প্রীতিবল।
মাই গড! চোখ কপালে তুলে ফেলে গজানন–তাও জানেন? হাসল অরুণাভ। সেই ব্যাটারি চার্জড় শক্তিমানের হাসি।
বললে, কত নেবেন?
কত দেবেন?
এখন বিশ হাজার। ক্যাশ। অন্য খরচ আমাদের।
কাজ শেষ হলে?
কাজের শেষটা কী হয় দেখা যাক, আবার সেই ব্যাটারি চার্জড হাসি। এবারে রীতিমতো নিগূঢ়। অর্থাৎ বেঁচে ফিরে আসো কিনা দেখি? এক লাখেও পৌঁছতে পারে।
খুব কম।
ডোন্ট বারগেন, একটু কর্কশ শোনায় অরুণাভর স্বর। চোয়ালও কঠিন। চোখের স্পার্ক দ্বিগুণ ত্রিশূলের একটা কাজ করলেই সারাজীবন পায়ের ওপর পা তুলে বসে কাটিয়ে দেওয়া যায়।
জানি, হাসল গজাননও। বেলেঘাটাই হাসি বাজিয়ে নিলাম। ডোন্ট মাইন্ড।
.
বাঘের গুহায়
কিন্তু বাঁচানো গেল না রামসিংকে। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে পুঁতিবালা ওরফে প্রীতিল যে খবর দিল তা সাংঘাতিক।
লাশ দেখে আর লাভ কী? বিশ হাজার নগদ নিয়ে ত্রিশূলের পয়সায় দার্জিলিং-এর মতো জায়গায় এত লপচপানি করে শেষে এই হল? অরুণাভ যা টেটিয়া লোক, এবার জানে না মেরে দেয়।
মুখের ভেতরটা বেশ গরম-গরম লাগছে। আমেরিকান ট্যাবলেটের কারবারই আলাদা। মাথার ভেতরকার ভোঁ-ভোঁ ভাবটাও একটু কেটেছে। মনে-মনে ডাঃ বক্সীকে স্মরণ করল গজানন। লোকটা নির্ঘাত দেবতা। আপদে-বিপদে অলক্ষিতে এমন বাঁচিয়ে দেয়। এই ট্যাবলেট যদি সঙ্গে না থাকত, মেন্টাল শকেই আবার মেন্টাল হোমে দিন কাটাতে হত।
মেজাজ খিঁচড়ে গেলে গ্রেট গজানন পুঁতিবালার ওপরেই ঝাল ঝাড়ে। পুঁতিবালা যদিও এখন আর সেই পুঁতিবালা নেই। অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়েছিল বলে শরীরেও গ্লানি জমা হয়েছিল। এখন তার চেহারা ঝকঝকে, চোখ চকচকে, রং টকটকে। তবুও গজাননের কাছে আগুনের শিখা এই প্রীতিবল-নুয়ে পড়ে আগেকার পুঁতিবালার মতোনই।
তেড়ে বললে গজানন, তোকে যে বলেছিলাম, রাম সিং-এর সঙ্গে ফ্লার্ট করতে। করেছিলি?
মুচকি হেসে পুঁতিবালা বললে, তা আর করিনি। মনে রং ধরিয়ে তবে ছেড়েছি।
তবে মরতে গেল কেন?
পাগল হয়ে যাচ্ছিল যে।
হয়ে যাচ্ছিল! চোখ বড় হয়ে যায় গজাননের।–এতদিন বলিসনি কেন?
মুখের সামনে দু-হাত ঘুরিয়ে বুড়ি খুকির মতো বললে পুঁতিবালা কখন বলব গো? যখনই অমি একা হই, তখনই দেখি তুমি দোকা।
শাট আপ।
ফিক করে হেসে ফেলে পুঁতিবালা–বেড়ে মেয়েটা, না দাদা? বিয়েই করে ফ্যালো না।
আমাদের লাইনে কেউ বিয়ে করে না। করলেই ফাঁস–গলায় ছুরির কোপ দেখানোর ভঙ্গিমা দেখিয়ে।অথবা দুম! রগে পিস্তল ছোঁড়ার অভিনয় করে।–তোকেই বলছি, বিয়ে ফিয়ের কথা মনেও আনবি না। বুঝেছিস?
দাদা গো দাদা, তা আর বুঝিনি। হাড়ে হাড়ে বুঝছি। কিন্তু দাদা, প্রথম দিন যেদিন ম্যালে গিয়ে ঘোড়া নিলে। অনিমা বউদি–।
বউদি!
মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। অনিমাদির ঘোড়ায় চড়াটা লাভলি, তাই না?
গেছো মেয়ে নাম্বার ওয়ান।
গোছো মেয়েই আমার ভাল্লাগে, মুখ গোল করে বললে পুঁতিবালা–তা দুটিতে জলাপাহাড়ে গিয়ে কী করলে গো?
গেট আউট!
পুঁতিবালা তো গেট-আউট হলই না, উলটে আরও বেশি ইন হয়ে গেল। অর্থাৎ সোফায় ঝপ করে শুয়ে পড়ে পায়ের ওপর পা তুলে নাচাতে লাগল। আড়চোখে কিন্তু তাকিয়ে রইল গজাননের দিকে।
গজাননের মাথায় তখন চিন্তার তুফান। প্রথম দিনেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট মতো ম্যালেতে চিনে ফেলেছিল অনিমাকে। ঘোড়ায় চড়ে জলাপাহাড়ে যেতে-যেতে কথাও হয়েছে। ঠিক হয়েছে গোপনে দেখাশুনো হবে বোটানিক্যাল গার্ডেনে, দিনের আলোয়, গাছপালার আড়ালে। প্রতিদিনই দুপুর দুটোর সময়ে একবার দেখা হবেই।
তা দুদিন দেখা হয়েছে বইকী। জানা গেছে অনেক কথা। গজানন আর পুঁতিবালা টুরিস্টের ভিড়ে এখনও মিশে আছে বলে রক্ষে, কিন্তু বেশিদিন থাকলেই সজাগ হবে অদৃশ্য চক্ষুরা। অনিমার সে ভয় নেই। স্কুলের শিক্ষয়িত্রী সে। থাকে লেডিজ হোস্টেলে। প্রতি সন্ধ্যায় যায় ভিডিও গেমের জুয়োর আসরে। এবং ওইখানেই রয়েছে সন্দেহজনক কিছু লোকের আনাগোনা।
ভাবতে-ভাবতেই মতলব স্থির হয়ে যায় গজাননের। প্রাণ নিয়ে টানাটানির গেম-এ নেমে প্রাণটাকেই পণ করে এবার খেলায় নামা যাক। মরতে ভয় পায় না গজানন। কিন্তু কোন…বাচ্চারা রাম সিং এবং আরও তিনজনকে পাগল বানিয়ে আত্মহত্যা করাচ্ছে, কীভাবে পাগল বানাচ্ছে, তা ্না জানলে গজানন নিজেই তো ফের পাগল হয়ে যাবে। তার চাইতে বাঘের গুহাতেই ঢোকা যাক। যা থাকে কপালে।
পুঁতিবালা, আই মীন, প্রতিবল–গম্ভীর স্বর গজাননের। দ্বিধা কাটিয়ে উঠেছে। সঙ্কল্পে পৌঁছেছে। গলার স্বর পালটে গেছে।
বুঝল পুঁতিবালাও। গজাননকে সে চিনে ফেলেছে। অসম্ভব ডেয়ারিং। আর অসম্ভব গোঁয়ার। গজানন নিজেও বলেছিল একদিন, ওর নাকি অবসেসন্যাল পার্সোনালিটি আছে। যা ধরবে, তা করে তবে ছাড়বে। পুঁতিবালা বলেছিল, শুয়োরের গোঁ বললেই হয়। খেপে গেছিল গজানন।
কিন্তু আজকে আর টিটকিরি দেওয়ার সাহস হল না পুঁতিবালার। গ্রেট গজাননের মুখ থমথম করছে। ভুরু কুঁচকে গেছে। চোখ আর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। বেলেঘাট্টাই গজানন জাগছে ট্রিপল জি-এর মধ্যে।
বলো দাদা–মিনমিনে গলায় বললে পুঁতিবালা।
রিভলভারটা দে।
সোফা ছেড়ে উঠে পড়ল পুঁতিবালা। সুবোধ বালিকার মতো বালিশের তলা থেকে হোলস্টার সমেত রিভলভার এনে দাঁড়াল গজাননের সামনে। গজানন ততক্ষণে বুশশার্ট খুলে ফেলেছে। দু হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে। নিপুণ হাতে কাঁধে আর বগলের তলা দিয়ে চামড়ার বেল্ট বেঁধে আগ্নেয়াস্ত্র ঝুলিয়ে দিল পুঁতিবালা। হাত নামিয়ে বুশশার্ট পরে নিল গজানন। ঘড়ি দেখল। দুপুর একটা।
