ভেতরে কোনওমতে যদি ঢুকতে পারা যেত…
আগে বাড়িটাকে এক পাক ঘুরে দেখে নেওয়া যাক। পথ নিশ্চয় আছে। জঙ্গলের মধ্যে পাহারার কড়াকড়ি নাও থাকতে পারে।
পেছন দিকে এসে কিন্তু ভুলটা ভাঙল। দরজা খুলে বেরিয়ে এল কালো চশমাধারী সেই লোকটা। হাতে রিভলভার। মোলায়েম গলায় বললে–ভেতরে এসো সুন্দরী। বাইরে বড় ঠান্ডা।
বড় ঘরটায় চেয়ারে বসে অনিমা। ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। টাইট গেঞ্জি লুটোচ্ছে মেঝেতে। নিষ্ঠুর বদন ব্যক্তির একটা হাত তার বাম স্তনে মোচড় দিচ্ছে, এখনও বলো মহারানি তুমি কাদের এজেন্ট?
বলব না।
খুব মিষ্টি স্বর ভেসে এল করিডরের দরজার কাছ থেকে, রূপকুমার, ওকে আমার হাতে ছেড়ে দাও। তোমরা পাবে পরে।
দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে অবিশ্বাস্য রকমের স্থূলকায়া এক মহিলা। চর্বি ঝুলে পড়েছে সারা দেহে, গালে চিবুকে। মাথার চুল ঝুঁটি করে ওপরে বাঁধা। আরও কুৎসিত দেখাচ্ছে ঠোঁটে লাল রং মেখে থাকায়। ফরসা গাল এমনিতেই লালচে। শুধু একটা ব্লাউজ আর স্কার্ট শরীরের কদাকার মেদবহুল অংশগুলোকে প্রকটতর করে তুলেছে।
থপথপ করে অতি কণ্ঠে গুরুভার দেহটাকে অনিমার সামনে নিয়ে এল চর্বির এই সচল পাহাড়টি। লাল ঠোঁট বেঁকিয়ে গা ঘিনঘিনে হাসি হেসে বললে, তুমি কাদের বাড়ির মেয়ে গো?
যমের বাড়ির–গা রি-রি করছে অনিমার। বুকটাও টনটন করছে শয়তানটার কদর্য হাতের নিষ্পেষণে। মুখ দিয়ে ভালো কথা বেরোয়?
নোংরা হাসি আরও একটু নোংরা হল প্রৌঢ়ার মুখে, বড় কষ্ট দিচ্ছে এরা, না? মেয়ে মানুষই মেয়ে মানুষের দুঃখ বোঝে। রূপ থাকা বড় জ্বালা, বাছা। হাত ধরে অনিমাকে চেয়ার থেকে উঠাল চর্বির পাহাড়। অনিমাও টুক করে মেঝে থেকে উলের গেঞ্জিটা কুড়িয়ে নিয়ে পরে নিল মাথা গলিয়ে। বুকে ঢেউ খেলে গেল লেখাটা–আই লাভ ইউ।
সে কী হাসি প্রৌঢ়ার, ইয়েস, ইয়েস, ইয়েস, আই লাভ ইউ। কাম উইথ মী। সমসের, রূপকুমার, তোমরা এখানেই থাকো।
ম্যাডাম, আর একজন রয়েছে গেমস-এর আড্ডায়।
সমসেরের কথায় কান দিল না ম্যাডাম।
ছোট ঘর। প্রায় অন্ধকার বললেই চলে। একটা শুধু ঘেরাটোপ দেওয়া টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে বড় সোফার পাশে।
অনিমাকে নিয়ে পাশাপাশি বসে আছে ম্যাডাম। দৃশ্যটা বিচিত্র। একজনের দেহের যৌবনের বন্যাকে আঁটসাঁট পোশাকে বাগে রাখার চেষ্টা; আরেকজনের চেষ্টা চর্বির বোঝাকে বেঁধেসেঁধে রাখার।
ম্যাডাম চেয়ে আছে অনিমার দিকে। কৌতুকভরা ছোট চোখ। অনিমার কিন্তু কেন জানি অস্বস্তি লাগছে চোখে-চোখে চাইতে। চোখ নামিয়ে নিতেই অদ্ভুত ঘড়ঘড়ে গলায় হাসল ম্যাডাম নাম কী তোমার?
বলব না।
আমার চোখের দিকে তাকাচ্ছ না কেন?
ঘেন্না হচ্ছে বলে।
তাকাও–আচম্বিতে কর্কশ হয়ে ওঠে ম্যাডামের স্বর। আরও শক্ত হয়ে যায় অনিমা।
তাকাও–অদ্ভুত একটা অনুভূতি জাগে অনিমার মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। নিজেকে এলিয়ে দিতে ইচ্ছে যাচ্ছে, আলগা হয়ে যেতে ইচ্ছে যাচ্ছে।
তাকাও। অদৃশ্য একটা শক্তি ওর চাহনিকে টানছে, টানছে, টানছে, ম্যাডামের দিকে!
চোখ তোলে অনিমা।
ম্যাডাম চেয়ে আছে। ছোট চোখ দুটো এখন অগ্নিগর্ভ। যেন দু-দুটো আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ। ভলকে ভলকে অদৃশ্য শক্তিধারা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। এ শক্তি চোখে দেখা যায় না। শক্তির উৎস কিন্তু এই দুটো চোখ। চোখ না চুম্বক? দৃষ্টি সরাতে পারছে না কেন অনিমা? শুধু ওই চোখ ছাড়া আশেপাশে যেন আর কিছুই নেই। অনিমা নিজেও যেন আর নেই। ওই চোখ। ওই চোখ তাকে গিলে নিয়েছে।
ভালো লাগছে?–অনেক দূর থেকে যেন ভেসে-ভেসে আসে ম্যাডামের মধুর স্বর। ঠিক যেন মা কথা বলছে। অনেক, অনেক বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মা।
হ্যাঁ।
প্রাণ খুলে কথা বলোএককেবারে গোড়া থেকে বলো। যখন স্কুলে পড়তে, যখন ছোট্ট ছিলে, তখন থেকে।
বলব, সব বলব, মানসিক চাপ, ভীষণ, অসহ্য, মন খুলে কথা বলার কেউ ছিল না।
আমাকে বলো।
বলছি।
.
গজাননের পরীক্ষা
গজানন গ্যাঁট হয়ে বসেছিল চেয়ারে। গেমস-এর আড্ডা এখন খালি। মেশিনগুলো নিস্তব্ধ। ছজন ভদ্রবেশি গুন্ডা তাকে ঘিরে বসে সিগারেট টানছে। আর সকৌতুকে দেখছে গজাননের নস্যি নেওয়া। নৈঃশব্দ্য খান-খান হয়ে যাচ্ছে এক-একটা টিপ নেওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে।
কালো চশমাধারী ঢুকল ঘরে। মুখভাব অনেক নরম–চলো হে টিকটিকি।
টিকটিকি! আশেপাশে তাকায় গজানন; কোথায় টিকটিকি?
এতক্ষণ যারা নস্যি নেওয়ার ধরন দেখে অতিকষ্টে হাসি চেপে রেখেছিল, এবার তারা হেসে উঠল ঘর ঝাঁপিয়ে।
মুখ শক্ত হয়ে যায় কালো চশমাধারীর, মস্করা হচ্ছে? এসো।
কোথায়?
আমার বস্-এর কাছে।
ও! চলো! যেন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হাল ছেড়ে দিয়ে কাঁধ নাচায় গজানন। মনটাও নেচে ওঠে সঙ্গে-সঙ্গে। তখন যদি জানত অদৃষ্টে ওর কী আছে, কুরুক্ষেত্র কাণ্ড ঘটিয়ে পিঠটান দিত ওইখান থেকেই।
জঙ্গলের মধ্যে নিরালা বাড়িটার সদর দরজা খুলেই দাঁড়িয়েছিল রূপকুমার। যেন যাত্রার হিরো। পেছনে থেকে আচমকা গজাননের কাঁধে রাম রদ্দা মারল সমসের। হুড়মুড় করে ভেতরে ঠিকরে গেল ট্রিপল-জি।
সঙ্গে-সঙ্গে অবশ্য সামলে নিল নিজেকে। কণ্ঠে জাগল চিল-চিৎকার, বলি, ব্যাপারটা কী? এইটুকু রাস্তা গাড়ি করে জামাই-আদরে এনে–
কথা আটকে গেল বিদ্রূপতরল একটি কণ্ঠস্বরে। বিদ্রুপের সঙ্গে মেশানো রয়েছে বেশ খানিকটা পৈশাচিকতার গরল।
