রাত দশটা। সময় হয়েছে। কয়েকশ গজ চওড়া এই ফাঁকা মাঠ পেরিয়ে এখুনি আসবে কিঙ। মাঠের ওপারে নারকেল গাছগুলোর তলা দিয়ে আবির্ভূত হবে তার মূর্তি।
ঝোপের মধ্যে গুঁড়ি মেরে বসল বিজু সেন।
মিনিট পনেরো পরেই দেখা গেল একটা ছায়ামূর্তিকে। পরনে লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি। হাতে একটা ব্যাগ। হনহন করে মাঠ পেরিয়ে আসছে।
দূরবীন কষতে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসতে হয়েছিল বিজু সেনকে। দুলে উঠেছিল ঝোঁপটা। তারার আলোর ঝিকিমিকিও নিশ্চয় দেখা গেছিল দূরবীনের লেন্সে।
জীবনমরণের খেলায় সামান্য ওই ভুলটুকুই যথেষ্ট।
মাঠের ওপারে কয়েকশ গজ দূরে ঝোঁপের মধ্যে লক্ষ্য স্থির হয়ে গেল শক্তিশালী ম্যাগনান আগ্নেয়াস্ত্রের–টেলিস্কোপিক নাইট-শাইট ফিট করা মারণাস্ত্রের বুলেটটা নিক্ষিপ্ত হল নির্ভুল লক্ষে।
বিজু সেনের টুটি উড়ে গেল। বিশাল গর্ত দিয়ে কলকল করে বেরিয়ে এল রক্ত।
মাঠের মাঝে লুঙ্গি পরা লোকটা চমকে উঠল আওয়াজ শুনে। দশটা টাকা তাকে দেওয়া হয়েছে ব্যাগটাকে মাঠ পার করে দেওয়ার জন্যে। নদীর ধারেই নাকি লোক দাঁড়িয়ে আছে। বর্ডার পেরোলেই…
কিন্তু গুলি ছুঁড়ল কে? কার দিকে?
ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুটতে যাচ্ছে নিরীহ মানুষটা, মারণাস্ত্র থেকে ছুটে এল লক্ষ্যভেদীর আর একটা বুলেট। হৃৎপিণ্ড ছুঁড়ে বেরিয়ে গেল মৃত্যুদূত।
ঝোঁপের মধ্যে থেকে বেরিয়ে গেল হেরোইন কিঙ। বিজু সেন যে ডাবল এজেন্টের কাজ নিয়ে তাকেই নিকেশ করে হেরোইন-সম্রাট হওয়ার স্বপ্ন দেখছে–এখবর পেয়েই জাল পাততে হয়েছিল কিঙকে। টোপ ফেলেছিল অনেক কায়দা করে।
রামভেটকি সুরকিওয়ালা কল্পনাও করতে পারেনি পুরো প্ল্যানটা কিঙ-এরদারোগাও তার হাতের পুতুল। অজান্তে কবর রচনা করে ফেলেছে বিজু সেনের।
.
৩.
গজানন, কী বুঝলে? রামভেটকির প্রশ্নটা টেলিফোনের তারের মধ্যে দিয়ে এসে কিলবিলিয়ে ওঠে গ্রেট গজাননের ব্রেনের মধ্যে।
দাঁতে দাঁত পিষে বাজনা বাজানোর চেষ্টা করল গজানন। দেখে মুখ টিপে হেসে ফেলে পুঁতিবালা। কিড়মিড় আওয়াজের বদলে একটা বিচ্ছিরি আওয়াজ গিয়ে পৌঁছল রামভেটকির কানে।
গজানন, এটা কিসের শব্দ?
আমি রেগেছি।
রেগেছ? জিরো জিরো গজানন রেগেছে। তবে আর কী, কিঙ এবার কঙ হবে।
কিঙ কঙ হবে?…
মানে, কি কঙের যে দশা হয়েছিল, তাই হবে। মানে, পটল তুলবে। তাই তো?
ইয়েস, বস্। গজানন তার মুন্ডু ছিঁড়বে। গেণ্ডুয়া খেলবে। কিন্তু তাকে পাব কোথায়?
সেটাই তোমার কাজ। খুঁজে নিতে হবে।
খুঁজব কোন চুলোয়?
ল্যাঙ্গুয়েজ!…ল্যাঙ্গুয়েজ!..মাই ডিয়ার গজানন, তুমি হলে ভীষণ ভয়ঙ্কর প্রচণ্ড টঙ্কার– ত্রিশূলের বাণ নিয়ে ধ্বংসের মন্ত্র কপচাতে-কপচাতে যাচ্ছ অভুত প্রলয়কে অঙ্কুরে বিনাশ করতে। তোমার মুখে চুলোয় শব্দটা মোটেই খাপ খায় না।
বসো, আমার মাথা ভেঁ-ভো করছে আপনার ল্যাং…ল্যাং..
ল্যাঙ্গুয়েজ শুনে–এই তো? বৎস গজানন, বৎস বললাম বলে ফির ভি রেগে যেও না। তুমি যাচ্ছ সেই খাঁটি বাংলাভাষার দেশে–
আই মীন বাংলাদেশে?
ইয়েস, ইয়েস, মাই বয়, গ্রেট হারামজাদা কিঙ এখন রয়েছে বাংলাদেশে।
হেরোইন নিয়ে আসেনি ইন্ডিয়ায়?
বড্ড হুঁশিয়ার যে! ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেয়েই পিছু হটে গেছে। বিবরে প্রবেশ করেছে।
স্যার, বিবর না কবর–কী বললেন?
ননসেন্স! বেলেঘাটায় থেকে তোমার কালচারটা একদম নষ্ট হয়ে গেছে দেখছি।
এইবার আঁতে ঘা লাগে গজাননের। মাতৃভূমির নিন্দে শুনলে যে কোনও স্বদেশপ্রেমীরই গোঁসা হয়। আমাদের গ্রেট গজাননও বেলেঘাটায় মাটিকে ভালোবাসে।
অতএব সে গর্জে উঠল তৎক্ষণাৎ মিঃ রামভেটকি সুরকিওয়ালা!
ভড়কে গেল রামভেটকি কী..কী হল?
আপনি জানেন, যার আছে অনেক টাকা, সেই থাকে বেলেঘাটা?
তা-আমি তো জানতাম, যার নেই পুঁজিপাটা, সেই থাকে বেলেঘাটা।
ওটা আগেকার কথা। এখন দিন চেঞ্জ হয়েছে। এটাও কি জানেন, যার আছে অনেক টাকা, তার থাকে ইজ্জৎ, কালচার?
তা…হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ, গজানন।
তাহলে কথা ফিরিয়ে নিন। বলুন বেলেঘাটায় থেকে গজাননের কালচার এক্কেবারে ভালচার হয়ে গেছে।
ভা…ভা…ভালচার! কিন্তু ভালচার মানে তো
শকুনি। আমিও তাই। স্পাইরা শকুনি ছাড়া আর কী? অনেক উঁচুতে উড়লেও নজর থাকবে ঠিক ভাগাড়ের দিকে–যেখানে দেখিবে মড়া, ঠোকরাইয়া দ্যাখো তাই।
গজানন, ইউ আর গ্রেট।
আই অ্যাম! আই অ্যাম! গোঁফ নেই, তবু গোঁফে তা দিয়ে নেয় গজানন। কালচারের সঙ্গে ভালচারের মিলটা ফটাং করে মাথায় এসে গেল। সত্যিই, কী রহস্যময় ব্রেন।
পুঁতিবালা পর্যন্ত অবাক হয়ে দেখছে গজাননকে। কী অপূর্ব কালচার! ভালচার না হলে আদর্শ স্পাই তো হওয়া যায় না। মাতাহারির কথা মনে পড়ে যায় পুঁতিবালার। মাতাহারিকে যদিও ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়াতে হয়েছিল। রাইফেলের নলচেগুলো কিন্তু লক্ষ্যস্থির করতে পারেনি। সমানে বুক দুলিয়ে গেছিল মাতাহারি ট্যারা করে ছেড়েছিল রাইফেলধারীদের।
কী দুর্জয় সাহস। মৃত্যু সামনে–অথচ বুক দোলাচ্ছে মাতাহারি। আপন মনেই নিজের পীন পয়োধরা একবার দুলিয়ে নেয় পুঁতিবালা।
পরক্ষণেই মাতাহারির স্বপ্ন টুটে যায় গজাননের আচমকা চিৎকারে, কী বললেন? কিন্তু এখন
টেলিফোনে ভেসে এল কড়া ধমক–গজানন, আর কোনও কথা নয়, শহরটার নাম টেলিফোনেও বলা ঠিক নয়। বড় ক্রশ কানেকশান হচ্ছে আজকাল। কোড ল্যাঙ্গুয়েজে যা বললাম। তা মনে রেখো। ঠিক দু-ঘণ্টা পরে একটা লাল রংয়ের পটিয়াক গাড়ি যাবে বেপারীটোলা লেনে। তোমাকে সটান বর্ডার পার করে ঠিক সেই জায়গাটায় পৌঁছে দেবে। গাড়ি থাকবে তোমার হেপাজতে। বাংলাদেশের ড্রাইভার্স লাইসেন্স করা আছে–তোমার পাশপোর্ট হচ্ছে মহম্মদ হোসনের নামে। ইন্ডিয়ান টুরিস্ট। বুঝেছ?
