে বাবা! একদিকে সারি-সারি ভিডিও গেম নিয়ে বিকট বাজনা বাজিয়ে জুয়ো খেলে যাচ্ছে একপাল পুরুষ এবং মহিলা। যত না খেলছে, চেঁচাচ্ছে তার চাইতে বেশি। আর এক পাশে একটা হাঁটু সমান উঁচু মঞ্চে উল্লোল নাচ নাচছে একটি যোড়শী, গেমরুমের সামনের দরজায় আঁকা ছবির সঙ্গে তার মিল আছে শুধু একটি ব্যাপারে…পাঠক-পাঠিকাদের অনুমানের ওপরেই সে ব্যাপারটা ছেড়ে দেওয়া গেল।
মঞ্চের সামনে বেশ কিছু চৌকোনা টেবিল আর প্রতিটা টেবিলের চারদিকে চারখানা চেয়ারে বসে নানা বয়সি পুরুষরা উকট উল্লাসে ফেটে পড়ছে আদিম নৃত্য দেখে ষড়রিপুর প্রথম রিপুকে যা প্রজ্বলন্ত করার পক্ষে যথেষ্ট।
