ত্রিশূল সেন্ট পারসেন্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। কোটি-কোটি মুদ্রার খেলা চলছে ত্রিশূল এর রক্তচক্ষু অতন্দ্র রাখার জন্যে।
রামভেটকি সুরকিওয়ালা এই ভয়ঙ্কর প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় মাথা। পাঠকপাঠিকারা অনেকেই জানেন, রামভেটকিকে দেখলে মানুষের শাখামৃগ পূর্বপুরুষদের কথা মনে পড়ে, কম্যান্ডো থাকার সময়ে বেমক্কাগুলি খেয়ে সে হাঁপানি রোগে ভোগে এবং এন্তার তাড়ি খায় (হাঁপানির ওষুধ বলে)! প্রতাপে আর ব্যক্তিত্বে, নিষ্ঠুরতায় আর বিচক্ষণতায় সে কিন্তু অদ্বিতীয়।
এহেন রামভেটকির কর্কশ স্বর ধ্বনিত হল গজাননের কর্ণরন্ধ্রে লাল টেলিফোনের রিসিভার কানে লাগাতেই।
জিরো জিরো গজানন?
আই, আই, স্যার, মার্কিন সিনেমা দেখে এই বুকনি সম্প্রতি রপ্ত করেছে গজানন।
হেরোইন মানে নায়িকা নয়…জানা আছে তো?
আই অ্যাম নট সো ফুল, স্যার।
জানি, জানি, গজানন। হেরোইন যে দেশটাকে জাহান্নমে নিয়ে যাচ্ছে, তাও নিশ্চয় জানো।
সেই কথাই হচ্ছিল এতক্ষণ। শম্ভ নায়েক সুইসাইড করেছে।
ওটা সুইসাইড নয়–হোমিসাইড।
মা…মানে?
মার্ডার। হেরোইন স্মাগলারের ঠিকানা বের করার চেষ্টা করেছিল শম্ভ নায়েক, তাই তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হল।
কপালের শিরা ফুলে ওঠে গজাননের নাম কী ব্যাটাচ্ছেলের?
তার আসল নাম কেউ জানে না। হেরোইন কিঙ নামেই তার নাম ডাক নেশারু মহলে।
হেরোইন কিঙ!
ইয়েস, মাই ডিয়ার গজানন—
জিরো জিরো গজানন।
অফকোর্স, অফকোর্স জিরো জিরো গজানন। আমার এক এজেন্ট তার হাতে গতকাল খুন হয়েছে।
আপনার এজেন্ট?
ডাবল এজেন্ট বলতে পারো। হেরোইন কিঙের এজেন্টকে আমারও এজেন্ট বানিয়েছিলাম। কাঁটা দিয়ে কাটা তোলা বলতে পারো। কিন্তু ধুরন্ধর কিঙ তাকে গতকাল শেষ করে দিয়েছে।
কোথায়? কীভাবে?
বাংলাদেশ থেকে বেশ কিছু মাল আসছিল। এই এজেন্টকে ভার দেওয়া হয়েছিল। আর আমি তাকে ভার দিয়েছিলাম, ওই সূত্র ধরে কিঙকে কাত করতে। কিন্তু..
.
কিন্তু ব্যাপারটা হয়েছিল অন্যরকম। রামভেটকি সুরকিওয়ালা নিজেও তা জানে না।
বিজু সেন নমাসে ছমাসে একবার ফিল্ডে নামে, মানে মাল পাচার করে। মোটা মুনাফা লুটে হাওয়া হয়ে যায় মাস কয়েকের জন্যে। শিলং থেকে গোঁয়ার নানান খানদানি হোটেলে তাকে দেখা যায় বিভিন্ন বিউটির সঙ্গে, দামি সুরা আর দামি গাড়ি নিয়ে মেতে থাকে মাসের পর মাস।
সে একা। একেবারে একা। প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার আসরে সঙ্গী নেওয়া বিপজ্জনক। তাই সে একা।
মাথায় সে খুব লম্বা নয়, খুব বেঁটেও নয়। কিন্তু পেটাই চেহারা। নাক-মুখ-চিবুকের গড়ন দেখে মনে হয় বুঝি মার্কিন মুলুকে তার জন্ম। বিশেষ করে তার টকটকে গায়ের রং আর কোবাল্ট ব্লু চোখ দেখে ভুল করে অনেকেই।
বিদেশিনী মা আর ভারতীয় বাবার মিশ্র শোণিত ধমনীতে ধারণ করেই সে ভূমিষ্ঠ হয়েছে। তাই তার চেহারায় সাগরপারের ছাপ এত বেশি।
চরিত্র? অতীব নিষ্ঠুর। টাকা ছাড়া সে আর কিছু বোঝে না। এই দুনিয়ায় টাকা থাকলেই সব থাকে–নইলে সব ফক্কা। নিকষ এই তত্ত্ব এবং জীবনদর্শন বিজু সেনকে অমানুষ করে তুলেছে। কৈশোর থেকেই।
ইছামতী নদীর ধারে এই বিজু সেনকেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছিল গত রাতে–এ কাহিনি যখন শুরু হচ্ছে, ঠিক তার আগের রাতে।
নদীর ওপারে বসিরহাটের আলো দেখা যাচ্ছে। টর্চের নিশানা করতে হবে এপার থেকে। নৌকো চলে আসবে তক্ষুনি। তিরিশ কিলো সাদা গুঁড়ো নিয়ে সেই নৌকোয় চেপে বসবে বিজু সেন।
তিরিশ কিলো! ছেষট্টি পাউন্ড। খাঁটি সাদা গুঁড়ো। হেরোইন। পলিথিন প্যাকেটে মোড়া রিফাইনড হেরোইন। প্রায় ষোলো কোটি টাকার মাল। খুচরো বাজারে গেলে দশগুণ দাম।
জীবনে এত টাকার মাল পাচারে নামেনি বিজু সেন। চার মাস ঘাপটি মেরে থেকেছে সে। এইরকম মোটা একটা দাঁও পেটার জন্যে। ছেষট্টি পাউন্ড হেরোইন পাচারই অবশ্য তার মূল লক্ষ্য নয়।
বিজু সেন খুন করতে চায় হেরোইন কিঙ-কে। স্মাগলার নৃপতিকে স্বহস্তে নিধন করে সে নিজেই রাজ সিংহাসন দখল করতে চায়। চার মাস ধরে সেই প্রস্তুতিই চালিয়ে এসেছে সে।
আকাঙ্ক্ষা তার আকাশচুম্বী–স্বপ্ন ছুঁয়ে যায় স্বর্গকে। হেরোইন কিঙ-এর অনেক মাল সে পাচার করেছে, লুটেছে অনেক টাকা, জেনেছে অনেক গলিঘুজির খবর–হেরোইন আমদানির কারবারে যা নিতান্তই দরকার।
এবার তাই সরে যেতে হবে স্বয়ং রাজামশায়কে। রাতের অন্ধকারে নীলকান্তমণির মতো জ্বলছে বিজু সেনের কোব্যাণ্ট ব্লু নয়নযুগল। বুকে ঝুলছে হাইপাওয়ার বাইনোকুলার। ইনফ্রারেড লেন্স লাগানো দূরবীন। যাতে রাতের অন্ধকারেও হাজার গজ দূর থেকে সামান্যতম নড়াচড়াও চোখ না এড়ায়।
ঢিলে শার্টের তলায় বগলের ফাঁকে চামড়ার ফিতেতে ঝুলছে পয়েন্ট থ্রি এইট ক্যালিবারের রিভলভার। হয়তো দরকার হবে না। বিপদ এলে অস্ত্র চালানোরও সুযোগ মিলবে না। রাইফেল
আনেনি সেই কারণেই…
হিপ পকেটের টর্চটাই কাজে লাগাবে নৃপতি-নিধনের পর। ইস্পাতকঠিন ঠোঁট বেঁকিয়ে মৃদু হাসে বিজু সেন।
ধুরন্ধর কিঙ কিন্তু একাজের ভার তাকে দেয়নি। মজাটা এইখানেই। ছেষট্টি পাউন্ড হেরোইন পাচার হবে বাংলাদেশের বর্ডারের ওপর দিয়ে
এ খবরটা তাকে দিয়েছে একজন পুলিশ দারোগা।
বিজু সেনের অন্তরে তাই সামান্য সংশয় আছে বইকী। দারোগা যে খবর জানে–সে খবর নিশ্চয় আরও অনেকে জেনে বসে আছে। কিঙ বরাবর কাজ করে নিখুঁতভাবে–এবারে বিজু সেনকেও সে জানায়নি। কিন্তু জেনেছে দারোগা।
