ম্যাডামের চোখ আবার ছোট হয়ে এসেছে। ভিজে লাল ঠোঁটের ফাঁকে সাদা দাঁত দেখা যাচ্ছে–সবাই তাই বলে, গজানন। তারপর ন্যাতা হয়ে পড়ে থাকে আমার কাছে। বিরাট পাঁজর খালি করা দীর্ঘশ্বাসে যেন ভেঙে খানখান হয়ে যায় ম্যাডাম,–বেচারারা!
অবাক হয় গজানন। একই গলায় কতরকমই আওয়াজ শোনা গেল এইটুকু সময়ের মধ্যে। একটু আগেই কদর্য হাসি আর কর্কশ হুমকি। আবার এখন তা মখমল কোমল, কবোষ্ণ, স্নেহময়।
রূপকুমার আর সমসের মিটিমিটি হাসছে গজাননের দিকে চেয়ে। অনিমার চোখের পাতা পড়ছে না। চর্বির পাহাড় দুলিয়ে অনামিকা নাড়িয়ে বলছে ম্যাডাম–গজানন, কী চাও। মেয়েমানুষ
মদ? ক্ষমতা না টাকা? খারাপ চাও তো, তাও পাবে। সব ব্যাপারেই সাহায্য পাবে আমার। মনের গোপনে লুকিয়ে থাকা স্বপ্নগুলোকে যদি ভোগ করতে চাও
কিছু চাই না। যা বলবার বলেছি, বলেই ঘুরে দাঁড়ায় গজানন। পা বাড়ায় সদরের দিকে। কিন্তু রূপকুমার আর সমসের তো সেখানে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভোলা দরজা দিয়ে আরও এক মস্তান চেহারার মাসলম্যান এসে লোলুপ চোখে তাকিয়ে রয়েছে গজাননের দিকে। যেন কতদিন পেটাই-কর্ম হয়নি। হাত নিশপিশ করছে। সারা মুখে বসন্তর ক্ষত, চোখ দুটো কটা আর বাঘের চোখের মতো পাশবিক।
পেছন থেকে ভেসে আসে ম্যাডামের মোলায়েম হাসি-উচ্ছল স্বর।
গজানন, জানি না কেন তোমাকে দেখেই আমার ভালো লেগে গেছে। নিশ্চয় একটা-না একটা দুর্বলতা তোমার ভেতরেও আছে। যদি না-ও থাকে, বানিয়ে দেব আমি। রূপকুমার, বেরোতে দিও না।
রাইট, ম্যাডাম, এগিয়ে আসে তিন চক্রী এক সাথে।
গজানন এখন কী করবে?
.
ছুঁচের মহিমা
ছোট্ট ঘরটায় শুইয়ে ফেলা হয়েছে গজাননকে। পাশবিক হাসি হাসতে হাসতে বসন্ত ক্ষতআকীর্ণ লোকটা চেপে রয়েছে ওর দুটো হাত। রূপকুমার ধরেছে দুটো পা। মাথাটা ঠুসে ধরেছে সমসের। গজানন নিরুপায়। চোখের কোণ দিয়ে দেখল, টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে একটা অ্যাম্পুল থেকে হাইপোডারমিক সিরিঞ্জে ওষুধ টেনে নিচ্ছে ম্যাডাম।
গর্জে ওঠে গজানন–এই মুরোদ! হিপনোটিজমের ক্ষমতা নেই, আরক দিয়ে ঘুম পাড়াতে চান?
জলহস্তীকে কখনও হাসতে দেখা যায় শব্দ না করে? না। পশুরা হাসতে পারে না। কিন্তু মানুষ পারে। ম্যাডামের মুখে এখন যে হাসিটা দেখা গেল, তা জলহস্তীরা দেখলে তাজ্জব হয়ে যেত।
বৎস গজানন, তোমার মতো কুঁচো চিংড়িকে আমার পুরো মুরোদটা দেখাতে চাই না, তাই এই ইঞ্জেকশন। ঠান্ডা মেরে আনবে, বড় ক্ষতি হবে না।
বড় ক্ষতি মানে?
অব্যাহত রইল জলহস্তী হাসি মানে, তোমার ইচ্ছেটাকে জোর করে যদি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিই–তা হলে, তা হলে পাগল হয়ে যাবে, গজানন। আমি চাই তোমাকে আমার গোলাম, আমার প্রেমিক, আমার পুত্র বানিয়ে রাখতে। নানাভাবে তোমার ওই মজবুত শরীরটাকে চাই কাজে লাগাতে।
শয়তানী! তুই-ই তাহলে জোয়ারদারকে পাগল করেছিস?
বেশি জেনে ফেলেছ, গজানন।
তুই পারিস আমাকে জাতিস্মর করে তুলতে?
চমকে উঠল ম্যাডাম। চমকে উঠেছে সমসেরও। হাত শিথিল হয়ে গেছে। গজানন ঘাড় বেঁকাতে পারছে। গনগনে চোখে ম্যাডাম চেয়ে আছে তার দিকে।
গজানন, জাতিস্মর হতে চাস?
হ্যাঁ, চাই।
কিন্তু কীভাবে জানলি আমার সে ক্ষমতা আছে?
আছে না কচু। আমেরিকায় গিয়ে পঞ্চাশ হাজার ডলার খরচ করলেই ব্রেনের নহাজার কোটি নিষ্ক্রিয় নিউরোণকে সক্রিয় করতে গিয়ে হয়তো মনের শক্তি একটু বেড়ে গেছে। পূর্বজন্মের স্মৃতি ফিরিয়ে আনা অত সোজা নয়। পারে শুধু মুনি-ঋষিরা।
গজানন!
চোপরাও মাগী! গজানন এবার ফ্রি ল্যাংগুয়েজ ছাড়তে থাকে–আমেরিকায় কোটিপতিদের টাকা খেয়ে ইন্ডিয়ার লাখোপতি কোটিপতিদের খতম করে চলেছিস একে-একে। তোর মুখে থুথু দিতে ইচ্ছে যাচ্ছে।
তাই নাকি? তাই নাকি? টকটকে লাল হয়ে ওঠে ম্যাডামের মুখমণ্ডল সমসের! রূপকুমার। পঞ্চানন! কিল হিম! কিল হিম! খুব বেশি জেনে গেছে! অ্যাট ওয়ান্স!
.
ত্রিশূল
অন্য ঘরে খাবার টেবিলে বসেছিল অনিমা। ছুরি কাঁটাচামচের দিকে চেয়ে রয়েছে নির্নিমেষে। পুতুলের মতো হাত বাড়িয়ে তুলে নিল। এক হাতে ছুরি, আর এক হাতে কাঁটা চামচ। এবার কেক কাটবে। খাবে।
কিন্তু চোখ আটকে গেল কাঁটা চামচে। চেয়েই রইল। চোখ আর সরে না। চোখের পাতাও পড়ে না।
ঈষৎ সঙ্কুচিত হল চক্ষুতারকা। সম্মোহিত হওয়ার পর এই প্রথম চোখ কুঁচকোচ্ছে সে। কারণ কঁটাচামচের তিনটে মাত্র কাঁটার গড়নটা তার যেন চেনা-চেনা লাগছে।
কোথায় যেন দেখেছে…।
মন ছেয়ে ফেলছে ওই তিনটে কাটা, মিলেমিশে যাচ্ছে আরও তিনটে সূচীতীক্ষ্ণ শলাকার সঙ্গে।
ত্রিশূল!
যেন বজ্রালোকে ঝলকিত হল অনিমার মস্তিষ্কের অভ্যন্তর। অব্যাখ্যাত এক দীপ্তি নিমেষ মধ্যে ঘুচিয়ে দিল সম্মোহনের নিরন্ধ্র তমসা।
ত্রিশূল।
কাটাচামচটা দেখতে ত্রিশূলের মতো।
সে ত্রিশূলের এজেন্ট।
এখন কোথায়? শত্ৰুপুরীতে। ত্রিশূলের আর একজন এজেন্ট গজানন কোথায়? শত্রুদের হাতে!
কঁটাচামচ টেবিলে রেখে উল্কাবেগে দরজা দিয়ে করিডরে বেরিয়ে গেল অনিমা। সামনেই সেই ছোট ঘর। ঘরের মধ্যে বিদিগিচ্ছিরি গলায় চেঁচাচ্ছে ম্যাডাম কিল হিম! কিল হিম! খুব বেশি জেনে গেছে। অ্যাট ওয়ান্স!
অনিমা যেন সাইক্লোন হয়ে গেল মুহূর্তে। দমকা বাতাসের মতো ঢুকল ঘরে। রূপকুমার রিভলভার বার করেছে, তুলছে গজাননের খুলি লক্ষ্য করে।
