বলল–দুটোর সময়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনে দেখা হবে অনিমার সঙ্গে। সন্ধ্যায় যাব ভিডিও গেমের আড্ডায়। খুঁচিয়ে ঘা করে ধরা দেব। নিয়ে যাক ওদের ঘাঁটিতে। তারপর এসপার কি ওসপার। দাঁত কিড়মিড় করে গজানন শালা-বাচ্চা! দেখি তোদের কত মুরোদ।
গজাননের চেহারা এক্কেবারে পালটে গেছে। প্রমাদ গণে পুঁতিবালা। গান ডুয়েলের জন্যে তৈরি হয়েই বেরোচ্ছে গজানন। রক্ত ঝরাবে। নিজেও মরতে পারে। তারপর?
আমার কী হবে? ককিয়ে ওঠে পুঁতিবালা।
শাট আপ! সন্ধ্যার পর নজর রাখবি ভিডিও গেমের আড্ডায়। ভেতরে ঢুকবি না। খবরদার! আমাকে নিয়ে গেলে পেছন নিবি না। চোপরাও। কোনও কথা না। কাল সকালে না ফিরলে পুলিশে খবর দিবি। নিজে থেকে ওস্তাদি মারতে যেও না, বুঝেছ? গেছো মেয়ে অনিমা থাকছে সঙ্গে, ভয় কী? সস্নেহে পুঁতিবালার মাথা চাপড়ে দেয় গজানন, এ লাইনে সে অনেক বেশি এক্সপার্ট। বায় বায়, মাই সিস্টার। বলেই ঝড়ের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে গেল গজানন দ্য গ্রেট। কিন্তু হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে-পড়তে বেঁচে গেল বাইরে গিয়েই। টুরিস্ট এসেছে। মালপত্র নামাচ্ছে। একটা বড় প্যাকেট ছিল গজাননের গমন পথে। বেশ বড় প্যাকেট। ট্রিপল-জি তাতেই হোঁচট খেয়েছে।
এমনিতেই মেজাজ সপ্তমে চড়ে। তার ওপর এই প্যাকেট। বেরোচ্ছে একটা শুভ কাজে, প্রথমেই বাধা। গজানন আবার এগুলো মেনে চলে। হাঁচি, কাশি, টিকটিকির সঙ্কেতকে বিলক্ষণ পাত্তা দেয়। তাই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেও সুড়সুড় করে ফিরে এল ঘরে। এসেই দেখল সোফায় শুয়ে খবরের কাগজ পড়তে-পড়তে চোখ বড়-বড় করে উঠে বসেছে পুঁতিবালা।
গজাননকে ব্যাজার মুখে ফিরে আসতে দেখেও চোখ নামিয়ে নিয়ে খবরের কাগজ পড়ে যাচ্ছে দেখে ট্রিপল-জি-এর আর সহ্য হল না। দুন্দুভি কণ্ঠে হুঙ্কার ছেড়ে বললে, সিনেমার পেজ নাকি?
পড়া হয়ে গেছিল পুঁতিবালার। বিস্ফারিত চোখে কাগজখানা দিল গজাননের দিকে, পড়েছ?
পুঁতিবালা এরকম করে কেন? মরতে চলেছে গজানন, এখন কি খবরের কাগজ পড়ার সময়? কিন্তু কী আছে কাগজটায়?
হ্যাঁচকা টানে কাগজ টেনে নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরল গজানন। কোন খবরটা? কাগজটা তো দেখা যাচ্ছে বাংলা। কলকাতার অফসেটে পি টি এস টাইপে ছাপা।
সোফা ছেড়ে পুঁতিবালা উঠে এসে আঙুল দিয়ে দেখাল–এই বিজ্ঞাপনটা।
পড়ল গজানন।
মানুষের মগজে দশহাজার কোটির ওপর নিউরোণ রয়েছে। কিন্তু এগুলোর দশ ভাগের এক ভাগেরও বেশি নিষ্ক্রিয় থাকে। এই নিষ্ক্রিয় নিউরোণগুলোর মধ্যে মানুষের পূর্বজন্ম আর অতীতের বহু জন্মের পঞ্চেন্দ্রিয় আর মন দিয়ে অর্জিত সমস্ত অভিজ্ঞতা স্মৃতির আকারে ধরা থাকে। নিষ্ক্রিয় নিউরোণগুলোকে সক্রিয় করলেই পূর্বজন্মের ও অতীতের বহু জন্মের স্মৃতি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
মাত্র তিনমাসের মধ্যে যে-কোনও মানুষের পূর্বজন্মের স্মৃতিকে সক্রিয় করা হয়। সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয় পঞ্চাশ হাজার মার্কিন ডলার। অগ্রিম দশ হাজার ডলার। বুকিং চলছে। যোগাযোগঃ
নিচের নাম ঠিকানার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল গজানন। এ যে কলকাতার ঠিকানা। কলকাতায় এজেন্ট বসিয়ে আমেরিকার এক্সপার্ট ব্রেনসেলে অ্যাকটিভিটি জাগিয়ে মানুষকে জাতিস্মর করে তুলছে।
ব্রেন সেল! আমেরিকাব এক্সপার্ট! অকস্মাৎ বিজনেস ম্যাগনেটদের পাগল হয়ে আত্মহত্যার হিড়িক। প্রত্যেকেই আমেরিকাব কুল ড্রিঙ্কস কোম্পানির বিষনজরে ছিল।
ফ্যালফ্যাল করে বিজ্ঞাপনটার দিকে চেয়ে থাকে গজানন। দশহাজার কোটিরও বেশি নিউরোণ এর দশ ভাগের নভাগ নিষ্ক্রিয়। তাদের খাঁটিয়ে নিলে পূর্বজন্মের স্মৃতি ফিরে পাওয়া যায়। কোটি কোটি নিষ্ক্রিয় নিউরোণের মধ্যে আরও অনেক ক্ষমতা নিশ্চয়ই আছে, যা এই জন্মেরই ব্যাপার। পূর্বজন্মের স্মৃতি জাগানোর আগে এই জন্মের অকল্পনীয় সেই শক্তিগুলো কি জেগে উঠছে না? সেই শক্তি দিয়ে একটার-পর-একটা সুস্থ মানুষকে পাগল করে দেওয়া কি খুব কঠিন?
বোঁ-বোঁ করে মাথা ঘুরতে লাগল গজাননের। কাগজটা মাটিতে ফেলে দিয়ে আস্তে-আস্তে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। বাধা পেলে যে একটু বসে যেতে হয়, তাও ভুলে গেল।
.
অ্যাকশন
ঠিক দুটোর সময়ে বিশাল পাইন গাছটার তলায় পৌঁছল গজানন। দূরে দূরে কিছু কপোত-কপোতী প্রেমালাপে বিভোর। গজাননের মাথার মধ্যে তখন এমনই গোলমাল চলছে যে, এদিকে ওদিকে কৌতুকী চাহনি নিক্ষেপ করবার মতো মেজাজও নেই।
কিন্তু অনিমা মেয়েটা গেল কোথায়? পরপর দুদিন এল, আজকেই আরও বেশি করে আসা দরকার। কেননা রাম সিং পটল তুলেছে। রহস্য আরও বেশি গম্ভীর হয়েছে। চোখের সামনে অরুণাভর কালো পাথরের চকচকে মুখ আর বিরাট টাক ভেসে উঠছে। দু-চোখের স্পার্ক যেন কলকাতা থেকে ছুটে এসে গায়ে ছ্যাকা দিচ্ছে। মনের অবস্থা খুবই খারাপ। অনিমাটার সঙ্গে শলাপরামর্শ করে নেওয়া খুবই দরকার। কিন্তু বেআক্কেলে মেয়েটা ঠিক আজকেই ডুব দিল?
ত্রিশূলের কারসাজি নয় তো? নির্দেশ বেতারে–অ্যাসাইনমেন্ট ফেলিওর লিকুইডেট গজানন!
আপনা থেকেই হাতটা চলে যায় বগলের তলায়। কে জানে এই মুহূর্তে কোন ঝোপে রিভলভার তাগ করছে অনিমা। অথবা সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল। গোর্খাল্যান্ড নিয়ে যে হাঙ্গামা হয়ে গেল সম্প্রতি, বোটানিক্যাল গার্ডেনে একজনের লাশ নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে না।
