গজানন নাকি? এসো, এসো, আমি বলেছিলাম বলেই তো অত খাতির করে এনেছে তোমাকে?
লাটুর মতো ঘুরে যায় গজানন। থিরথির করে কঁপে গালের কাটা দাগটা।
দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে মেদবিপুলা এক প্রৌঢ়া। দু কানের লতিতে দুটো সোনার রিঙ। ঠোঁটে থ্যাবড়া করে লাগানো লাল রং। মাথার চুল উঁচু করে খোঁপা বাঁধা। ডাইনি নাকি? মনে-মনে বলে গজানন।
মুখে বলে বিষম বিস্মিত স্বরে–আপনি?
নিরীহ একটি মেয়েছেলে, বাবা। সাতে নেই, পাঁচে নেই।
কিন্তু এই গুন্ডাগুলোর ব্রেন আপনিই?
রক্ত মাখানো ঝুলে পড়া ঠোঁট দুটো অদ্ভুত ভঙ্গিমায় বেঁকে যায় হাসতে গিয়ে।
হ্যাঁ, আমি। শুনলাম, তুমি নাকি কি সব দুষ্টুমি করেছ। এসো, এসো, কাছে এসো।
দুষ্টুমি? পকেটে পয়সা নেই বলে রাম সিং-এর কাছে চিঠি পাঠানো–
তুলতুলে নরম হাতে গজাননের দু-হাত চেপে ধরে ম্যাডাম। ছোট চোখে আর ভিজে ঠোঁটে দুজ্ঞেয় সেই হাসি–রাজপুত্তুরের মতো চেহারা! আহা! মেয়েরা নিশ্চয় জ্বালাতন করে?
নরম ছোঁয়াটার মধ্যে কী যেন ছিল। গা শিরশির করে ওঠে গজাননের। কণ্ঠস্বর স্থলিত হয়, জুয়ো, আনাড়ি তো, তাই–
কথা বলতে গেলেই চোখের দিকে তাকাতে হয়। গজাননও তাকিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে শরীরের প্রতিটি অণুপরমাণু দিয়ে অনুভব করল অদৃশ্য শক্তির একটা ঝাঁপটা যেন ওকে টলিয়ে দিয়ে গেল। ভয়াবহ শক্তি। চোখে দেখা যায় না, কিন্তু যেন দুরমুশের ঘা লাগল সমস্ত সত্তায়।
মিহি গলায় বিমূঢ় গজাননের চোখে চোখ রেখে বললে ম্যাডাম সত্যি? বুড়িকে মিথ্যে বলতে নেই, বাবা।
নিস্তেজ গলায় বলে গজানন–সত্যি।
ছোট চোখ দুটোকে আরও কাছে নিয়ে আসে ম্যাডাম। তারকা-রন্ধ্রে ও কীসের শিখা। আচমকা বিস্ফারিত হয়ে ওঠে দুই চক্ষু। গজাননের দৃষ্টিপথে এখন কেবল ওই চোখ, ভয়াল, ভয়ংকর, পৈশাচিক, মোহময়!
গজানন, ও গজানন, মন খুলে বলো; সব কথা বলো।
ব-বলেছি তত; জুয়ো খেলতে এসেছিলাম, পকেটে..পকেটে…
আচমকা শিথিল হয়ে গেল ম্যাডামের চাহনির বজ্র আঁটুনি। গজাননের হাত ছেড়ে দিয়ে বললে কর্কশ গলায়–মিথ্যে কথা! জুয়ো খেলাটা তো একটা দুর্বলতা। অনেক বেশি শক্তিমান তুমি।
মা-মানে?
তোমার চোখের মধ্যেই রয়েছে অনেক কথা। অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ তুমি, গজানন। গজানন, গজানন, তোমার চোখেই দেখেছি যে আমার প্রতিবিম্ব।
অত কথার দরকার কী? রাম সিং-র কাছে চিঠিটা পাঠান, টাকা এসে যাবে। আমাকে রেহাই দিন।
সোফায় বসল ম্যাডাম। দু-হাত একত্র করে থলথলে মুখখানা ফিরিয়ে রইল গজাননের দিকে, ইন্টারেস্টিং। অনেক কিছুই জানো দেখছি।
হ্যাঁ, জানি, হঠাৎ খেপে যায় গজানন, কী জানি বলুন তো? মুরোদখানা দেখা যাক।
মুরোদ দেখতে চাও? হাসছে ম্যাডাম। সেই রকম শিথিল ঠোঁট বেঁকিয়ে বিকৃত হাসি, গা ঘিনঘিন করে গজাননের বৎস গজানন, যদি বলি তুমি একটা জঘন্য নোংরা স্পাই? এসেছ আমার কাজে নাক গলাতে?
বললেই হল?
কিম্ভুতকিমাকার ম্যাডাম শুধু ইশারা করল হাত নেড়ে। সমসের খুলে দিলে একটা দরজা। পায়ে-পায়ে ঘরে ঢুকল অনিমা।
আচ্ছন্ন অবস্থাটা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে গজানন প্রাণপণে। দু-হাত দু-পাশে ঝুলিয়ে অমন পুতুলের মতো হাঁটছে কেন অনিমা? টগবগে ঘোটকীর মতো যে তেজস্বিনী, তার আপাদমস্তকে এ ধরনের আড়ষ্টতা কেন?
বিদ্রুপের ছুরি ঝলসে ওঠে ম্যাডামের তীক্ষ্ণ স্বরে,–চেনা-চেনা মনে হচ্ছে তাই না? একই দলের দুই স্পাই, তাই না?
তুখোড় গজানন তখন নির্নিমেষে চেয়ে আছে অনিমার দারুপুত্তলিকার মতো দেহবল্লরীর পানে। তাই চাবুকের মতো জবাবটা জিভে এসেও জড়িয়ে গেল,জীবনে দেখিনি।
মেপে-মেপে পা ফেলে আরও একটু এগিয়ে এল অনিমা। মিশরের মামী নাকি? গজানন চোখ কুঁচকে চেয়ে আছে। কোথায় যেন বিচ্ছিরি একটা ব্যাপার ঘটে গেছে! অনিমা অমন শূন্য চাহনি মেলে রয়েছে কেন তার দিকে? চোখের মণি দুটো দু-টুকরো আয়নার মতো চকচক করছে
তো, ঠিক যেন ঘষা কাঁচ!
গজাননের বুকে বুক ঠেকিয়ে বললে অনিমা, যে স্বরে বললে তাতে উত্থান নেই, পতন নেই, প্রাণ নেই, উত্তাপ নেই; ঠিক যেন একটা যন্ত্র কথা বলে গেল যান্ত্রিক স্বরে–চিনি, একে আমি চিনি, ত্রিশূলের এজেন্ট। এর সঙ্গেই দেখা করতে বলা হয়েছিল আমাকে।
গজানন কি অজ্ঞান হয়ে যাবে?
সোফায় বসে মিটিমিটি হাসছে ম্যাডাম।
না, অজ্ঞান হয়ে যায়নি গজানন। সে পাত্রই সে নয়। ব্রেনটা কিন্তু নিমেষে তরতাজা হয়ে উঠেছিল। বুঝে ফেলেছিল কীসের প্রভাবে অনিমা আর নেচে বেড়াচ্ছে না, হেঁকে-হেঁকে কথা বলছে না, তেড়েমেড়ে ল্যাং মারছে না!
হিপনোটিজম্! ম্যাডাম ডাইনি তার ওপরেও সম্মোহনের ম্যাজিক দেখাতে গেছিল। ল্যাজেগোবরে হয়েছে। অনিমা বেচারা হাজার হোক মেয়ে তো, ডাইনির খপ্পরে পড়েছে।
নিবিড় চোখে অনিমা চেয়ে রয়েছে ওর দিকে, ঈষৎ ঘাড় বেঁকিয়ে। চাহনির মধ্যে নেই সেই প্রাণময়তা।
সোফার বসে মাথা তুলে বললে ম্যাডাম, কী গো গজানন, এবার কথা শোনো, খুলে বলো কী মতলবে আসা হয়েছে? মিছে বলে লাভ নেই দেখতেই তো পাচ্ছ।
চোয়ালের হাড় কঠিন হয়ে ওঠে গজাননের,যা বলবার তা বলা হয়ে গেছে। অত সহজে আমাকে ঘায়েল করা যাবে না।
ঘড়ঘড় শব্দে হেসে ওঠে ম্যাডাম। হাসির আওয়াজ যে এমন বিকট বিদিগিচ্ছিরি হয়, জানা ছিল না গজাননের।
