শূন্যপথে ধেয়ে গেল অনিমার পেটাই শরীর। দু-পায়ের মধ্যে রিভলভারটা মুঠো থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অবতীর্ণ হল খাটের ওপাশে, পরমুহূর্তেই পায়ের ফাঁক থেকে রিভলভার তুলে নিয়ে বিনা দ্বিধায় পরপর গুলি করে গেল সমসের, পঞ্চানন আর রূপকুমারকে। হতভম্ব তিনজনেরই খুলি গেল উড়ে, নিষ্প্রাণ দেহগুলো লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে।
লুটিয়ে পড়ার আগেই অবশ্য তড়িৎ গতিতে শয্যা থেকে উঠে পড়েছে গজানন। একটি মাত্র হনুমান লম্ফ দিয়ে গিয়ে পড়েছে ম্যাডামের ওপর। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শূন্যপথে উড়ন্ত মানবী, গুলিবর্ষণ এবং হনুমান লম্ফ দেখে জলহস্তিনী ম্যাডাম ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছিল। হাত থেকে সিরিঞ্জটা কেড়ে নিয়ে পাট করে বাহুমূলে বিঁধিয়ে দিল গজানন।
বললে আকৰ্ণ হেসে-ঘুম, ঘুম, টানা ঘুম এবার। ম্যাডাম, চোখ মেললেই দেখতে পাবে খাঁচাঘর। গুড নাইট।
ঘুমিয়ে পড়ল ম্যাডাম।
তারপর?
গোপন সে কাহিনি এখানে লেখা যাবে না।
* ঘরোয়া পত্রিকায় প্রকাশিত। (শারদীয় সংখ্যা)
জিরো জিরো গজানন রেগেছে
বেপারীটোলা লেনের এয়ারকন্ডিশনড চেম্বারে বসে দৈনিক হযবরল কাগজের একটা খবর পড়েই সোজা হয়ে বসল গজানন।
পুঁতিবালা।
নিস্তব্ধ ঘরে আচমকা বাজখাঁই ডাক শুনেই চমকে উঠল বেচারা পুঁতিবালা। হাতে কোনও কাজকর্ম নেই। কাত হয়ে বসে তাই আদিরসাত্মক ছবির বই দেখছিল, এমন সময়ে ব্রেনের ওপর এক ধাক্কা।
হাত থেকে বইটা ছিটকে পড়ল মেঝেতে।
সটান হয়ে বসে থাকা গজাননের চোখ গিয়ে পড়ল মলাটে।
চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। সেকেন্ড কয়েক চেয়ে থেকেই যেন সভয়ে চোখ বন্ধ করল গ্রেট স্পাই।
বলল বজ্রগর্জনে, বইটা মুড়ে রাখ।
চোখ মুদেই বললে কিছুক্ষণ পরে–রেখেছিস?
ভেসে এল পুঁতিবালার করুণ স্বর–হ্যাঁ।
চোখ খুলল গজানন। চোখে রক্তের ছিটে। প্রমাদ গুণল পুঁতিবালা। পুঁতি, আবার ওইসব ছাইপাঁশ দেখছিস?
সময় কাটছিল না।–
ড্যাম ইওর সময়। গোল্লায় যাচ্ছে দেশটা…গোল্লায়! একদল ছেলেমেয়ে হেরোইন খেয়ে মরছে–আর একদল পর্নোগ্রাফি নিয়ে মাতছে। ছ্যাঃ…ছ্যাঃ…ছ্যাঃ!
শরমে মরে গেল পুঁতিবালা। যৌবনের পাখা যখন ফুরুক-ফুরুক করে সবে বেরোতে আরম্ভ করেছে, তখন অভাবের জ্বালায় সেই যে স্বভাবটা নষ্ট করে ফেলেছিল, এখনও তার ছিটেফেঁটা রয়ে গেছে ভেতরে-ভেতরে। চড়া দুনিয়া আর কড়া গজাননদাকে লুকিয়ে মাঝেমধ্যে একটু-আধটু এদিক-ওদিক করে ফ্যালেকিন্তু এরকম হাতেনাতে ধরা পড়েনি কখনও।
পুঁতিবালার লজ্জারাঙা অবনত নয়ন মুখখানার দিকে চেয়ে মায়া হল গজাননের। অমনি জল হয়ে গেল চিড়বিড়ে রাগটা।
হযবরল কাগজটা পুঁতিবালার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে গলার স্বর নামিয়ে বললে গ্রেট গজানন– পাপিষ্ঠা। খবরের কাগজ না পড়লে স্পাইগিরি করা যায় না কতবার আর বলব?
পাপিষ্ঠা গালাগালটা গজাননের নরম মুডের গালাগাল। বুকের ধড়ফড়ানিটা একটু কমল পুঁতিবালার। একে তো ওই বাবরি চুল আঁকাল বটগাছ বললেই চলে–তারপর কটমট চাউনিতে যদি রক্তের ছিটে দেখা যায় হৃৎপিণ্ডটা মনে হয় যেন সাঁৎ করে তলপেটেই গেল নেমে। মা দুর্গার অসুরকে দেখেও এত ভয় হয় না।
চোখ তুলে মিঠে সুন্দরী পুঁতিবালা প্রথমে দেখল ছুঁড়ে ফেলে-দেওয়া কাগজটার দিকে। তারপর আড়চোখে দেখে নিল গজাননের চোখ দুটো।
না। রক্তের ছিটে নেই, চোখও আর পাকানো অবস্থায় নেই।
ধাতস্থ হয়ে কাগজটা তুলে নিল পুঁতিবালা।
কাষ্ঠ হেসে বললে, কোন পৃষ্ঠায়? কত নম্বর কলমে?
এঃ! বিদ্যে জাহির করা হচ্ছে আবার! দে, দে, দেখিয়ে দিচ্ছি। কাগজ হাতে উঠে গেল পুঁতিবালা লীলায়িত ভঙ্গিমায়–দেখেই আবার খেঁকিয়ে ওঠে গজানন–এটা কি নাট্যশালা? আঁ? বৈজয়ন্তীমালার নাচ হচ্ছে নাকি?
ফিক করে এবার হাসল পুঁতিবালা। লিপস্টিক রাঙানো পাতলা ঠোঁট জোড়ার তলায় যেন লাইনবন্দি কমল হিরে ঝিলমিলিয়ে উঠল।
বলল, মাগো! কী ব্যাকওয়ার্ড! বৈজয়ন্তীমালা এখন আর নাচে না–রিটায়ার করেছে। এম পি হয়েছে জানো না?
হয়েছে নাকি? ঢোক গেলে গ্রেট গজানন। স্পাই বিজনেসে এসে ইস্তক সিনেমা-টিনেমাগুলোও রেগুলার দেখা হচ্ছে না। দেখলেই তো সময় নষ্ট। দেওয়ালের পোস্টারটা এক ঝলক দেখেও নিল। বড়-বড় হরফে সেখানে লেখা আছেটাইম ইজ মানি। সময়ই হল গিয়ে টাকা।
কই? কোন খবরটা গজানো?
চমকে ওঠে গজানন–এই তো এইটা!
খবরটা পড়ল পুঁতিবালা। সঙ্গে-সঙ্গে কালো কালো চোখ দুটো কীরকম যেন হয়ে গেল। বললে অস্ফুট গলায়, শম্ভ নায়েক মানে সেদিন যে এসেছিল?
হ্যাঁ। সেই শম্ভ নায়েক। হেরোইন নেশার টাকা জুগোতে-জুগোতে যে ফতুর হয়েছিল–
আত্মহত্যা করার আগে হিরোইন স্মাগলার যেন ধরা পড়ে তোমাকে কাকুতিমিনতি করে বলে গেছিল।
সেই শম্ভ নায়েকই ফট করে আত্মহত্যা করে বসল।
অথচ হিরোইন স্মাগলার ধরা পড়ল না।
পুঁতিবালার ফুটুনি স্তব্ধ হতে না হতেই বাজল লাল টেলিফোন। অর্থাৎ কল এসেছে ত্রিশূল দপ্তর থেকে।
.
২.
গজাননের কীর্তিকলাপ যাঁরা এর আগে পড়েছেন, তাঁরা জানেন ত্রিশূল কী জিনিস। শিবের হাতে যে অস্ত্রটি দেখা যায়, এ সে বস্তু নয়, যদিও মহিমায় শিবের হাতিয়ারের সমান যায়।
আজ্ঞে হ্যাঁ, এই সেই গুপ্ত সংস্থা ভারতের স্বার্থরক্ষায় যার জন্ম, ভারতের মানুষ, ভারতের মাটি, ভারতের গৌরব অক্ষুণ্ণ রাখার জন্যে যার দাপটে বহু বিদেশি গুপ্তচর সংস্থারও ঘিলু নড়ে উঠেছে বিলক্ষণ।
