গাছের গুঁড়ির দিকে সরে যায় গজানন। গুঁড়িতে পিঠ লাগিয়ে বাঘের মতো তাকায় আশেপাশে। ঠিক এই সময়ে পায়ের তলায় কী খচমচ করে উঠতেই লাফিয়ে ওঠে হরিণের মতো।
রিভলভার চলে এসেছে হাতে, গুলিও বেরিয়ে যেত আর একটু হলে। কিন্তু কাকে গুলি করবে গজানন? ওই খবরের কাগজটাকে? পা দিয়ে মাড়িয়ে ফেলেছে বলে?
কিন্তু একটুকরো পাথর দিয়ে কাগজটা চাপা দেওয়া কেন? পাছে উড়ে যায় বলে? এত যত্ন করে কে কাগজ রেখে গেল এখানে?
গুটিগুটি এগিয়ে গেল গজানন। বলা যায় না কাগজের তলায় হয়তো বিস্ফোরক আছে। কাগজ তুললেই ফাটবে প্রলয়ঙ্কর শব্দে। ত্রিশূলের অসাধ্য কিছু নেই।
কাছে এসে হেঁট হল গজানন। আরে, এ যে সেই বাংলা কাগজটা, একটু আগেই পড়তে দিয়েছিল পুঁতিবালা। পাথরটা যেখানে চাপা দেওয়া রয়েছে, তার ওপরের লাইন কটা পড়া যাচ্ছে মানুষের মগজে দশহাজার কোটির বেশি নিউরোণ…
নিচের ঠিকানাটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
তবে কী, তবে কী, এই খবরটাতেই দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে এক কপি খবরের কাগজ এখানে চাপা দিয়ে রেখে যাওয়া হয়েছে? রেখেছে কে?
নিশ্চয় অনিমা। ত্রিশূল এজেন্ট।
বিদিগিচ্ছিরি এই কেসটার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কি তাহলে কোটি-কোটি নিউরোণ-এর রহস্য?
মাথা ঘুরে যায় গজাননের। আস্তে-আস্তে বসে পড়ে ঘাসের ওপর। পাখির ডাক শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে এক সময়ে। এটা ওর একটা গ্রেট ক্যাপাসিটি। মনের সেফটি মেক্যানিজম। উদ্বেগ উৎকণ্ঠা চরমে পৌঁছালে আপনিই ঘুম এসে যায়। মন শান্ত হয়ে যায়।
.
ঘণ্টাখানেক দিবানিদ্রা দিয়েই ধড়মড় করে উঠে পড়ল গজানন। আর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পৌঁছতে হবে ভিডিও গেম-এর আসরে।
এবং পৌঁছল ঘড়ি ধরেই। তখন রোদ্দুর একটু-একটু করে মুছে যাচ্ছে দার্জিলিং-এর বুক থেকে। বড়-বড় ছায়া এগিয়ে আসছে একটার-পর-একটা পাহাড়ের ওপর দিয়ে।
আচ্ছা এর মধ্যেই সরগরম। ঘর বুঝি ফেটে যাচ্ছে অনেকগুলো ভিডিও গেম-এর সম্মিলিত মিউজিক আর আওয়াজে। এক কোণে চলছে জুয়া।
তার পাশেই ওই হট্টগোলের মধ্যে চেয়ার টেবিল পেতে মদ্যপান করে চলেছে কিছু লোক। আজকের সাজগোজ আরও উগ্র। কামনা জাগানো। নিতম্ব কামড়ে ধরা ব্লু জিনস-এর তলায় টাইট গেঞ্জি গোঁজা। কোমরে চওড়া চকচকে বেল্ট। গেঞ্জির ওপর লেখা আই লাভ ইউ। দুই বক্ষ চূড়ার ওপর ঢেউ খেলানো অবস্থায় লেখাটা যেন জীবন্ত হয়ে দুলে-দুলে হাতছানি দিচ্ছে লুব্ধ পুরুষদের।
পুরুষগুলো কেউ নিচু ক্লাসের নয়। এই ধরনের জুয়োর আড্ডায় আর মদের আসরে পকেট ভারি না থাকলে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। গজাননকেও দশ টাকার টিপস দিতে হয়েছে। গেটম্যানকে। তাছাড়া ওর চালচলনেও যে এখন নবাবিয়ানা–যে লাইনের যে দস্তুর।
অনিমার দিকে তাকানো, তাকে নিয়ে হাসাহাসি করা, এমনকী তার সঙ্গে কথাও বলা হচ্ছে। পুরু ঠোঁট বেঁকিয়ে অনিমাও হাসছে এবং লাস্যময়ীর মতোই অভিনয় করে চলেছে। কে বলবে এই মেয়ে স্কুলের শিক্ষয়িত্রী।
গজানন গুটিসুটি গিয়ে বসে পড়ল মদের আড্ডায়। অনিমা ওকে দেখেও দেখল না। প্রথমে হুইস্কির অর্ডার দিল। যে-সে হুইস্কি নয়–ভুটানি হুইস্কি হওয়া চাই। যার জোর আরও বেশি। পরপর তিন পেগ যখন শেষ হয়েছে, পাশের টেবিল থেকে কালো চশমা পরা মজবুত চেহারার লম্বামতো
একটা লোক এসে বসল ওর টেবিলে। লোকটার কালো গোঁফ দু-দিকে পাকানো এবং ছুঁচাল। গজাননের দিকে তাকিয়ে সে হাসতেই গজাননও হাসল। ভুটানি মদ্য রক্তে এনেছে বেপরোয়া ভাব। হেসেই বললে ইংরেজিতে, রাত্রে কেউ গগলস পরে? চোখের দোষ আছে বুঝি?
ঠিক ধরেছেন। একটা চোখ কানা। চশমা খুলে দেখাল লোকটা নতুন এসেছেন?
হ্যাঁ।
গেমস খেলবেন?
জানি না কী করে খেলতে হয়।
শিখিয়ে দিচ্ছি। আসুন।
এইটাই চাইছিল গজানন। তক্ষুনি উঠে গেল জুয়োর আড্ডায়। সবকটা খেলাতেই সে পোক্ত। কিন্তু এমন ভান করে গেল যেন এক্কেবারে আনাড়ি। ফলে হারতে লাগল প্রতি গেমে। আধঘণ্টাও গেল না। পাঁচ হাজার দশ টাকা হেরে বসল গজানন।
কাগজে হিসেব রাখছিল কালো চশমাধারী। স্পষ্টত খেলানো এবং খেলিয়ে পথে বসানোই এর কাজ। সব জুয়োর আড্ডায় এরকম একজন বুদ্ধিমান মাল্লম্যান থাকে। কাগজের হিসেব দেখে সে বললে–পাঁচহাজার দশ। মিস্টার, টাকাটা রাখুন, তারপর খেলবেন।
আকাশ থেকে পড়ল গজানন–অত টাকা কোথায় পাব?
তবে খেলতে এলেন কেন? শক্ত গলা কালো চশমাধারীর।
টাকা চাইলেই পাব বলে।
চাইলেই পাবেন? কে দেবে?
রাম সিং, জড়িত স্বর গজাননের, একটা কাগজ দিন চিঠি লিখে দিচ্ছি। গিয়ে নিয়ে আসুন। না পারলে আমার সঙ্গে চলুন। জ্বালাবেন না মাইরি।
কালো চশমার আড়ালে একটা চোখ ঈষৎ চমকে উঠলেও মুখের ভাবে তা প্রকাশ পেল না। গজাননের ডাইনে-বাঁয়ে পেছনে তিনজন গাঁট্টাগোট্টা নেপালি এসে দাঁড়িয়ে গেল সঙ্গে-সঙ্গে।
কালো চশমাধারী চেয়ে আছে তো আছেই। গজাননের মুখের প্রতিক্রিয়া দেখছে। না, লোকটা খবরই রাখে না রাম সিং সুইসাইড করেছে আজই সকালে। মুখ ভাবলেশহীন, বরং একটু ক্ষুব্ধ টাকা নিয়ে চাপ দেওয়ায়। কিন্তু রাম সিং-এর সঙ্গে যার এত দোস্তি, তাকে তো চট করে ছাড়া যায় না।
রাম সিং আপনার কে হন?
দুম করে রেগে যায় গজানন (মানে রাগার ভান করে)–তাতে আপনার দরকার কী?
