কালো চশমাধারী আর কথা বাড়ায় না। কলম আর প্যাডটা এগিয়ে দিয়ে বলে, লিখুন।
ঝড়াঝড় করে ইংরেজিতে লিখে দিল গজানন:
মাই ডিয়ার রাম সিং,
আই অ্যাম ইন এ ফিক্স। কাইন্ডলি হ্যান্ডওভার ফাইভ থাউজ্যান্ড টু দ্য বেয়ারার অফ দিজ লেটার। আই শ্যাল মীট ইউ টুমরো। ইওরসজ্ঞানপান।
প্যাড থেকে চিঠি ছিঁড়ে নিয়ে কালো চশমাধারী পকেটে পুরতে-পরতে বললে, কোথায় আছেন আপনার রাম সিং?
মনে-মনে বলল গজানন, শালা, বাজিয়ে নিচ্ছ আমাকে? মুখে বললে–লোহিয়া প্যালেস, জলাপাহাড়। কুইক। বেরিয়ে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে গেল কালো চশমাধারী। গজানন তখনও চেঁচিয়ে চলেছে–হেই, গেট মী মোর ড্রিঙ্কস। আই ওয়ান্ট টু ড্যান্স। হু উইল ড্যান্স উইথ মী?
বলেই এদিক-ওদিক চাইল গজানন। হাত বুলিয়ে নিলে বাঁ-গালের কাটা দাগটার ওপর। বডি থ্রো করার আগে এটা করা ওর স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। ক্রিকেট মাঠে বল করার আগে প্যান্টে বল ঘষে নেওয়ার মতো। গজাননের হাতে-পায়ে বিদ্যুৎশক্তির আধারগুলো পটাপট ছিপিখোলা হয়ে যায় গালের ওই পুরোনো ক্ষতস্থানে হাত বুলোলেই।
অনিমা ঘাড় বেঁকিয়ে চেয়ে আছে ওর দিকে; চোখে বিজাতীয় দৃষ্টি। বন্ধুত্বর বাষ্পটুকুও নেই। ঘর থেকে সটকান দেওয়ার একটাই পথ। দরজার ঠিক পাশেই দু-হাত বুকের ওপর জড়ো করে দাঁড়িয়ে যেন পাথরপ্রতিমা, শরীরী বিস্ময়।
গাল থেকে হাত নামাল গজানন এবং দুহাতের দুই ঝটকায় ডাইনে-বাঁয়ের দুই নেপালী পুঙ্গবকে দশ হাত দূরে ছিটকে ফেলে দিয়ে কামানের গোলার মতো ধেয়ে গেল দরজার দিকে।
গজানন দ্য গ্রেটের এ হেন আচমকা ছিটকে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত ছিল না কেউই। সেই ফাঁকেই দরজায় পৌঁছে গেল গজানন। চাপা গলায় অনিমার দিকে না চেয়ে শুধু বললে–ল্যাং মার আমাকে।
অনিমা মেয়েটি সাঙ্ঘাতিক ধুরন্ধর। মুখখানায় একটু মঙ্গোলিয়ান ধাঁচ আছে বলেই মনের কথা মুখে ফোটে না। কিন্তু চকিতের মধ্যে বুঝে নিল একঘর বিমূঢ় শত্রুর আস্থা কুড়োতে গেলে গজাননের নির্দেশ অতি উত্তম।
অতএব অতি উত্তমভাবে ডান পা-টা সামনে বাড়িয়ে ল্যাং মারল অনিমা। লিখতে যেটুকু সময় গেল, তার অনেক কম সময়ের মধ্যে ঘটে গেল সমস্ত ব্যাপারটা। এক ফুট দূর থেকে গজানন বললে ল্যাং মারতে, এক ফুট এগিয়ে আসতেই ল্যাং মারল অনিমা এবং দশ ফুট দূরে মুখ থুবড়ে পড়ল ট্রিপল-জি।
হই-হই করে তেড়ে এল পেছনকার জুয়ারিরা। লাফিয়ে পড়ল গজাননের ওপর। গোলমালের মধ্যে দরজা দিয়ে হাওয়া হয়ে গেল অনিমা।
ঘা কতক খেয়ে মনে হল নেশা ছুটে গেছে গজাননের। বিরাশি সিক্কা ওজনের একটি চড় পড়ল কাটা গালটার ওপর ব্লাইটার। যার গাল এরকম কাটা, সে যে সাধুপুরুষ নয়, আগেই বুঝেছিলাম। বল তুই কাদের এজেন্ট?
এজেন্ট? ককিয়ে ওঠে গজানন, কারবার-টারবার কিছুই নেই আমার, এজেন্সি নিতে যাব কেন? কেক! ঘুসি পড়েছে তলপেটে। দম আটকে আসে গ্রেট গজাননের। মনে কিন্তু খুশির ফেয়ারা। কাজ ভালোই এগুচ্ছে। এবার বডি সার্চ করুক। রিভলভারটা বেরিয়ে যাক। নিয়ে যাক ওদের ঘাঁটিতে…
ঠাস।
মাথা ঘুরে যায় গজাননের। সেই সঙ্গে ছিটকে পড়ে চেয়ার থেকে। বুকের ওপর জুতোর হিল ঘষছে একজন। আর একজন ঠিক কণ্ঠার ওপর। আর একজন দ্রুত বড়ি সার্চ করে হোলস্টার থেকে বার করে ফেলেছে রিভলভারটা।
রিভলভার এখন কালো চশমাধারীর হাতে। মুখ তার ক্রুর, করাল। কণ্ঠে শঙ্খচূড়ের রক্ত হিম করা গজরানি, আগেই বুঝেছিলাম। থাক এখানে। আসছি আমি।
গজাননও তাই চায়!
.
মনের শক্তি
দার্জিলিং শহর থেকে যে রাস্তাটা নেপালের পশুপতি মন্দিরের দিকে গেছে, যে পথ দিয়ে অবাধে নেপাল থেকে বিদেশি সামগ্রী কিনে আনে পর্যটকরা, সেই পথের বেশ কয়েক জায়গায় দু-পাশে গভীর পাইন অরণ্য নেমে গেছে ঢালু পাহাড় বেয়ে, কোথাও বা উঠে গেছে মেঘলোকের দিকে।
কালো চশমাধারী হেঁটেই বেরিয়ে এল শহর থেকে। হাঁটছে লম্বা-লম্বা পা ফেলে। অন্ধকারে আর কুয়াশায় বেশি দূর দেখা যাচ্ছে না। পেছন ফিরে তাকালেও তাই সে দেখতে পেত না অনিমাকে। চিতাবাঘের মতো নিঃশব্দে সে আসছে পেছন-পেছন।
জঙ্গলে ঢুকে পড়ল কালো চশমাধারী। বড়-বড় গাছের তলা দিয়ে সরু পায়ে-চলা রাস্তা। শেষ হয়েছে একটা দোতলা কটেজ প্যাটার্নের বাড়ির সামনে।
ফ্যান-লাইটের তলায় গিয়ে দাঁড়াতেই খুলে গেল সদর দরজা। ভেতরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিতেই সামনে এসে দাঁড়াল সুবেশ সুন্দর এক পুরুষ। গালে চাপ দাড়ি। চোখে বুদ্ধির দীপ্তি। কিন্তু সারা মুখে যেন নিষ্ঠুরতা মাখানো। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিটাও নির্মম।
নিমর্ম হাসি হেসেই বললে লোকটাসমসের, কী ব্যাপার? হঠাৎ এলে কেন?
রাম সিং-এর এজেন্ট জালে পড়েছে। গেমস-এর আড্ডায় এসেছিল। আনব এখানে?
ম্যাডামকে জিগ্যেস করতে হবে। একা এসেছ?
হ্যাঁ।
ইউ ফুল। স্পাই এনেছ পেছন-পেছন।
স্পাই!
ওই দ্যাখো। দেওয়ালের গায়ে ক্লোজড সার্কিট টিভি স্ক্রিনের দিকে আঙুল তুলে দেখায় নিষ্ঠুর বদন ব্যক্তি। রঙিন পরদায় দেখা যাচ্ছে জঙ্গলের মধ্যে থেকে পা টিপেটিপে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে বেরিয়ে আসছে চাবুক চেহারা একটি মেয়ে। টাইট গেঞ্জিতে বুকের ওপর লেখা–আই লাভ ইউ।
অনিমা ভাবতে পারেনি শহরের এত কাছে স্কাউড্রেলগুলো ঘাঁটি গেড়েছে। এই পথ দিয়ে গাড়ির স্রোত বয়ে যায় সকাল সন্ধ্যা। কিন্তু রাস্তা থেকে দেখাই যায় না জঙ্গলের ভেতরকার এই নিরালা বাড়িটাকে।
